রক্তদানে উজ্জল দৃষ্টান্ত সাপাহার রক্তদাতা সংগঠন

প্রকাশিত: ৪:১০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২২

বাবুল আক্তার, স্টাফ রিপোর্টার: “রক্ত দিলে হয়না ক্ষতি, জাগ্রত হয় মানবিক অনুভ‚তি” এই স্লোগানকে সামনে রেখে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সাপাহার রক্তদাতা সংগঠন। দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবৎ রোগীদের রক্ত দিয়ে সহযোগীতা করে চলেছেন সংগঠনের রক্তযোদ্ধাগন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার থেকে শুরু করে সাংবাদিক, শিক্ষক,শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী সহ তৃণম‚ল পর্যায়ের লোকেরাও স্বেচ্ছায় রক্ত দান করেছেন এই সংগঠনের অনুপ্রেরণায়। যারা রক্ত দিতে ভয় পেতেন তারাও এখন অন্যদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে রক্ত দান শুরু করেছেন। বর্তমান সময়ে কোন রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলেই এই সংগঠানের মাধ্যমে সহজেই রক্ত পেয়ে যান। ভুক্তভোগী রোগীদের রক্ত যোগাড় করে দেওয়াই যেন ব্রত এই সংগঠনের।

জানা গেছে, এই উপজেলায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের রক্ত যোগাড় করে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে ২০১৭ সালের ৪ জুলাই একদল তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত হয় সাপাহার রক্তদাতা সংগঠন। সদরে মানুষের সেবায় স্বেচ্ছায় রক্তদানের সর্বপ্রথম উদ্যোগ গ্রহন করেন উপজেলার চাকুরীজিবী রাজিব হোসেন ও বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী অনিক চৌধুরী সহ কয়েকজন তরুণ। প্রথমে তারা অবকাঠামো তৈরী করণের লক্ষ্যে একদল উজ্জীবিত তরুণদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষের মাঝে রক্তদানের আগ্রহ সৃষ্টি করতে থাকে সংগঠনটি। সদরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয় ব্যানার। এরপর উপজেলায় প্রথম শুরু হয় রক্তদানের একটি সংগঠন। অনেকে প্রথম অবস্থায় রক্ত দিতে ভয় পেতেন। কিন্তু রক্তদাতা সংগঠণের অনুপ্রেরণায় এখন অনেকেই স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসছেন। এমনকি অনেক মহিলারাও স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন। সাপাহার রক্তদাতা সংগঠনের মাধ্যমে এই পর্যন্ত স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ। সংগঠনের মোট রক্তদাতা ১হাজার জন। তার মধ্যে নিয়মিত রক্তদাতা রয়েছেন ৫শ’ জনেরও উপর।এই সংগঠনের প্রধান কাজ হলো রক্তশুণ্যতা সহ বিভিন্ন অপারশনে রক্তক্ষরণ হবার পরে যদি কোন রোগীর রক্ত লাগে তা ব্যবস্থা করে দেওয়া। কোন রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলেই নিজ উদ্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়েন সংগঠনের সদস্যগণ। গ্রæপের সাথে মিলে গেলে নিজেরাই দান করেন রক্ত। নয়তো স্বেচ্ছায় রক্তদানে আগ্রহীদের ডেকে নিয়ে রোগীর রক্তের ব্যবস্থা করে দেন তারা।

মেশকাত জাহান নামে এক থ্যালাসেমিয়া রোগীর মা বলেন, আমার বাচ্চাকে প্রতি দুই মাস পর পর রক্ত দিতে হয়। প্রাথমিক অবস্থায় আত্মীয় স্বজনরা রক্ত দিতেন। পরে যখন রক্ত সংকটে ভুগতাম তখন জেলা শহর বা বিভাগীয় শহর রাজশাহী ব্লাড ব্যাংক হতে রক্ত কিনতে হত। আমরা গরীব মানুষ। এত টাকা দিয়ে রক্ত কেনা সম্ভব ছিলোনা। পরে সাপাহার রক্তদাতা সংগঠনের সন্ধান পাই। এখনো পর্যন্ত তারা আমাকে বিনা পয়সায় রক্ত ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়াও কাঁদোস্বরে রক্তদাতা সংগঠনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
রক্তদাতা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অনিক চৌধুরী বলেন, আমরা এই ছোট্ট শহরে মানবতার সেবায় কাজ করার উদ্যোগ নেই। এই অঞ্চলের অনেক রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হলে নানা রকম বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হতো। যাতে করে রোগীদের রক্ত ব্যবস্থা করা যায় এজন্য আমরা বিনাম‚ল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদান করার লক্ষ্য নিয়ে একটি কমিটি গঠন করি। আমরা নিজেরাও রক্ত দান করি এবং অন্যদের রক্ত দান করতে উদ্বুদ্ধ করি। যার ফলে এই এলাকায় বর্তমানে অনেক রক্তদাতাগন নির্ভয়ে স্বেচ্ছায় রক্ত দান করেন।
সংগঠনের নিয়মিত রক্তদাতা টিটুল জানান, আমি রক্তদাতা সংগঠনের নিয়মিত রক্তদাতা। আমি এই পর্যন্ত ৩০ব্যাগের উপর রক্ত স্বেচ্ছায় দান করেছি। রক্ত দিলে যেমন নিজের শরীর হাল্কা হয় অপরদিকে একজন মানুষও বেঁচে যেতে পারে।
সংগঠনের সাধারন সম্পাদক বনি ইসরাইল বলেন, “আমরা ২০১৭ সালে সংগঠনের প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে স্বেচ্ছায় কাজ করছি। আগে রক্তদাতার সংখ্যা অনেক কম ছিলো। যাতে ঘরে ঘরে রক্তদাতা তৈরী করতে পারি এ প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছি।”
সাপাহার রক্তদাতা সংগঠনের সভাপতি নাসরিন জাহান নিতু জানান, আমরা দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নিঃস্বার্থ ভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করে চলেছি ।সাপাহার রক্তদাতা সংগঠন একটি অরাজনৈতিক, অলাভজনক এবং স্বেচ্ছায় রক্ত দান সংগঠন । আমাদের এই সংগঠন সাপাহার উপজেলার কিছু উদ্যোমী তরুণদের হাত ধরে শুভ স‚চনা করে। বর্তমানে আমাদের এই সংগঠনের মাধ্যমে অনেক মানুষ রক্ত পেয়ে থাকেন। আমরা রক্তদানের পাশাপাশি নানা ধরণের সামাজিক কর্মকান্ড করে থাকি। যার মধ্যে বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়ন কল্পে নিজ তহবিল থেকে দান, শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি। যাদের দিকনির্দেশনা, অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতাতে সাপাহার রক্তদাতা সংগঠন আজ সামনে পথ চলার সাহস পেয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।


Categories