শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের ধারণা ও সরকারের দায়িত্ব

প্রকাশিত: ৮:২১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং দেশের সর্বমহলে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। এমনকি মন্ত্রী এমপি শিক্ষাবিদদের বক্তব্য, বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা উচিত। দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে জাতীয়করণ নিয়ে বহু আগে থেকেই আলোচনা-সমালোচনা, হিসেবনিকেশ, উত্তেজনা, আন্দোলন সংগ্রাম চলছেই। বেসরকারি শিক্ষকরা ৫০/৭৫ টাকার সেই অনুদান দিয়ে শুরু করে আজ জাতীয় বেতন স্কেলে মূল বেতনের শতভাগ সরকারি কোষাগার থেকে পাচ্ছেন। শিক্ষকদের আজকের এই অবস্থান এমনিতেই হয়নি বা কোন সরকার ইচ্ছে করেই দেয়নি। আজকের এই অবস্থান শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল। আমরা জানি ‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষকগণ সমাজ বিনির্মাণের নিপুণ কারিগর। শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশন কেন পড়াবেন? শিক্ষকতা মহান পেশা ইত্যাদি। কিন্তু আমারা অনেকেই ভেবে দেখিনা শিক্ষকদেরও পরিবার পরিজন সমাজ সংসার আছে। আর এসব চাহিদা মেটাতে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রয়োজন। অথচ শিক্ষা জাতীয়করণের কথা আসলেই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কথা চলে আসে। অথচ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দূর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। সেই লোকসানের টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জনগণের করের মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে। অথচ শিক্ষা যে একটি অতি জনগুরুত্বপূর্ণ জরুরি বিষয় তা নিয়ে সরকারের কোনো ভাবনা চিন্তা নেই বলে মনে হয়।বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ করা বহু আগেই উচিত ছিল। শিক্ষাক্ষেত্রে যে বৈষম্য চলছে তা বেশিদিন জিইয়ে রাখা উচিত নয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও কুদরত ই খুদা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণে পরেই মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। অতঃপর এরশাদ সরকার দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সম্ভব হয়ে উঠেনি। ২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সদিচ্ছায় একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, কিন্তু তাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দশ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। অথচ শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পবিরর্তন আসতো তার সুফল দেশবাসী সবাই পেতেন, দেশের চেহারা পাল্টে যেতো। শিক্ষা জাতীয়করণ করা না হলে গুণগতমানের শিক্ষার ধারণা অবাস্তব কল্পনার অতীত-অলীক। আজকে যারা শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যাবলীর সাথে যুক্ত নয় তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব করছে। যাদের শিক্ষা সংক্রান্ত কোন দায় নেই তাদের দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন অবান্তর। আশার কথা, বর্তমানে এনটিআরসি মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে, এতে মেধাবী শিক্ষকদের আগমন ঘটেছে তাতে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে এটা নিশ্চিত। তবে পাশাপাশি শিক্ষকদের আকর্ষনীয় বেতন-ভাতা ও যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।

দেশের মাত্র ৩ শতাংশ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবশিষ্ট ৯৭ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষকদের অভাব অনটন বৈষম্যে রেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ করতে খুব একটা অর্থের প্রয়োজন নেই। প্রতিষ্ঠানের আয় নিয়ে জাতীয়করণের ঘোষণা করা প্রয়োজন। এতে সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ইতিহাসে চিরকাল স্বরণীয় হয়ে থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শোনা যাচ্ছে বর্তমান সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো তিনটি ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পরিকল্পনা করছে। এটি অবশ্যই সরকারের একটি সুচিন্তিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে কী পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা জানতে চান। এতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করলে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। শিক্ষক ফোরাম ২০১৭ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর জাতীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশে‌ জাতীয়করণের একটি হিসাব উপস্থাপন করে। প্রদর্শিত হিসেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার বিশ দিন অনশন কর্মসূচি পালন করে। অনশন কর্মসূচিতে এই সংগঠনটির পক্ষ থেকে একটি হিসাব লিফলেটে বলেছেন, সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের যে বেতন-ভাতা দেয় তার সঙ্গে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা হলেই শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করা সম্ভব। আর একান্তই যদি শিক্ষা জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয় সেটাতো শিক্ষায় বিনিয়োগ। শিক্ষায় যতো বেশি বিনিয়োগ ততো বেশি মুনাফা। দেশের ৯৭ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতেই হবে এর বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলতে চাই, বিদ্যমান শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষকদের বৈষম্যদূরীকরণ করা না হলে শুধু মাত্র প্রণালীতে শিক্ষার গুণগত মানের পরিবর্তন অসম্ভব। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের শুভবোধের উদয় যতো দ্রুততম সময়ে হবে, জাতীয় টেকসই উন্নয়ন ততোধিক গতিশীল হবে।

আবদুল খালেক
সম্পাদক
দৈনিক আমাদের ফোরাম


Categories