শিক্ষকতা: সর্বোচ্চ সম্মানিত পেশা – জ্যোতিষ মজুমদার

জ্যোতিষ মজুমদার

প্রকাশিত: ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩, ২০২০

শিক্ষা ব্যক্তি জীবনের পরশ পাথর স্বরূপ, যার স্পর্শ মাত্র ব্যক্তি উপযুক্তভাবে সার্থকতার দিকে এগিয়ে যায়। শিক্ষা জীবনের মহামূল্যবান সম্পদ। বাতিঘর যেমন ঝড়ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্র বিহারী জাহাজকে নিরাপত্তার আলো দেখায়, শিক্ষা তেমনি আমাদের সমগ্র জীবনে বিপদ সংকুল মুহুর্তে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ভিন্ন ভিন্ন ভাবে শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। বিংশ শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী শিক্ষাবিদ জন ডিউঈ। তিনি মিসিগান, সিকাগো এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার দায়িত্বপালন করেন। আধুনিক শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি সারা পৃথিবী জুড়ে পরিচিত। শিক্ষা সম্পর্কে তিনি বলেন “শিক্ষা হল অভিজ্ঞতার পূর্ণগঠন মূলক একটি সামষ্টিক প্রক্রিয়া”। ফরাসী দার্শনিক সমাজ বিজ্ঞানী এবং আলোকিত যুগের একজন অন্যতম প্রবক্তা জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেন “ শিক্ষা হল শিশুর অভ্যন্তরীণ বিকাশ”। ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক, জীব বিজ্ঞানী, সমাজ বিঞ্জানী এবং রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হার্বাট স্পেন্সার এর মতে “ শিক্ষা হল ভবিষ্যৎ জীবনে প্রস্তুতি”।

মানব জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জন্মের পর থেকেই শুরু হয় শিক্ষা জীবন এবং চলে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। এভাবে ক্রমাগত শিক্ষা লাভের মাধ্যমে মানব জাতি আজ বর্তমান সভ্য জগতে এসে উপনীত হয়েছে। শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা লাভের একটি প্রক্রিয়া বা কৌশল। মানব জাতির শ্রেষ্টত্বের মূলে রয়েছে শিক্ষা। শিক্ষা পরিকল্পনাকে যারা সার্থক ভাবে বাস্তবায়িত করেন তারা হলেন শিক্ষক। শিক্ষকগণই শিক্ষায়তনের শিক্ষাথর্ীদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দান করেন। বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, দার্শনিক শিক্ষকতা সম্পর্কে ও তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। আমেরিকার ইতিহাসবিদ হেনরি অ্যাডামস বলেন “ একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে যে প্রভাব ফেলেন কেউ বলতে পারেনা তাঁর প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়”। দার্শনিক বাট্রার্ন্ড রাসেল বলেন, “ শিক্ষক হচ্ছেন সমাজ ও সভ্যতার প্রকৃত বিবেক, এ কারণেই শিক্ষকদের বলা হয় সমাজ বিনির্মানের স্থপতি”। ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেলিন বলেন “ সমাজ পরিবর্তনের পূর্বশর্ত মানুষের পরিবর্তন, আর সেই পরিবর্তনের অভিভাবকত্ব শিক্ষকদের পেশাগত দায়ীত্ব”। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল বলেন “ যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তারা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়। পিতা- মাতা আমাদের জীবন দান করেন ঠিকই কিন্তু শিক্ষকগণই সেই জীবনকেই সুন্দরভাবে গড়ে তোলতে সাহায্য করেন।
আমি মনে করি পৃথিবীতে যত পেশা আছে এসবের মধ্যে শিক্ষকতা সর্বোচ্চ সম্মানিত। জেনে বা না জেনে , বুঝে না বুঝে যারাই এ পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন তারাই জাতির শ্রেষ্টত্ব অর্জন করতে পেরেছেন। বাস্তবে শিক্ষকতাকে একটি পেশা হিসেবে গ্রহণ করা হলেও মূলত এটা কোন পেশা নয়, বরং একটি ব্রত। অন্য দশটা পেশার চেয়ে এর দায়ীত্ব ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। আজকের দিনে শিক্ষকেই জাতি গঠনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এই হাতিয়ার যিনি ব্যবহার করেন তিনিই হলেন শিক্ষক। শিক্ষার্থীর হৃদয়ে জ্ঞানতৃষ্ণা জাগিয়ে মনের সুকুমার বৃত্তিগুলোর সঠিক পরিচর্যা করে শিক্ষাথর্ীকে আদর্শ মানুষে পরিনত করার মাধ্যমেই তিনি মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল সেই দেশের মেধাবী সন্তান এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ,হল সেই মেধাবী সন্তানদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। শিক্ষকমণ্ডলী ছাত্র/ ছাত্রীদের জ্ঞানঅর্জন অকৃপণ ভাবে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন এবং শিক্ষকগণের সুচিন্তিত জ্ঞান গর্ভ বিদ্যা ছাত্র ছাত্রীদের জ্ঞান জগতের রুদ্ধদ্বার খূলে দেয়। শিক্ষক মণ্ডলীর সহযোগীতায় শিক্ষাথর্ীবৃন্দ জ্ঞানের দীপ্ত শিখায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে ফলে উপকৃত হয় দেশ, জাতি এবং সমাজ। একটি জাতিকে উন্নতির শিখড়ে আসীন করতে শিক্ষক সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন। শিক্ষকগণ বিশুদ্ধ জ্ঞান, মানসিক আর নৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত এবং দীক্ষিত করে গড়ে তোলে দেশের যোগ্য নাগরিক।

শিক্ষকতার চেয়ে মহৎ পেশা আর হতে পারে না। এটি একদিকে যেমন খুবই সম্মানজনক অন্যদিকে তেমনি এতে রয়েছে আত্মতৃপ্তি। এতে রয়েছে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে স্থানান্তরের আনন্দ। প্রতিদিন একঝাক ছেলেমেয়ের উজ্জ্বল মুখ দেখার সুযোগ- তো একজন শিক্ষকেরই হয়। ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ সবার প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষার দ্বীপটি- প্রজ্জ্বলিত হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষকের হাতেই। শিক্ষক সমাজের আলোকবর্তিকা। শিক্ষকদের শিক্ষাদানের মধ্য দিয়েই সমাজ সংস্কারের কাজটি ও ত্বরান্বিত হয়ে থাকে। কাজেই শিক্ষক সমাজকে বাদ দিয়ে সমাজ তথা জাতির মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
প্রতিটি কাজের মূল্যবোধ এবং দায়িত্বের নিরিখে প্রত্যেকের স্থান নির্ধারিত হলে শিক্ষকের চেয়ে মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান অপর কেউ দাবী করতে পারেন না। একমাত্র শিক্ষকগণই মস্তিষ্কের ক্ষুদ্রতম তন্ত্রীকে কাজে লাগিয়ে ভাবকে ভাষায় প্রকাশ করার কাজটি সুনিপুনভাবে সম্পন্ন করেন। আর এজন্যই প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও জ্ঞান দক্ষতায় সুনিপুন শিক্ষক জাতীয় সম্পদ। মানব জাতির বুনিয়াদ গঠনে এবং দেশের যশ, খ্যাতি, সমৃদ্ধি তথা জাতীয় আদর্শ ঐতিহ্যের ধারা সংরক্ষণে শিক্ষক সমাজের ভূমিকা অন্য যেকোন পেশার কমর্ীর চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চাশ- ষাটের দশকে ও এদেশের রাজনীতিবিদগণ নানা সংকটে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার জন্য ছুটে আসতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে। সত্তর/ আশির দশকে ও অনেক শিক্ষক রাজনীতিবিদদের গাইড ও ফিলোসফার ছিলেন। উন্নতবিশ্বে শিক্ষকতা পেশাকে শ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। কারণ এ পেশার সঙ্গে আদর্শ, সততা, নৈতিকতা ইত্যাদি অন্যান্য পেশার তুলনায় বেশি মাত্রায় জড়িত। শিক্ষকগণ শিক্ষাথর্ীদের রোল মডেল বা আদর্শ পথপ্রদর্শক। একজন আদর্শ শিক্ষক ছাত্র/ ছাত্রীদের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে পারেন, নবজন্মদিতে পারেন তাদের।

শিক্ষার প্রধান নিয়ামক শক্তি হচ্ছেন শিক্ষক। তাদের যথার্থ মর্যাদা ও সম্মান এবং সম্মানজনক আর্থিক সুযোগ- সুবিধা দেয়া সকলের নৈতিক দায়ীত্ব ও কর্তব্য। প্রয়োজনে শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। অন্যতায় শিক্ষকতা পেশার দিকে কখনো মেধাবী মুখগুলো চেঁাখ তুলে ও থাকাবেনা। কারণ মেধাবী সন্তানগণ প্রথম পছন্দ হিসেবে কোন পেশা গ্রহণ করবে তা নির্ভর করে সেই পেশার আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক স্বীকৃত ও পদ মর্যাদার উপর। শিক্ষকতাকে শুধু মহান পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেই হবেনা। বরং তা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

জ্যোতিষ মজুমদার
সহকারী অধ্যাপক
ইছমতি ডিগ্রি কলেজ
জকিগঞ্জ, সিলেট।