শ্রীনগরের রাঢ়ীখালে স্যার জে.সি. বোস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী বিক্রমপুরবাসীর

প্রকাশিত: ৮:৫৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২০

প্রদীপ কুমার সাহা : শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ মুন্সীগঞ্জ জেলা। প্রাচীন চন্দ্ররাজাদের আমল থেকে পাল, সেন, মোঘল ও বারভূঁইয়াদের কীর্তিতে সমুজ্জল বিক্রমপুরের মুন্সীগঞ্জ। স্বর্ণ গর্ভা বিক্রমপুরের মাটিতে খাঁটি রত্ন হয়ে সুখ্যাতির সুভাস ছড়িয়েছেন বৌদ্ধ পন্ডিত ধর্ম প্রচারক অতীশ দীপংকর, উদ্ভিদ বিজ্ঞানের জাদুকর সম্রাট জগদীশ চন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাস, সত্যেন সেন, মানিক বন্দোপাধ্যায়, ড. হুমায়ুন আজাদ, ইমদাদুল হক মিলন, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সহ হাজারো নাম না জানা জ্ঞানী গুনী মহাজন।

শুধু সৃজনশীল কর্মে কেন, রাষ্ট পরিচালনায় ও মুন্সীগঞ্জের রয়েছে কৃতিত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ, কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ ও বিক্রমপুর রত্ন ভান্ডারের রত্ন।

ঐতিহাসিক জনপদ বিক্রমপুর, প্রাচীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুর আজ ইতিহাস, ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। সারা বাংলার বিক্রমপুরের নেতৃস্থানীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, আজ স্বপ্নলোকের রোমন্থন ছাড়া কিছুই নয়। বিক্রমপুরের ভবিষ্যত প্রজন্মকে তাঁদের পূর্বপুরুষদের গৌরব গাঁথা কীর্তির কথা স্মরণে রাখা প্রয়োজন। তাইতো দক্ষিনাঞ্চলের পদ্মা পাড়ের সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, এবং এলাকার জন প্রতিনিধিসহ সকল স্তরের মানুষ বিক্রমপুরের প্রানকেন্দ্র শ্রীনগরের রাঢ়ীখালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। এলাকাবাসীর দাবী, বিক্রমপুরের রাঢ়ীখালে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের যাদুকর সম্রাট ,জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী  যিনি গাছের মধ্যে জীবনের অস্তিত্বজ্ঞাপক আবিষ্কারের জন্য বিশ্ব পরিচিতি লাভ করেছেন, যিনি বেতার যন্ত্র আবিষ্কারের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন সেই কীর্তিমান বিজ্ঞানীর নামে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় গড়ে উঠেছে বসু মানমন্দির এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের ৫০ পাউন্ডের মুদ্রায় জাগিয়ে তুলেছে বিক্রমপুরের বিজ্ঞানী জগদীশ বসুকে কিন্তু বাংলাদেশে জগদীশ স্মৃতি সংরক্ষণের কোন কার্যকর উদ্যোগ আজও গ্রহণ করা হয়নি। তাই সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ২০২১ সালে বিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানের পূর্বে কর্তৃপক্ষের র্স্পষ্ট ঘোষনা চায় জগদীশ বসুর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান প্রতিষ্ঠা করতে।

বর্তমানে আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনযাত্রা তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে প্রযুক্তিবিদ্যার ও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় আমাদের জীবন হয়েছে গতীশীল ছন্দময় আবার পীড়িত মানুষের মুখে ফোটাছে স্বস্তির হাসি। মানুষের এই অম্লান হাসিকে অক্ষুন্ন রাখার প্রয়াসে “বিক্রমপুর স্যার জে.সি বোস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠার দাবী আজ সর্বজনবিদিত।

জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক ভিটায় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্যার জে সি বোস ইনস্টিটিউশন নামক মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১৯৯৪ সালে তা স্কুল এন্ড কলেজে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে কলেজ শাখাটিও এম.পিওভুক্ত হয়েছে। প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ আসে বসু পরিবারের প্রত্মতাত্মিক নির্দশন দেখতে। জগদীশ বসুর স্মৃতিকে সৃষ্টিশীল করতে ২০১১ সালে সাবেক এম.পি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে দৃষ্টি নন্দন করে গড়ে তোলা হয়েছে “স্যার জে.সি বোস কমপ্লেক্স”। কমপ্লেক্সে রয়েছে জগদীশ বসুর স্মৃতি বিজড়িত জাদুঘর, পশু পাখির ম্যুরাল ও কৃত্রিম পাহাড়-ঝর্ণা। রাঢ়ীখালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে নতুন করে কোন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। কারণ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জমির পরিমান ৩০ একর। যদি ছাত্রাবাস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন হয় তবে পাশ্ববর্তী যদুনাথ রায়ের জমিদার বাড়ীর খাস জায়গা থেকে তা সংগ্রহ করা সম্ভব।

বিক্রমপুর স্যার জে.সি বোস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের লক্ষে ২০১৮ সালে পদ্মা সেতুর রেললিংক সংযোজনের কাজ উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি আর্কষনের জন্য একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক সভায় নির্দেশনা দিয়েছিলেন “যে সমস্ত জেলায় এখনও বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেসব জেলায় পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে“। বাংলাদেশে বর্তমানে বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও প্রকৌশল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০টি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এখনও দেশের ৩২টি জেলায় কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা  লাভ করেনি। ২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বর স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর ১৬১ তম জন্ম জয়ন্তী অনুষ্ঠানে তৎকালীন শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসাইন সহ উপস্থিত প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ রাঢ়ীখালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করেছিলেন।  মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ তাঁর নির্বাচনী মেনোফেস্টোতে রাঢ়ীখালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন। বর্তমান সংসদ সদস্য মাহী বি চৌধুরী ও একই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছেন।

নাটোর ও মেহেরপুরে ইতিমধ্যেই ২টি করে মোট চারটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। কিন্তু রত্ন গর্ভা বিক্রমপুরে এখনও কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারী উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

ঢাকা থেকে রাঢ়ীখালের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যাধুনিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।    ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের শ্রীনগর পয়েন্ট হয়ে দোহার রোডে রাঢ়ীখালের অবস্থান। ঢাকা থেকে রাঢ়ীখালের দূরত্ব মাত্র ৩৫ কি. মি.। এ পথ অতিক্রমে সর্বোচ্চ সময় লাগে ৪০ মিনিট। এই স্বল্প দূরত্বের জায়গায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে শুধু বিক্রমপুরের শিক্ষার্থীরাই নয়, সারা বাংলার শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। বিজ্ঞানের অব্যাহত জয়যাত্রার সঙ্গী হয়ে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যেমন সক্ষম হবে, তেমনি স্বপ্নের বাস্তবায়ন আমাদের সামনে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

 


Categories