“NTRCA ‘র তৃতীয় নিয়োগ চক্র ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা” -এ.বি.এম. গোলাম নুর।

প্রকাশিত: ৯:০৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০২১

“NTRCA ‘র তৃতীয় নিয়োগ চক্র ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা” -এ.বি.এম. গোলাম নুর।

বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ প্রদানের এককভাবে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- NTRCA (Non-Government Teachers’ Registration and Certification Authority) বা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ। 
NTRCA ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রাণালয়ের অধীনে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটি দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের জন্য ১৬টি নিবন্ধন পরীক্ষা সম্পন্ন করে কৃতকার্যদের প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করে। উত্তীর্ণ মেধাবীদের মধ্য থেকে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালে প্রথম নিয়োগ চক্রের অধিনে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদার আলোকে সহকারি শিক্ষক (কম্পিউটার) পদে প্রায় ২৫,০০০ এবং ২০১৮ সালে ১৫১৮৬ টি প্রতিষ্ঠান হতে প্রাপ্ত চাহিদার ভিত্তিতে ৩৯৫৩৫টি শুন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ পাঠিয়েছিলো। তৎ সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
বিগত ১৬ জুলাই/২০২১ খ্রীঃ তৃতীয় নিয়োগ চক্রের অধীনে দেশের ৪৮১৯৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে ৫৪৩০৪টি শুন্যপদের বিপরীতে ৫১৭৬১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করে প্রতিষ্ঠানটি।
NTRCA’ ৩য় নিয়োগ চক্রের অধীন নিয়োগের সুপারিশ প্রাপ্ত সকল নবাগত শিক্ষক- কে আন্তরিক অভিনন্দন ও হার্দিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে NTRCA কর্তৃক  নিয়োগের সুপারিশ প্রাপ্ত শিক্ষকগণ যোগদান করায় দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় বিশাল পরিবর্তন আসছে। বিগত দু’নিয়োগ চক্রের অধীন সুপারিশকৃত শিক্ষকগণ যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছেন, সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রমে গতিশীলতা আসার পাশা-পাশি প্রতিষ্ঠানের গুণগতমানও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুলাংশে।
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এ সমস্ত যুবক জাতীয় পর্যায়ে কঠিন কঠিন ধাপ অতিক্রম করে শিক্ষক হিসেবে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানে যোগদান করছেন। নিঃসন্দেহে NTRCA’র এ বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রসংশার দাবী রাখে।
নতুন নিয়োগের সুপারিশ প্রাপ্ত মেধাবীমুখগুলোকে ধরে রাখতে পারলে নিঃসন্দেহে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে।
দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা বিবেচনা করে নবাগত মেধাবী মুখগুলোকে শিক্ষার চলমান ধারায় ধরে রাখার জন্যে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে দেশের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন কল্পে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করিঃ
 ১। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় বিরাজমান বৈষম্য বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি কথাটা দূর করে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একই ধারায় নিয়ে আসা। একই পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। কেননা এক দেশ; এক সরকার; এক ও অভিন্ন পাঠ্যসূচি এবং একই পুস্তকের পাঠদান-তাই শিক্ষার ধারাও এক ও অভিন্ন হওয়া উচিৎ।
২। অধিক হারে মেধাবি মুখকে এ পেশায় আসতে উদ্ধুদ্ধকরনের জন্য এ পেশায় কর্মরত শিক্ষকগণকে শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে বেতন কাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ/ প্রদান করা।
৩। NTRCA’র মাধ্যমে একবার সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে নিয়োগ পাওয়া Index ধারী শিক্ষকদের পুনরায় আবেদন করার সুযোগ বাতিল করা। কেননা একবার নিয়োগের সুপারিশ পেয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকগণ পুনরায় আবেদন করে নিয়োগের সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদান করায়, ছেড়ে আসা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পরে। এছাড়াও এদের কারনে অনেক নতুন মেধাবী মুখ নিয়োগের সুযোগ প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হচ্ছে।  প্রয়োজনে এ ক্ষেত্রে বদলী ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
৪। শিক্ষাক্ষেত্রে শহর এবং গ্রামের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্যদূরীকরনের লক্ষে গ্রামীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা’র ভিত্তিতে বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা।
৫। শিক্ষার এ স্তরে নিয়োজিত  শিক্ষকগণের আত্মা- সামাজিক মর্যদা ও চাকুরির নিশ্চয়তা বিধানকল্পে প্রাথমিক স্তরের মতো মাধ্যমিক স্তরের সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক- কর্মচারিকে জাতীয় রাজস্ব খাতের অন্তর্ভূক্ত করা।
৬। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহনেচ্ছু NTRCA-  কর্তৃক নিবন্ধিত বয়স পেরিয়ে যাওয়া মেধাবীদের বিশেষ নিয়োগ চক্রের মাধ্যমে নিয়োগ প্রাপ্তির সুযোগ দেয়া।
৭। NTRCA  দ্বারা নিবন্ধিত প্রার্থীকে প্রতিষ্ঠান চয়েসের ভিত্তিতে আবেদন করার সুযোগ বাতিল করে সামগ্রীকভাবে একটি মাত্র আবেদনের সুযোগ দিতে হবে। পরবর্তীতে NTRCA- কর্তৃপক্ষ দেশের যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করবে এবং ঐ প্রার্থী সুপারিশকৃত প্রতিষ্ঠানে যোগদান করবে। এতে শিক্ষক বন্টনের ক্ষেত্রে সমতা বিধান হবে। ফলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্টানে বিরাজমান শিক্ষক সংকট বহুলাংশে দূর হবে।
৮। যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাহিদা প্রেরণ করেও কাংখিত পরিমান শিক্ষক পাননি বিশেষ ব্যবস্থায় সে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক প্রদানের ব্যবস্থা করা।
৯। নিয়োগের সুপারিশ প্রাপ্ত শিক্ষকগণের এমপিওভুক্ত করণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।
১০। গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পূর্বে গণবদলী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদনকৃত শিক্ষকগণকে কাংখিত প্রতিষ্ঠানে বদলির সুযোগ দেয়া।পরবর্তিতে প্রাপ্ত চাহিদার ভিত্তিতে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা।
NTRCA -কে দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিরাজমান শিক্ষক সংকট দুরীকরনে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। গতানুগতিক ধারায় এ প্রতিষ্ঠানটি চলতে থাকলে, দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। শিক্ষার গুণগতমান কোনভাবেই অর্জন করা সম্ভব হবে না। এতে জাতি হিসেবে আমরা অনেক পিছিয়ে পরবো, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
গুটিকয়েক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করে নয়; জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে NTRCA-কে দেশের সকল শ্রেণির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখকঃ
অধ্যক্ষ, হাইদ চকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম ও
সহ.সভাপতি, বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারি ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।

Categories