সংকটে দরিদ্র ও চাকারি প্রত্যাশিরা

প্রকাশিত: ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২০

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ, সেশনজটের আশঙ্কাসহ নানা কারণে চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা। যেসব শিক্ষার্থী টিউশনি করে কিংবা খণ্ডকালীন চাকির করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন, করোনা তাদের সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। টিউশনি বন্ধ থাকায় ওইসব শিক্ষার্থী গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

করোনা শুধু তাদের আয়ের পথ বন্ধ করেনি, অনেকের পরিবারের আয়ের পথও বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েক দফা বন্যা অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। এক দিকে শিক্ষাজীবন, আরেক দিকে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব- এ পরিস্থিতিতে কী করতে হবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না অনেকে। এদিকে পড়াশোনা শেষ করা চাকরি প্রার্থীরাও পড়েছেন বিপদে। চাকরির নিয়োগ নাই, অনেকের চাকরির বয়স শেষ হওয়ায় পথে। এদের অধিকাংশই টিউশনি বা ছোট কোনো চাকরি করে চলতেন। সেটা বন্ধ থাকায় তারাও পড়েছেন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে বেকার ভাতা চান চাকরি প্রার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা চান প্রতিষ্ঠানের সব খরচ মওকুফের পাশাপাশি আর্থিক প্রণোদনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের তৃতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী আল আমিনের (ছদ্মনাম) বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। চার সদস্যের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা একজন কৃষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকাকালে চারটি টিউশনি করে চালাতেন নিজের পড়াশোনার খরচ। পাশাপাশি প্রতি মাসে টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন দরিদ্র কৃষক বাবাকে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ রয়েছে তার টিউশনি। পাশাপাশি জুলাই মাসে দফায় দফায় বন্যার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে তার বাবার মাঠের ফসল। বাধ্য হয়েই পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার জন্য একটা কাজের আশায় মহামারীর মধ্যেই ঢাকায় আশার প্রস্তুতি নিয়েছেন আল আমিন। যদিও ঢাকায় আশার পর আদৌ কোনো কাজ পাবেন কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী ইফতেখার উদ্দিন পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন। কিন্তু করোনার কারণে চাকরিটি ছাড়তে হয়েছে তাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার বাবা একজন চা বিক্রেতা। তার স্বল্প আয়ে আমাদের পাঁচ সদস্যের সংসার কোনো মতে চলত। কিন্তু বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেটিও বন্ধ রয়েছে। পরিবারের সব ধরনের উপার্জনের পথ এখন বন্ধ। বাবার কিছু ধারদেনা রয়েছে। সেটা পরিশোধ করতে না পারায় আমাদের পরিবারের ওপর চাপ বাড়ছে।

নিজের শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ ইফতেখার বলেন, এই পরিস্থিতিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাব; না পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করব- সে চিন্তাই করছি। এমন পরিস্থিতে গ্রামের পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক চাপে দিন দিন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি।

করোনার কারণে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এ অবস্থা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশই তরুণ। তারা যদি আনইউটিলাইজড অবস্থায় বসে থাকে তা একটা ভয়ানক ব্যাপার। তাদের এখন এচিভমেন্ট করার সময়। তাই আমাদের এখন চিন্তাভাবনা করা দরকার- তাদের কীভাবে একটি প্রোডাক্টিভ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। আর এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদেরও সঙ্গে নিতে হবে।

এদিকে সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস এবং চাকরি প্রার্থী যাদের বয়স শেষে হয়ে গেছে তারা পড়েছেন বড় বিপদে। কারণ এসব চাকরিপ্রার্থীর বেশির ভাগই টিউশন কিংবা ক্ষণস্থায়ী চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করে চাকরির চেষ্টা করছিলেন। করোনার কারণে ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া। বন্ধ আছে টিউশনিও। একদিকে আর্থিক সংকট অন্যদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিলম্বের কারণে বিপাকে পড়েছেন তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম ২৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বেকার। এর মধ্যে পুরুষ ১৪ লাখ, নারী ১২ লাখ ৩০ হাজার। যা মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৪ শতাংশ। তিন বছর আগে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার। এক দশক আগে যা ছিল ২০ লাখ। এমন পরিস্থিতিতে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর পাশাপাশি সংকট কাটাতে বেকার ভাতার ব্যবস্থা করা দরকার বলে অনেকেই মনে করছেন।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সমন্বয়ক সুরাইয়া ইয়াসমিন যুগান্তরকে বলেন, করোনা মহামারীর কারণে অনেকেই তাদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা হারিয়েছেন। পাশাপাশি অর্থাভাবে নতুন করে প্রস্তুতি নেয়াও অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করা সময়ের দাবি।

বেকার ভাতা প্রদানের দাবি জানিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা চাকরিপ্রার্থী নিয়ামুর রহমান বলেন, উন্নত দেশগুলো অনেক আগে থেকেই বেকার ভাতা দিয়ে আসছে। আমাদের দেশেও বেকার ভাতা চালু করতে হবে। আর করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও কর্মপ্রত্যাশী যুবকদের জন্য এখনই সরকারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।


Categories