শিক্ষাক্ষেত্রে সকল বৈষম্যের অবসান হোক

প্রকাশিত: ১২:২৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৫, ২০২০

শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা শুধুমাত্র সুবিন্নস্ত বাক‍্য গাঁথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে তাদের সামাজিক মর্যাদা দেয়া হয়না। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা সবার উপরে। শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর, জাতির সুর্য সন্তান। কোন জাতির আদব কায়দা, সততা, মানবিকতা, মূল্যবোধ দেশপ্রেম তার উপর ভিত্তি করে ঐ দেশের শিক্ষার মান। জাপানে শিক্ষকদের উচ্চ আদালতে সম্মানের সঙ্গে চেয়ারে বসার অনুমতি আছে। অপরদিকে বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার করে ঠকানো হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে দূর্নীতি ও শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্য মানবিক কারনেই মেনে নেয়া মেনে নেয়া উচিত নয়। একজন পিয়নের চেয়ে শিক্ষকের বেতন-ভাতা কম, এ বাস্তবতা জাতীয় লজ্জাহীনতার পরিচয়ই বহন করে। দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার কক্ষ পরিদর্শন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, আদমশুমারি, ভোটার গণনা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস সমূহ পালন, ক‍্যচম‍্যান্ট এরিয়া নির্ধারণ, স্থানীয়, পৌর, সিটি কর্পোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিস্তারে শিক্ষকগণ মূখ্য ভুমিকা পালন করছেন- এ সত্যিটা সবারই জানা।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে অথচ বৈষম্যে আকন্ঠ নিমজ্জিত শিক্ষকগণ এবং বহুধা বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে ৩% সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বল্প ব্যয়ে পড়াশুনা করছে পুঁজিপতি ধনিক শ্রেণীর সন্তানরা। অবশিষ্ট ৯৭% বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে সুবিধাবঞ্চিত,নিম্নবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর সন্তানরা। যাদের সামর্থ্য সীমিত অথচ শিক্ষা ব্যয় অনেকেরই সামর্থ্যের বাইরে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসেবেই প্রাথমিক হতে উচ্চ শিক্ষা স্তরে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে ৬৩% শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে। এই শিক্ষা বঞ্চিত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে? এরাই শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে সামাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

লৌহদণ্ড যেমনটি পাথরে বিদ্ধ করা যায় না, তেমনি উচ্চাভিলাসী কঠিন হৃদয়ে সদুপদেশ প্রবেশ করানো যায় না। আমাদের মতামত, আলোচনা, সমালোচনাকে‌ শিক্ষা প্রশাসন যন্ত্র থোরাই কেয়ার করছেন। দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের যৌক্তিক দাবিকে উপেক্ষা করা অসম্ভব হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কোন সমস্যা ক‍্যানসারে রূপান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত, শিক্ষা প্রশাসন গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করেন না। আমাদের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সরকার, শিক্ষক, শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ কারোরই তেমন কোন গরজ নেই। অথচ শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন গুনগত যুগোপযোগী মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য দূরীকরণের একমাত্র পন্থা হচ্ছে, এমপিওভুক্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে অথবা ২/৩টি ধাপে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে জাতীয়করণ করা। দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য জনিত কারণে শিক্ষকদের মাঝে যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে শিক্ষার মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখা প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানের ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে দেশব্যাপী বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং অভিভাবকদের মধ্যে ব‍্যপক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। বৈষম্য দূরীকরণে শিক্ষক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সোচ্চার রয়েছে। বাস্তবতা হলো আমলারা বলেছেন, সরকার না বললে আমরা কি করতে পারি অন‍্যদিকে সরকার বলছে, এই সব সুযোগে সুবিধা তো বেসরকারি শিক্ষকরা বিধি মোতাবেকই পাওয়ার কথা। তা হলে শুভংকরের ফাঁকিটা কোথায়? সমস্যা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। মন্ত্রী এমপিদের সদিচ্ছা থাকলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দূর্নীতি একটুও কমেনি।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে-
# শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
# শিক্ষকদের পেছনের অভাব অনটন দূর হলে, শিক্ষকগণ অধিকতর দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।
# শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের একক ক্ষমতা সরকারের হাতে চলে আসবে।
# শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করা হলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হবে।
# কোচিং, প্রাইভেট, নোট গাইড বন্ধ করা সম্ভব হবে।
# শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
# প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় ও স্থাবর অস্থাবর সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। ফলে সরকারের জাতীয়করণে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে না।
# ঝরে পড়া রোধ হবে, সমাজের অন‍্যায় অপরাধ, ইভটিজিং, মাদকাসক্তি ও বিশৃঙ্খলা কমে যাবে।
# শিক্ষাক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার ইতিহাসে চিরকাল স্মরনীয় হয়ে থাকবেন।

পরিশেষে শিক্ষার মানোন্নয়ন, টেকসই উন্নয়ন এবং বিদ্যমান বৈষম্যদূরীকরণে এমপিওভূক্ত শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণই হোক ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

মোঃ আব্দুল খালেক
সম্পাদক
দৈনিক আমাদের ফোরাম


Categories