প্রেক্ষিতঃ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবৃত্ত

প্রকাশিত: ৩:৪৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার ও মানোন্নয়নে স্বাধীনতার পর থেকে সাতটি কমিশন কমিটির মাধ্যমে শিক্ষানীতি প্রণীত হলেও কোন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি। শিক্ষানীতির সঙ্গে রাজনীতির সখ্যতা-ই শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানের অবনতি বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা। প্রতিটি শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সরকারগুলোর সদিচ্ছার অভাব, ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক মতবিরোধ।

** মহান স্বাধীনতার পর শিক্ষানীতি ও কমিটির গুলো।

(১) ড. খুদরত- ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-১৯৭৪।
(২) অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি- ১৯৭৯।
(৩) মজিদ খান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-১৯৮৩।
(৪) মফিজ উদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-১৯৮৭।
(৫) ড. সামশুল হক শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-২০০০।
(৬) মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা সংস্কার রিপোর্ট-২০০৩।
(৭) অধ্যাপক কবির চৌধুরী শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-২০১০

এ সকল শিক্ষানীতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিটি সরকার তার মেয়াদের শেষ দিকে শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে পূর্ববর্তী সরকারের প্রণীত শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে প্রতিটি সরকার নিজেদের কৃতিত্বের জন্য নতুন করে শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। একমাত্র ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কুদরত ই খুদা কমিশনের সদস্যরা ১৯৭৩ সালে ভারত সফর করে সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কমিশন সরকারি প্রস্তাবনানুসারে ১৯৭৩ সালের জুন মাসে খসড়া রিপোর্ট পেশ করেন। ১৯৭৪ সালের ৩০ মে কমিশন চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেন। ৩৬ অধ্যায়ে বিভক্ত প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টে সকল নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে “শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সৃষ্টিকে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কমিশনের সুপারিশের আলোকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একত্রে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় একযোগে সরকারিকরণ করেন। এবং পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের উদদোগ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নিষ্ঠুরতম ক্ষমতালোভী হায়েনারা ১৫ই আগস্ট’৭৫ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ফলে এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষা কমিশন কাজী জাফর- আবদুল বাতেন, কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আংশিক বহাল রেখে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। কিন্তু জিয়াউর রহমান এর হত্যাকাণ্ডের পর এই রিপোর্ট আর আলোর মুখ দেখেনি।
এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ১৯৮৩ সালে মজিদ খান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এই রিপোর্টে ছাত্রদের বেতন বৃদ্ধির কথা উল্লেখ থাকায় ছাত্ররা এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। পরে এই শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার। পরবর্তীকালে ১৯৮৭ সালে মফিজ উদ্দিন শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এই শিক্ষানীতির কিছু অংশ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল বটে। এই শিক্ষানীতির আলোকে ইংরেজি শিক্ষার পুনঃপ্রবর্তন, মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, ছাত্রসংসদ নির্বাচন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই শিক্ষানীতিও বাস্তবায়ন সামনে এগোয়নি।

পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হলেও পুরোনো শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন কিংবা নতুন কোন শিক্ষানীতি প্রণয়নের আর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
১৯৯৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হলে মেয়াদের শেষ দিকে ২০০০ সালে ড. সামশুল হক শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। ওই শিক্ষানীতিও ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতির আদলে প্রণীত হয়েছিল। সংসদে শিক্ষানীতি পাসও হয়েছিল, কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে কাজ শুরু হওয়ায় এই শিক্ষানীতি আর বাস্তবায়ন চাপা পরে যায়।

অবশেষে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবারো ক্ষমতায় এলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এর একান্ত সদিচ্ছায় ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট এবং ২০০০ সালের ড. সামশুল হক শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং অর্থনীতিবিদ ড. খালেকুজ্জামানকে কো-চেয়ারম্যান করে ১৮ সদস্যের শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়া ২রা সেপ্টেম্বর-২০১০ সরকারের কাছে পেশ করে এবং ১৭ ডিসেম্বর’১০ মহান জাতীয় সংসদে এই শিক্ষানীতি পাস হয়। এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকার ২৪ টি সাবকমিটির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। এই শিক্ষানীতির শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে “সবরকম বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। এই শিক্ষানীতিতে ২৫তম অধ‍্যয়ে বলা হয়েছে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সতন্ত্র বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। শিক্ষকদের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রনোদনা প্রদান করা হবে”। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের উল্লেখিত সুবিধা দেয়া তো দূরে থাক, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রচলিত বেতন কাঠামোর সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ৪৯ বছর ধরে পরিকল্পনা বিহীন চলতে পারে এটা চিন্তারও বাইরে। অথচ প্রতিটি বাজেট ঘোষণায় বলা হয়েছে, শিক্ষার উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ কোন সরকারই শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২.৪ শতাংশের বেশি ব্যয় করেনি।

বিগত সরকারগুলোর শিক্ষার প্রতি চরম উদাসীনতাই বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দায়ী। তদ্রূপ সমানভাবে দায়ী, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ, শিক্ষক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক ও সমাজের শিক্ষানুরাগী ব‍্যাক্তিবর্গ। তথাপি কাউকে দোষারোপ করে নয়, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে সরকার তথা সমাজের প্রতিটি শ্রেণী পেশার শিক্ষানুরাগী মানুষদেরই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতাময় বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হলে আমাদের সর্ব প্রথম নজর দিতে হবে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা ও সচ্ছলতা রক্ষায়। শিক্ষকদের অসচ্ছল ও অভুক্ত উদরে রেখে মানসম্মত শিক্ষার প্রত‍্যাশা কাল্পনিক। যে শিক্ষকরা কারিগরি দক্ষ, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রযুক্তিনির্ভর, আদর্শ,সৎ,ও দেশপ্রেমিক জনশক্তি তৈরি করবেন সর্বাগ্রে সেই শিক্ষকদের মর্যাদাশীল করা জরুরি।অন্যথায় শিক্ষানীতির কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব হবে না।

বিশেষ করে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে মাধ‍্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কেননা এই স্তরের শিক্ষা সমাপ্তির পর শিক্ষার্থীরা হয় জীবনের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে অথবা উচ্চ শিক্ষার দিকে ধাবিত হয়। সেহেতু এই স্তরটি শিক্ষার্থীদের কর্মজীবন মুখী শিক্ষা গ্রহণের স্তর । প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর মানুষের সন্তানদের শিক্ষা সহজলভ্য করতেই এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করা প্রয়োজন। শিক্ষা পণ্য নয়, শিক্ষা সেবা। শিক্ষাব্যবস্থা সরকারিকরণের মাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে সকল ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, সকল নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতকরণ,একমাত্র সমাধান শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ।


Categories