শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ সরকারের জন্য লাভজনক

প্রকাশিত: ১১:৫০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২০

 সময়ের পরিক্রমায় স্বাধীনতার প্রায় ৫০টি বছর হয়ে গেল । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করে এদেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ পঙ্গু হয়েছেন ।দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দালালদের হাতে ইজ্জত ও সম্ভ্রম হারিয়েছেন অসংখ্য মা -বোন।প্রায় এক কোটি মানুষকে দেশ ত্যাগ করে শরণার্থী হয়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর ছাড়া এদেশের প্রায় সকল মানুষই কোন না কোনভাবে নিপীড়ন-নির্যাতন ,লুণ্ঠন ও লাঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন। জাতির জনকের স্বপ্ন ছিল দারিদ্র্য ,নিরক্ষরতা, পশ্চাৎপদতা ,সাম্প্রদায়িকতাও দুর্নীতিমুক্ত এক উন্নত সমৃদ্ধ সুখী মর্যাদাশীল গণতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন। দেশ যখন সকল বাধা দূর করে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি দেশীয় ষড়যন্ত্রকারী ও আন্তর্জাতিক চক্রের শিকারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনী তৎকালীন কিছু উচ্চভিলাষীও বিপথগামী সৈনিকদের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন । বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাকে ধারণ করে জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।বর্তমান সরকার একটি “ডিজিটাল বাংলাদেশ “গড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের সাথে তাল রেখে। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ আজ একটি উন্নয়ন ধারা অব্যাহতকারী উদীয়মান উন্নয়নশীল দেশ ।দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে ভিন্ন দিকে,মধ্যম আয় সম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশের দিকে, ঠিক তখনি প্রতীয়মান হয় এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশাল ধারার। যাহা বিভিন্ন ব্যবধান ও বৈষম্য দ্বারা বেষ্টিত। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারিবৃন্দ এখনও প্রকৃত স্বাধীনতার সুফল হতে বঞ্চিত । প্রতিদিন সীমাহীন দুঃখ- দুর্দশা,আকাশচুম্বী বৈষম্যের যাঁতাকলে পৃষ্ঠ বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষত-বিক্ষত করে তুলেছে। অন্ন-বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মত শিক্ষাও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ধারা রয়েছে তাতে ৯৭.৫৪ শতাংশ অবদান রাখছে দেশে প্রচলিত বেসরকারী স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষকরা। যারা এমপিও ভুক্ত হয়ে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত কিছু সুবিধা ভোগ করছেন, যাহা প্রচলিত অন্যান্য পেশাজীবীর তুলনায় নেহাতই কম । মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টিতে জাতীয়বেতন স্কেল ,ইনক্রিমেন্ট, বৈশাখী ভাতা পেলেও শিক্ষকদের নেই কোন বাড়ি ভাড়া ,বদলি অবস্থা, বোনাস সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। বেসরকারি শিক্ষকেরা বাড়ি ভাড়া পান মাত্র ১০০০ টাকা । সেটা পূর্বে ছিল মাত্র ১০০ টাকা ।চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে জীবনাতিপাত করতে হয় । ২০০৪ সালের ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা দিয়ে চলছে ঈদ উৎসব। দেশের বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী দাবি তুলেছেন শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার। বিষয়টা যৌক্তিকতা আমাদের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মিশে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনার উম্মেষকালটা শুরু হয় শিক্ষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় ৩৭হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসেন ।বর্তমান সরকার বিক্ষিপ্তভাবে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করেছেন। রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি হয় জনগণের কল্যাণের জন্য তাহলে বিক্ষিপ্ত ভাবে জাতীয়করণ কেন? এদেশের সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেক আগেই জাতীয়করণ করা উচিৎ ছিল। । বিগত বছরে দেশে বিচ্ছিন্ন ভাবে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এতে শিক্ষাব্যবস্থা বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে দেশের প্রান্তিক জনগণকৃষক-শ্রমিক , তাতী,জেলে,কামার,কুমার মেথর, মুচি, ছুতার ইত্যাদি গ্রামে বসবাস করে, সেখানে বেছে-বেছে কতিপয় শহরে প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলে কাদের লাভ হয়েছে? সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থী ২০ টাকা বেতন দেয়, তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন শিক্ষার্থীকে ২৫০-৬০০ টাকা বেতন দিতে হয়। ক্ষেত্র বিশেষ আরো অনেক বেশী বেতন দিতে হয়। যারা কম খরচে শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার কথা, সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানেরা কঠিন বৈষম্যের শিকার। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার একসাথে জাতীয়করণের পদক্ষেপ নিলে বৈষম্য তো থাকবে না, বরং যারা সুযোগ বুঝে বিভিন্ন আন্দোলন করছেন তাদের আন্দোলনের সুযোগ থাকবে না। শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে একশ্রেণীর শিক্ষক নেতৃবৃন্দ সুশৃঙ্খলভাবে যৌক্তিকভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছেন ।তাদের আন্দোলন খুবই যৌক্তিক, কেননা একই বই, একই সিলেবাস, একই কাজ করে পারিশ্রমিকের বেলায় কেন এত বৈষম্যের স্বীকার হবেন তারা? বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি তথা শিক্ষা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি।দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরকারের কোষাগারে নিলে, সারা দেশের সবগুলো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলে সরকারের প্রতি মাসে খরচ হবে ৮৭৩ কোটি ৩০ লক্ষ ৭৬ হাজার ৮ শত ৫০ টাকা। বছরে এ কাজে খবর হবে ১০৪৭৯ কোটি ৬৯ লক্ষ ২২ হাজার ২ শত টাকা। নতুন এমপিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদে বর্তমান সরকার বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন বাবদ প্রদান করেন১০৪৫০ কোটি টাকা। সরকারকে অতিরিক্ত প্রদান করতে হবে ৫৯০০ কোটি টাকা। তাই সরকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের আওতায় আনলে সরকারের আয় হবে বছরে ৮০ কোটি টাকা। সুতরাং বলা যায় শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ সরকারের জন্য লাভজনক।

লেখক: নূরুল ইসলাম

তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক,

‌‌বাবেশিকফো।


Categories