সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২০

টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হু হু করে বাড়ছে সিলেট বিভাগের প্রধান নদ-নদীর পানি। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।

সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, পিয়াইন,  চেলা, পাঠলাই, বৌলাই ও রক্তিসহ সিলেট বিভাগের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানিই বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি। ফলে প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

কানাইঘাটে সুরমার পানি ৪০ সেমি, সুনামগঞ্জে কুশিয়ারার পানি ৪৬ সেমি ও যাদুকাটা নদীর পানি বিপৎসীমার ১২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পরিস্থিতি আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

ভারতের চেরাপুঞ্জিসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। আসামে ৪ মিলিমিটার ছাড়িয়ে গেছে বর্ষণ। এছাড়া দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেড়েছে। ফলে সুরমা, কুশিয়ারাসহ বিভাগের সব নদ-নদীই ফুলে ফেঁপে ওঠেছে। এই অবস্থায় আজ রবিবার নাগাদ সিলেট এবং সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে।

সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, আজ শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আর শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১০৭ মিলিমিটার।

সিলেট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, সিলেটের দুটি পয়েন্টের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আমাদের কোনো পয়েন্টের বাঁধ ভাঙা বা কোনো ধরণের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে নিম্নাঞ্চলগুলো সামান্য বৃষ্টি অথবা পাহাড়ি ঢলেই প্লাবিত হয়ে যায়।

সিলেটে বড় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর আমাদের জানিয়েছিল রবিবার (২৮ জুন) অবধি বৃষ্টি হতে পারে। এরপর বৃষ্টির পরিমাণ কমে আসবে। আমরা কাল পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তারপর বোঝা যাবে। তবে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।

সিলেট : 

সিলেট সদর উপজেলাসহ জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে দুই উপজেলায় নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একাধিক উপজেলায় নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

টানা বৃষ্টি এবং উজানের ঢলে সিলেট সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে জনপদ তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সিলেট সদর উপজেলার ১নং জালালাবাদ, ২নং হাটখোলা, ৩নং খাদিমনগর, ৭নং মোগলগাঁও ও ৮নং কান্দিগাঁওসহ কয়েকটি ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে হাঁটখোলা ইউনিয়নের উমাইগাঁও, জালালাবাদের মানসি নগর, রায়েরগাও, কান্দিগাঁওয়ের ছামাউরাকান্দি, নীলগাঁও, নলকট, মোগলগাঁও ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড, খাদিমনগরের আলীনগর, ঘোড়ামারা, ছয়দাগ, গনকিটুক, বাউয়ারকান্দি, বাইশটিলা, রঙ্গিটিলা, পীরেরগাও, মধুটিলা, মোকামবাড়ি, বাইলার কান্দি, রইরকান্দি, শিমূল কান্দি, যুগলটিলা, ছালিয়া গ্রামে পানি প্রবেশ করায় এসব গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়কগুলো জলমগ্ন হওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নেই বিদ্যুৎ সরবরাহ।

জৈন্তাপুর উপজেলার বড়গাং, শ্রীপুর, রাংপানি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে রাস্তাঘাটে যানবাহন ও লোক চলাচল নেই বললেই চলে।

জানা গেছে, উপজেলার ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়নের কেদরী, শেওলারটুক, বাওন হাওর, বাউরভাগ, লক্ষীপুর, বিরাইমারা, লামনীগ্রাম, কাটাখাল গ্রাম বন্যার পানি প্রবেশ করছে। গ্রামীণ জনপদের অনেক রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। নিজপাট ইউনিয়নের বন্দরহাটি, মেঘলী, তিলকৈপাড়া, নয়াবাড়ী, জাঙ্গালহাটি, পশ্চিম গৌরিশংকর, ডিবির হাওর, কামরাঙ্গীখেল, বাইরাখেল, হর্নি, কালিঞ্জীবাড়ী, দিগারাইল, নয়াগাতি, বারগতি, হেলিরাই, গুয়াবাড়ি সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকার বাসিন্দারা বন্দি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া চিকনাগুল ইউনিয়নের কাটুয়াকাদি, কাপনাকান্দি, শিখারখাঁ, দরবস্ত ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ইউনিয়নের সেনগ্রাম, গর্দ্দনা, হাজারী সেনগ্রাম, তেলিজুরী, ছাত্তারখাই গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। চারিকাটা ইউনিয়নের নয়াখেল, বালিদাড়া, থুবাং, ভিত্রিখেল, সরুখেলসহ অনেক গ্রামে পাহাড়ি ঢলের কারণে স্থানীয়রা অনেকটা ঝুঁকির মধ্য রয়েছেন।

গোয়াইনঘাট উপজেলায়ও বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলায় সারী নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গোয়াইন নদীতেও পানি বাড়ছে। ইতোমধ্যে উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম বন্যা কবলিত হয়েছে। এসব গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বিশ্বনাথে গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টিপাত ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত রয়েছে। সুরমা নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নদীর পাড়ে অবস্থিত বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের মির্জারগাঁও, মাহতাবপুর, মাধবপুর, কাজীবাড়ি, রাজাপুর, তিলকপুর, হাজারীগাঁও, আকিলপুর, রসুলপুর, সোনাপুর এলাকার মানুষ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এদিকে কানাইঘাট উপজেলায়ও বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় সারি নদীর পানি বিপৎসীমার ০.৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে বলেও জানা গেছে।

সুনামগঞ্জ:

সুনামগঞ্জে নদী তীরবর্তী এলাকা ও নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজানে অর্থাৎ ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে গত ৭২ ঘণ্টায় অস্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি শনিবার সকালে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার এবং পাহাড়ী নদী যাদুকাটার পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নদীগুলোর পানি কূল উপচে প্রত্যন্ত এলাকায় প্রবেশ করায় নদী তীরবর্তী এলাকা ও জেলার সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর এবং তাহিরপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর, কাজীর পয়েন্ট, উত্তর আরপিননগর, তেঘরিয়া ও বড়পাড়া এলাকার চলাচলের সড়ক এবং কিছু নিচু ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গেছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান জানিয়েছেন, ভারতের মেঘালয়- চেরাপুঞ্জিতে গত ৭২ ঘণ্টায় ৯০২ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা এই মৌসুমে সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি এবং এর আগের ৭২ ঘণ্টায় ২৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এ কারণে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমা ৭ দশমিক ৮ অতিক্রম করে ৮ দশমিক ২৬ সেন্টিমিটার এবং পাহাড়ি নদী যাদুকাটার পানি বিপদসীমা ৮ দশমিক ৫ অতিক্রম করে ৮ দশমিক ৬১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ৭টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের লোকজন। এছাড়াও ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদী, হাওর-বাওরের পানি বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলার রাস্তাঘাট প্লাবিত হচ্ছে। এতে করে উপজেলার সঙ্গে ৭টি ইউনিয়নের আন্তঃসড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ।

এদিকে যাদুকাটা, পাঠলাই, বৌলাই ও রক্তি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়িসহ হাটবাজারগুলোতে পানি প্রবেশের খবর পাওয়া গেছে। জানা গেছে, তাহিরপুর-বাদাঘাট সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল। এতে যাতায়াত ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

অপরদিকে তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের আনোয়ারপুর সেতুর পূর্বাংশের এপ্রোচ নির্মাণাধীন সড়কটি ৩ ফুট পানির নীচে থাকায় জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতে উপজেলার অনেক পুকুর ও জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে।

ছাতকে বড় বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন নতুন এলাকা হচ্ছে প্লাবিত। ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের ওপর প্রবল বেগে প্রবাহিত হচ্ছে পানি।

ছাতকের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর কূল উপচে ছাতক শহর, নোয়ারাই, ছৈলা আফজলাবাদ, জাউয়াবাজার ইউনিয়নসহ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

অলি-গলি এবং বাসা-বাড়ির আঙিনাতেও পানি প্রবেশ করায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন পৌর শহরের মানুষজন। আশঙ্কা রয়েছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ারও। বর্তমানে সুরমা চেলা ও পিয়াইন নদীতে পানি বৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে।

শনিবার (২৭ জুন) সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার, চেলা নদীর পানি বিপদসীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ও পিয়াইন নদীর পানি ১৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রবল বর্ষণে সুরমা, পিয়াইন ও চেলা নদীতে পাথর ও বালুবাহী বার্জ-কার্গো ও বাল্কহেডে লোডিং-আনলোডিং প্রায় বন্ধ রয়েছে।