স্মৃতিকথায় মাতলা… শ্রাবণী গুপ্ত

প্রকাশিত: ১১:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০

স্মৃতিকথায় মাতলা…       শ্রাবণী গুপ্ত।

আমাদের মাতলা নদীর ধারে একটা বাড়ি আছে। নদীর কোল ঘেঁষে না হলেও বেশ কাছে। ওখানে বিদ্যুতের খুঁটি না পৌঁছোলেও পাখা চলে আলোও জ্বলে।   আহা, সৌরবিদ্যুতে চলা স্লোমোশনের ফ্যানটায় হাওয়া খেয়েও কী সুখ! আর সূর্যমুখী ক্ষেতের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভুলেই যেতে হয়, ‘হলুদ’ বলতে আমি শুধু রান্নার হলুদটাকেই চিনি।  তারপর যখন, লাল লঙ্কা গাছের পাশ কাটিয়ে সেইখানটায় পৌঁছোতাম, মনে হতো যেন একপ্রস্থ সমুদ্র। সত্যি বলছি, দূর দূর পর্যন্ত শুধু জল আর জল। পাড়ে বসে থাকতে থাকতে ভেবেছি, নৌকায় চেপে ভাসতে ভাসতে একেবারে বঙ্গোপসাগরের কোলে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি।  ভাবছি,  এমন সময় হঠাৎ করেই মনে হলো জলটা মনখারাপ করে কোথাও যেন পালিয়ে যাচ্ছে। তারপর, তারপর কিছুক্ষনের মধ্যেই শূলো আর ঠেসমূলে ছেয়ে যেত চোখের বাগান। আহা, সেও যেন এক অন্যরকম সৌন্দর্য। বাড়ি ফিরলেই কপালে জুটত মুঠো মুঠো মাছ ভাজা।  কী স্বাদ! কাকীমা যেন পারলে নদীর সব মাছগুলোই ধরে খাইয়ে দেন। ওখানেই দেখেছি, মাতলা শুধু পারই ভাঙে না, গড়েও অনেককিছু। কী?  হৃদয় উঠান গো হৃদউঠান। সেই উঠানে প্রেমের ভরামাস, ভালবাসার বসবাস।  মাতলা নামটা শুনলেই চোখে কেমন একটা যেন ছবি ভেসে ওঠে তাই না? যেন সব ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ, যেন কোন মাতাল পাগলপারা লোক। আমার ও তেমনি মনে হতো।   কলকাতা থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে, নদী পার হয়ে, আবার ট্রেকারে, তারপর আবার হেঁটে যখন পৌঁছলাম, তখন কিন্তু একবারও বুঝিনি, আর কয়েক পা হেঁটে গেলেই পৌঁছে যাব সেই নদীটার পাড়ে, যার কথা শুধু ভূগোল বইতেই পড়েছি। চওড়া নদীটার পাশ দিয়ে তৈরি বাঁধের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছিল, উজানে বয়ে চলা এই নদীরও এতো অহংকার থাকতে পারে? যে নদী কেবল চাঁদ আর সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে জল পাওয়ার আশায় তারও এতো ক্ষমতা যে পাড় ভেঙে তলিয়ে দিতে পারে গ্রামের পর গ্রাম?          নদীর ওপারে শুনেছি বাঘ দেখা যায়। সাদা বাঘ। ডোরা কাটা। এপারে বসে ভাবছিলাম,  এমন জঙ্গলে এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মানুষ বাস করে কী করে?  এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো খাল, সূর্যমুখী ক্ষেত,  যেখানে সেখানে শুকোতে দেওয়া হয়েছে লাল লঙ্কা। আর সময়ে সময়ে নদীর ফুলে ফেঁপে ওঠা। অনেকটা দূরে একটা পার্ক ও আছে। গেছিলাম সবাই মিলে। কতো গরান গাছ। হলুদ হলুদ ফুল।  আর একটা কথা তো বলাই হয়নি। ওখানে না ঘরের মেঝেতে নিশ্চিন্তে সাপ ঘুরে বেড়ায়। খেতে বসেছি, কোথা থেকে একখান সাপবাবাজি এসে হাজির। তা আমি হলুম গিয়ে শহরের মেয়ে, সাপ টাপ ঐ খেলাতেই দেখেছি। কিন্তু এমন খাওয়ার সময় পাতের কাছে নুনের ডিব্বা না পেয়ে যদি জ্যান্ত সাপ পাওয়া যায়, তাহলেতো লাফিয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক। ঘটলোও তাই। ওনাদের কাছে অবশ্য সাপ ব্যাঙ পাড়াপড়শি সব এক।  ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম, দাদুরা নাকি বহু বছর আগে এখানে এসেছিলেন। তখন যে যত জঙ্গল সাফ করবে তার তত জমি। ওনারা জঙ্গল কেটে কেটে ওখানে বসত করেছিলেন। তারপর চাষ। সেও এক ইতিহাস।   সাধেই কী বলছি, ভূগোল আর ইতিহাসের মিশেলে এ এক অনন্য অঞ্চল।

তারাবাগ আবাসন কোয়ার্টার, নং-k/3 রাজবাটি, বর্ধমান পূর্ব বর্ধমান।

 


Categories