শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব

প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০

শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

শিক্ষকগণ মানব সভ্যতার অভিভাবক ও সমাজ বিনির্মাণের নিপুণ কারিগর। মূলত শিক্ষক একজন আলোকিত, জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিদীপ্ত পন্ডিত ব্যক্তি। যিনি সভ্যতা সংস্কৃতি পরিবর্তনে গুরু দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকের সাফল্যের ভিত্তি হলো, পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা, নির্মল চারিত্রিক গুণাবলি, জ্ঞান বিতরণ ও সদিচ্ছার প্রচেষ্টা। শিক্ষকরাই পারেন একটি সুশিক্ষিত ও উন্নত জাতি বিনির্মাণ করতে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরপরই পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসনের প্রতিকারে সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে এই দেশের ছাত্র শিক্ষকরা। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ অবধি সকল আন্দোলন সংগ্রামে শিক্ষকদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ ও প্রসংশনীয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রেরণা দানকারী ও সমর্থক শিক্ষকদের চিহ্নিত করে হত্যা করে পাকহানাদার বাহিনী। শিক্ষকরাই জাতীয় যেকোনো দুর্যোগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সহ সর্বক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। নতুন নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবনের সব শাখায় শিক্ষকের দায়িত্ব কর্তব্য মূখ্য। শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা উম্মোচন করে কর্মজীবনে প্রবেশের পথ সুগম করে দেন এই শিক্ষকরাই। অথচ এ দেশের শিক্ষকরা রাষ্ট্রে একজন সাধারণ নাগরিক ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির কোন স্তরে শিক্ষকদের ভুমিকা নেই? আর এসব কারণেই শিক্ষকদের জাতি বিনির্মাণের নিপুণ কারিগর বলা হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ই অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক কনভেনশনে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় কয়েকটি সুপারিশ গৃহীত হয়। এই সনদে বলা হয়, শিক্ষকরা সকল কর্মকাণ্ডের কারিগর। জাতি গঠনে শক্তিশালী ভূমিকা শিক্ষকদেরই বেশি। দক্ষ মানবসম্পদ ও উপযুক্ত নাগরিক শিক্ষকরাই তৈরি করেন। শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সম্মান মর্যাদার ক্ষেত্রে যেন কোনো ত্রুটি না থাকে, রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব নিতে হবে। ইউনেস্কোর সনদ অনুসারে বাংলাদেশে শিক্ষকরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা সু্যোগ সুবিধা ও অধিকার ভোগ করেন,তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশের শিক্ষকরা কতটা পেশাগত সম্মান মর্যাদা পান রাষ্ট্রের কাছে? মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ৯৭ শতাংশ শিক্ষার দায়িত্ব পালন করেন বেসরকারি শিক্ষকগণ। অথচ এই সমস্ত শিক্ষকরা নানাবিধ বৈষম্যের কারণে অভাব অনটনে মানবেতর দিনাতিপাত করছেন। শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা শ্রেণীকক্ষে মনোযোগে মারাত্মকভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। সেহেতু শিক্ষকদের পেছনের অভাব, অনটন ও অর্থ সংকটের সমাধান করা জরুরি। শিক্ষকরা যাতে তাদের অভাব মেটাতে অন্যকোন পেশা বা কর্মে যুক্ত হতে না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। রাষ্ট্রের উচিত শিক্ষকদের বঞ্চনা ও বৈষম্যের পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে সমস্যার আশু সমাধান করা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এসব চিন্তাভাবনা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, আমলা ও বিশেষজ্ঞদের নেই। জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের জন্য সতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমন কথাও বলেছিলেন, সার্কভুক্ত অন্য সব দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে শিক্ষকদের জন্য সতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। আমলাদের সদিচ্ছার অভাবে জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন এখন ডিপ ফ্রিজে আটকে গেছে। মূলতঃ আমাদের দেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে প্রভুত্ববাদী আমলাতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। বৃটিশ শাসনের সময়ে মহারানীর আশীর্বাদ পুষ্ট ভাগ্যবানরা হয়েছিলেন ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ বাঁ আমলা। ইংরেজ সরকারের ঐতিহ্যের ধারক আমাদের দেশে সরকারি কর্মচারীরা আজো কুলীন মন মানসিকতার রয়ে গেছেন।দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন চাইলে নজর দিতে হবে, শিক্ষকদের জীবনযাত্রার সচ্ছলতায়। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্যের দূর করতে হবে। যাতে শিক্ষকরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শ্রেনী কক্ষে প্রয়োগ করার যথেষ্ট সুযোগ পান। বিশ্ব মানের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভিনব উদ্ভাবন, সমাজ পরিবর্তনে শিক্ষকদের ই অগ্রনী ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষকদের সামাজিক সম্মান মর্যাদা কোনো কারণে যেন কলুষিত না হয় তা রাষ্ট্রকেই দেখভাল করতে হবে। তাই শিক্ষকদের সকল বৈষম্য দূরীকরণে শিক্ষা জাতীয়করণই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। যতো দ্রুততম সময়ে এই বোধ শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মাঝে জাগ্রত হবে ততোই জাতির জন্য মঙ্গল।

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম


Categories