“শুকনায় পাও আর বর্ষায় নাও” ফারুক আহমেদ

প্রকাশিত: ১০:১৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০

**ভ্রমণ গাইড – শুকনায় পাও আর বর্ষায় নাও**

কিশোরগঞ্জের হাওরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এতোদিন এটাই ছিলো অবধারিত সত্য।
কিন্তু এখন আর এ প্রবাদটি কাটবেনা হাওরাঞ্চলের ক্ষেত্রে। কিশোরগঞ্জ জেলার সবচেয়ে দুর্গম এলাকা ছিল হাওরের তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে পাল্টে গেছে এ তিন উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা।
স্বপ্ন নয় সত্যি, রূপকথার গল্প নয় বাস্তব কাহিনী।
দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের মাঝখান দিয়ে উঁচু পাকা সড়কে যানবাহন নিয়ে দেশের যেকোনো স্থানে যাওয়ার হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন আজ বাস্তব সত্য।
প্রবল আগ্রহ আর স্বদিচ্ছা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করে রূপকথাকেও হার মানানো যায় এ তিন উপজেলাকে সংযুক্তকারী সারা বছর চলাচল উপযোগী মহাসড়কটি তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
জানা গেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে ১ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে সারা বছর চলাচল উপযোগী ৪৭ কিলোমিটার উঁচু পাকা সড়ক ও ৩৫ কিলোমিটার সাবমার্সিবল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ২২টি পাকা সেতু, ১০৪টি কালভার্টসহ জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন নদীতে পাঁচটি ফেরি চালু করা হয়েছে। কল্পনাতীত এ কর্মযজ্ঞের সফল ও সার্থক রূপাকার মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ ও তার ছেলে ইটনা-মিটামইন-অষ্ট্রগ্রামের সাংসদ রেজওয়ান আহমেদ তৌফিকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

#ঘুরে_আসুন_বর্ষার_রাজ্যে

বর্ষায় অপরূপ সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি হয়েছে ইটনা, মিটামইন, অষ্ট্রগ্রাম হাইওয়েতে। বিশাল জলরাশির বুক চিড়ে সর্পিল আকৃতিতে এগিয়ে গেছে সড়কটি। দেখে যেকোনো মানুষ মুগ্ধ হবেই। বিশাল নীলাকাশ, সীমানাবিহীন অথৈ জলরাশির বুকে সাদা-কালো আর টকটকে লাল রঙের সংমিশ্রণে তৈরি সড়ক, ক্রসিং, ব্রীজ আর কালভার্টগুলো এক মায়াবী জগতের সৃষ্টি করেছে। দেখে মুগ্ধ হবেন, বিস্মিত হবেন।

জুন মাসের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত সাধারণত পানি ভরপুর থাকে। এ সময়টাতেই হাওড় ভ্রমন বেশী ভালো লাগবে। এখন পরিপূর্ণ বর্ষা। তাই এ ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন ভাটির রাণী খ্যাত অষ্ট্রগ্রাম হয়ে মিটামইনে। একদিনের ট্যুরে নৌভ্রমণ, হাওরাঞ্চল ভ্রমণ এবং স্বপ্নের ইটনা-মিটামইন-অষ্ট্রগ্রাম হাইওয়ে ভ্রমণ হয়ে যাবে একসাথে মাত্র একদিনেই!
এছাড়াও মিটামইনের কামালপুর গ্রামে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বাড়িতে কাটিয়ে আসতে পারেন কিছুটা সময়। এক চক্করে দেখে আসতে পারেন মিঠামইনের ঐতিহ্যের আরেক নিদর্শন বাজারের কাঠমহাল।
আজ আমি আলোচনা করবো আমাদের এলাকা থেকে অষ্ট্রগ্রাম হয়ে মিটামইন ভ্রমণের বিস্তারিত বিষয়াদি নিয়ে।

#কিভাবে_যাবেনঃ-

যদি অল্প কয়েকজন মিলে যেতে চান তাহলে ভেঙে ভেঙে যাওয়াই উত্তম। সেক্ষেত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার অরুয়াইল- পাকশিমুল ব্রীজের নিচ থেকে চাতলপাড়গামী ট্রলার যোগে চাতলপাড় হয়ে চাতলপাড় চকবাজার। সেখান থেকে ট্রলারে করে নদীর অপর পাড় নোয়াগাও। নোয়াগাও নৌকা ঘাটেই দেখবেন অটোরিকশার সারি। দরদাম করে রিজার্ভ করে নিবেন। নোয়াগাও থেকে মিটামইনের যাওয়া-আসার ভাড়া অটো প্রতি ১ হাজার বা ১২ শ টাকা (ঈদের জন্য ভাড়া একটু বেশিও হতে পারে)। একটি অটোতে সর্বোচ্চ ৮ জন বসতে পারবেন।
তবে ভ্রমণ আরামদায়ক করতে ৪/৬ জনের বেশি না বসাই ভালো। পরিবার-পরিজন নিয়ে যেতে চাইলে ট্রলার নিয়ে অষ্ট্রগ্রাম চলে যাবেন। সেখানে ট্রলার রেখে অটো যোগে মিটামইন। রাস্তা ও এর দু পাশের অপার সৌন্দর্য দেখতে চাইলে ট্রলার নয়, অটোতেই যেতে হবে। যাওয়া-আসার পথে যেখানে খুশি সেখানে অটো থামিয়ে ছবি তুলতে পারবেন।

#খাবার_দাবারঃ-

ট্রলার নিয়ে গেলে বাসা থেকে তৈরি খাবার ও পানি নিয়ে যেতে পারেন। অষ্ট্রগ্রাম ও মিটামইনে উন্নত মানের হোটেল-রেস্তোরা রয়েছে। হাওরের তাজা মাছ রান্না করা হয় এসব হোটেলে। মিটামইন বাজারে “কাঁচা লংকা” নামে একটি ভালো খাবার হোটেল আছে। ইচ্ছে করলে সেখানেও দুপুরের খাবার খেতে পারেন। বাচ্চাদের নিয়ে গেলে সাথে সবসময় পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য শুকনো খাবার রাখবেন।

#সময়সীমাঃ-

অরুয়াইল থেকে অষ্ট্রগ্রাম হয়ে মিটামইন
ভ্রমণ করে সন্ধ্যার আগেই আবার অরুয়াইলে ফিরতে হলে আপনাকে সকাল ৯ টার মধ্যে অরুয়াইল থেকে রওয়ানা দিতে হবে এবং বিকেল ৩.৩০ এর মধ্যে মিটামইন হতে অষ্ট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে ফিরতি পথ ধরতে হবে।

#সাবধানতাঃ-

খারাপ আবহাওয়ায় হাওরাঞ্চলে ভ্রমণ মোটেও নিরাপদ হবেনা। রৌদ্রজ্বল আকাশ ও ভালো আবহাওয়া বার্তা শুনে হাওর ভ্রমণ নিরাপদ,আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য হবে।
অনেকেই মহাসড়কের পাশে বর্ষার পানিতে গোসল করতে চাইবে। আমি এটা নিরুৎসাহিত করবো। কারণ মহাসড়কের উভয় পাশেই তীব্র স্রোত বয়ে যায়, বিশেষ করে কালভার্টগুলোয়। তাই উপযুক্ত সাতার সরঞ্জাম ছাড়া পানিতে না নামাই উত্তম হবে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বাইকাররা অটো বাদে অন্যান্য যানবাহন বিহীন এ মহাসড়ককে তাদের “স্বর্গ রাজ্য” মনে করে প্রচন্ড গতিতে বাইক চালনা করে। এতে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে। তাই বাইক ও বাইকারদের হতে সাবধান থাকবেন। এ হাইওয়ে এখন পর্যন্ত চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারী মুক্ত রয়েছে। তবে সন্ধ্যার আগেই জনমানবহীন হাওরাঞ্চল ছেড়ে নিরাপদ লোকালয়ে ফিরে আসাই শ্রেয় হবে।
আমি আমার জানা তথ্যগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। আশা করি সামান্য হলেও উপকৃত হবেন। আরও কিছু জানার থাকলে কমেন্ট করতে পারেন।
সবাইকে ঈদের অগ্রীম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। যদি হাওরাঞ্চল ভ্রমণে যান তাহলে আপনাদের ভ্রমণ যেনো আনন্দদায়ক, উপভোগ্য ও নিরাপদ হয় সে প্রত্যাশা ও দোয়া রেখে শেষ করছি।
আল্লাহ হাফেজ ।
ফারুক আহমেদ,  অরুয়াইল, সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Categories