শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের সরল সমীকরণ

প্রকাশিত: ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০২০
bty

শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের সরল সমীকরণ।

শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের যৌক্তিকতা আমাদের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের উন্মেষ শুরু হয় ১৯৫২ ও ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। রাজনীতির উদ্দেশ্যেই যদি হয় জনগণের সেবা ও জন কল্যাণের জন্য, তাহলে এদেশের রাজনীতিবিদের উচিত ছিল বহু আগেই শিক্ষাব‍্যবস্থাকে সরকারিকরণ করা। যে  শিক্ষকদের শ্রেনী কক্ষে পাঠদান করার কথা, সেই জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকরা বেতন-ভাতার দাবিতে রাস্তায় মানববন্ধন, অনশনে যাবেন এটা বেমানান। শিক্ষকদের বেতন-ভাতার দাবি কারোর দয়া দাক্ষিণ্যের বিষয় হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হয়নি বলেই শিক্ষার গুণগত মান নিন্মমূখী এবং সরকার ও নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে এমন অভিমত শিক্ষাবিদদের। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সরকার সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যম কর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা পত্রে বলা হয়েছিল, দেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা বৈষম্য দূরীকরণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, বৈষম্যদূরীকরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এই চারটি বিষয়কে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের বাইরে থাকা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাটি ছিল সাম্যকে কেন্দ্র করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আজ ৪৯ অতিক্রান্ত কিন্তু আজও শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমলাতান্ত্রিক বিদ্বেষী মনোভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নতুন নতুন বৈষম‍্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা। দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় এমপিওভুক্ত মোট ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি অপরদিকে ৩ শতাংশ মাত্র সরকারি। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারি সব নিয়মনীতি মেনেই সকল কার্যক্রম পরিচালিত করেন। শুধুমাত্র রাজস্ব খাতে কর্মরত চাকরিজীবীদের ন্যায় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের বাইরে অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়না। সরকারি প্রজ্ঞাপন নীতিমালা পাঠ‍্যক্রম, পাঠ‍্যসুচী, কর্মঘন্টা, পাঠ‍্যপুস্তক, পরিক্ষাপদ্ধতি, সনদের মান একই। মাধ্যমিক, মাদরাসা, উচ্চ মাধ্যমিক, এবং কারিগরি এই চারটি স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৬ষ্ট শ্রেনীর একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন সাত টাকা অপরদিকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন একশ থেকে তিনশ’ টাকা। দেশের অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষার ব‍্যয় নির্বাহে কষ্ট হয় বিধায় বছরে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে। এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই পরবর্তীতে সামাজে নানাবিধ অন‍্যায় অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করা। শিক্ষা জাতীয়করণের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রথমে জাতীয়করণ করেন এবং ধাপে ধাপে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং লক্ষ‍্য অর্জনে তিনি বেসরকারি শিক্ষকদের মাসিক ৭৫ টাকা বেতন ও রেশনিংয়ের ব‍্যবস্থা করেছিলেন। জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করার এখনই সময়। দেশের সাধারণ মানুষের ঘামেভেজা শিক্ষা করের টাকায় তাদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দিনমজুরের টাকায় তাদের সন্তানদের শিক্ষা বঞ্চিত করে, শুধুমাত্র ধনিকশ্রেণির সন্তানদের শিক্ষার ব‍্যয় নির্বাহ করা অন্যায়। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় রাস্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিয়ে বেসরকারি শিক্ষা একযোগে জাতীয়করণ ঘোষণা দিতে হবে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তেমন কোন অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে না।শিক্ষাব্যবস্থা বেসরকারি রেখে বঞ্চিত ও বিক্ষুব্ধ হচ্ছে শিক্ষকরা। অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অসচ্ছল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের। বিবেক বুদ্ধি বিবর্জিত আত্মকেন্দ্রিক বিকারগ্রস্ত মানুষরাই গরিবের অর্থ মেরে রাতারাতি সম্পদশালী বিত্তবান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে। এতে করে  জাতির কতটা ক্ষতি হচ্ছে তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না। দেশের দরিদ্র অসচ্ছল অবহেলিত এবং পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠিকে সল্প বেতনে শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের বিক্ষুব্ধ করে, বৈষম্য ও বঞ্চনায় রেখে, অসম্মান অমর্যাদা করে কাংখিত সেবা পাওয়ার প্রত‍্যাশা কাল্পনিক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন অগ্রগতি হয়েছে। এখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা নেই। দেশের কর্ণধার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এর নিকট আকুল আবেদন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জম্মশত বার্ষিকীকে ইতিহাসে চিরকাল স্বরণীয় করে রাখতে শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করণ ঘোষণা করুন। ২০২০ সাল হোক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে শিক্ষা বিস্তারের সোনালী যুগ। জয়বাংলা

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম