শোকাবহ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর আদর্শই হোক প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন

প্রকাশিত: ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০২০

শোকাবহ পনের-ই আগস্ট সমাগত। বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে শোকের কর্মসূচির মাধ্যমে পুরো মাস শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছে এ বিশ্ব নেতাকে। পাড়া-মহল্লায় চায়ের দোকানের আলোচনা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সর্বত্র গান, মিছিল-স্লোগান ভাষণ শোনা যাচ্ছে। স্বাধীনতার এই মহান স্থপতির আদর্শের বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তার প্রতি সত্যিকার সম্মান জানানো সম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমরা হারিয়ে ফেলতে বসেছি। যে নেতাকে দেখে ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে টাইমস পত্রিকায় মন্তব্য করেছিল- ‘মুজিব না থাকলে বাংলাদেশের জন্মই হতো না। আমরা বিভিন্ন বক্তব্যে বলে থাকি স্বাধীনতার অপর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সার্বিকভাবে বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম। যে আদর্শে উদ্ভূত হয়ে বাঙালি জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বিশ্বের বুকে জন্ম দিয়েছিল একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। বাঙালি জাতিকে দীর্ঘদিনের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে। যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, মোহ, পদ-পদবির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেছিলেন তিনি। পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীত্ব নয়, এদেশের মানুষের ন্যয় সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল বঙ্গবন্ধুর মূল লক্ষ্য।

বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন বক্তব্যে আমরা দেখতে পাই, তিনি কখনও ক্ষমতার পেছনে দৌড়াননি। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত-উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। আর তাতে অবিচল থেকে তিনি সম-সাময়িক আরও অনেক বড় রাজনীতিবিদকে ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সংক্ষেপে তুলে ধরা খুবই কঠিন। ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়া, অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ-প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলাই ছিল তার আদর্শ। তিনি বলেছিলেন এদেশের মানুষকে যদি শিক্ষিত করে গড়ে তোলা না যায় তবে আমারা কি করে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবো। ১৯৫৭ সালে মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দলের পদ নিয়ে ত্যাগের রাজনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন তিনি। এই দৃষ্টান্ত তার নির্লোভ মানসিকতাই নয়, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার দৃঢ় প্রত্যয় তুলে ধরে। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ডাকা ধর্মঘটে নেতৃত্বদানের অভিযোগে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব ফেরত পাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব নিতে রাজি হননি। এদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পারা সবসময়ই সম্মান ও গর্বের বিষয়। তিনি নিজের বিশ্বাস ও আদর্শে আস্থাশীল ছিলেন বলেই মুচলেকা দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব ফেরত নেননি। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপোস করেননি বলেই বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় ৪ হাজার ৬৭৫ দিন অন্ধকার কারাগারে কাটাতে হয়েছে। অথচ পাকিস্তানি শাসকদের লোভনীয় প্রস্তাব মেনে নিলে অনায়াসেই তিনি আরাম-আয়েশে বিলাসী জীবনযাপন করতে পারতেন। আজ বঙ্গবন্ধুর এই ত্যাগ, মানুষের ভালোবাসা, বৈষম্যহীন দূর্নীতি মুক্ত সমাজের চিন্তা যেন অনেকটা সুদূরপরাহত।

বঙ্গবন্ধু দেশের বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক অবস্থায় এই জাতিকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে ৩৭ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। তিনি জানতেন বাঙালি জাতিকে শিক্ষিত করা না হলে, দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। তাই তিনি কুদরত ই খুদা কমিশনের সুপারিশ মতো মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু পনের আগষ্ট নিকষকালো আঁধারে ক্ষমতালোভী হায়েনারা এই মহান নেতাকে এবং শিশু শেখ রাসেল সহ পরিবারের সদস্যদের নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। শোকাবহ আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি। আমরা যদি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো বিশ্বাস, আদর্শ ও কর্মকে হৃদয়ে লালন করি সেই অনুযায়ী কাজ করি, তবে সেটাই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকারের সম্মান প্রদর্শন ও শ্রদ্ধা নিবেদন।

মোঃ আবদুল খালেক
সম্পাদক
দৈনিক আমাদের ফোরাম


Categories