**মোবাইল যখন আসক্তি** ফয়জুন্নেসা জেসমিন

প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২০

প্রভাতের শিশির ভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা কিংবা ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায় প্রাতঃভ্রমন করার আনন্দ থেকে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বঞ্চিত। অনেক রাত অবধি মোবাইল চালিয়ে দেরী করে ঘুম থেকে উঠা ওদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মোবাইল ব্যবহারের কুফলগুলো জেনে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শন্কা জাগছে মনে। মোবাইল আসক্তি, হতাশা, মানসিক চাপ ছাড়া ও ব্যাকপেইন, দৃষ্টিশক্তি সমস্যা, স্নায়ু সমস্যা দেখা দেয় অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে। পুরো বিশ্বেই স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারীর অবস্থা কম বেশী একইরকম। কাউকে যদি বলা হয় তাকে ফোন ছাড়া থাকতে হবে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করে। মনোবিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন ”নোমোফোবিয়া”। আমেরিকার University of Arizona র এক গবেষণা অনুযায়ী, একটি টয়লেট সিটের উপরিভাগে যে পরিমান ব্যাকটেরিয়া থাকে তার ১০ গুণ বেশী ব্যাকটেরিয়া থাকে আমাদের স্মার্ট ফোনে। অথচ আমরা সঠিক পদ্ধতিতে পরিস্কার ছাড়াই সারাদিন ফোন হাতে রাখি ও কল আসলে মুখে লাগাই।
আগে সকালে বাংলার প্রতিটি মুসলমানের ঘর থেকে শোনা যেতো প্রবিত্র কোরআন সুর করে পড়ার আওয়াজ। সন্ধ্যায় ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি ঘর থেকে শোনা যেতো পাঠ্য বই জোরে জোরে পড়ার আওয়াজ। আজ তা শুধুই অতীত। বিখ্যাত মনিষী ব্রেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, ভোরের মুখে সোনা রং থাকে। গবেষণায় দেখা যায় যে, দেরী করে ঘুম থেকে উঠলে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে। ভোরে উঠার উপকারিতা জেনে ও অভ্যাস ত্যাগ করতে পারছে না বর্তমান প্রজন্ম। সেই বিখ্যাত স্তবকগুলো ও যেন আজ অসহায়—

Early to bed, early to rise,
Makes a man healthy, wealthy and wise.

সেদিন এক রিকশাওয়ালা বলল, “রাস্তা দিয়ে রিকশা চালাতে চালাতে কত কি যে দেখি! দু ‘ পাশের রাস্তার ধারে মাথা ঝুঁকে বসে তরুণরা মোবাইল চালায়। অনেকে আবার হাঁটা অবস্থায় মোবাইল চালাতে চালাতে অন্যমনস্ক হয়ে রিকশার সাথে ধাক্কা খায়। তখন কেউ বলে, সরি। আবার কেউ বলে, দেখে চালাতে পারো না! রাবিশ!! অনেক সময় রিকশার যাত্রীরা মোবাইল চালানোয় এত মগ্ন থাকে যে গন্তব্যস্থল এলে ও খবর থাকে না। তাদেরকে গন্তব্যের কথা জানাতে হয়”।

মোবাইলে ব্যস্ততা

কিছুদিন আগে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে পড়লাম বিপাকে। ঐ মুহূর্তে স্ত্রীর সাথে উনার তুমুল বাকবিতন্ডা চলছিল। আমাকে দেখেও থামাথামি নেই। বরং আমার কাছে পরস্পর পরস্পরের নামে দোষারোপ করছিল। হঠাৎ ওদের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে তামান্না মায়ের হাতে মোবাইল দিয়ে কি যেন দেখাল। মনে হলো, যাদুর পরশ লাগলো! রাগ কোথায় উবে গেল। তামান্না হেসে আমার দিকে তাকাল। কাছে এসে বলল, “ঔষধ দিলাম, আন্টি। এখন সব ঠান্ডা”। ঐ আত্মীয় আমাকে মোবাইল ব্যবহারের সুফল – কুফল সম্পর্কে বলতে লাগলেন। ঝগড়ার ইস্যুটা ও বললেন, উনার ভার্সিটি জীবনের বান্ধবী একটি ছবি পোস্ট করেছিল। ঐ ছবিতে উনাকে বান্ধবীটির পাশে দেখা গেছে ভীষন হাসি খুশী অবস্থায়। তারপর উনি ফোনে ঐ বান্ধবীর সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছিলেন। তাতেই উনার স্ত্রী রেগে আগুন। তার আপত্তি, বিয়ের পর থেকে নাকি কখনো স্ত্রীর সাথে এমন হাসি খুশী দেখা যায়নি যেমন দেখা গেছে ছবিতে কিংবা উক্ত বান্ধবীর সাথে কথা বলা অবস্থায়। ফেসবুকের সুবাদে আজ প্রায় ২০ বছর পর বান্ধবীকে দেখলেন। কত কত স্মৃতিময় সেই দিনগুলোর বন্ধু বান্ধব!! সত্যিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যানে আজ তা সম্ভব হয়েছে। এ যেন মোবাইলের এক বিশাল সুফল দিক! তাছাড়া আমাদের সুখ দুঃখের অনুভূতি প্রকাশের সহজ মাধ্যম মোবাইল। তবে যারা আমাদের মুরুব্বি তথা আমাদের এক ক্লাস কিংবা দুই ক্লাস উপরের সেকেলে শ্রেণির তাদের কাছে সবটাই কুফল। তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “কি যে যুগ আসলো! কারো সময় নেই দুদন্ড কথা বলার। সবাই ব্যস্ত মোবাইল নিয়ে। এত অস্থিরতা!” কথাটা অবশ্য সত্যি। নেটের বাইরের কারো সাথে কথা বলার সময় যেন এখন নেই। নেটের জালে জালবন্দী যেন। নেটে নেটেই চলে চ্যাটিং। আগে মায়ের কাছ থেকে মেয়েরা সেলাই, কয়েক পদ রান্না ও ঘরোয়া টিপস শিখতো। হাতপাখা , পিঠা, কাঁথা ও বিভিন্ন সেলাই করায় ব্যস্ত থাকতো পরিবারের মেয়েরা। এখন ওসব কারুশিল্পের আবেদন অনেকটাই  স্তিমিত। এখন নেট শিক্ষকের কাছ থেকে প্রায় অনেক কিছুই জানা যায়। তাই হয়তো অভিভাবকদের কাছ থেকে জানার আর প্রয়োজন হয় না। বর্তমানের প্রেম ভালোবাসায় ও মোবাইলের দাপুটে ভূমিকা। একদিন নাটকে নায়ক নায়িকার প্রেমের দৃশ্য দেখে মুরুব্বি একজন বললেন, “আমাদের সময়ের প্রেম ছিল টিপু সুলতান টাইপের অর্থাৎ পর্দার আড়ালের। তখনকার লাজুক লাজুক প্রেমে এক ধরনের শিহরণ ছিল। আর এখন প্রেম হয়ে গেছে খোলামেলা। আষাঢ় – শ্রাবনের রোদ- বৃষ্টির মতো। হঠাৎ ঝগড়া—- মার-মার, কাট-কাট,আবার হঠাৎ ভালোবাসা।”  উনাদের তুলনায় কিছু টা একেলে আমাদের প্রেম বিষয়ক কথায় ও আচরণে ছিল মোটামুটি রাখ ঢাক। একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসে বড়জোর হাত ধরাধরিতে নিজেদের সীমিত রাখতো আমাদের সময়কালের অধিকাংশ প্রেমিক প্রেমিকা। অনেক সময় ফুল দিয়ে ও ভালবাসা নিবেদন করা হতো—

আমাদের সময়কার প্রেম

প্রথম আলো পত্রিকায় শ্রদ্ধেয় মোস্তফা মনোয়ার লিখেছিলেন, এখনকার প্রেমের তিনটে মূল ভিত্তি।

প্রথমতঃ- বিশ্বাস যার অপর নাম ফেসবুক পাসওয়ার্ড যা প্রেমিক প্রেমিকার কাছে বন্ধক বাখতেে হবে নচেৎ..। দ্বিতীয়তঃ খাওয়া দাওয়া। চেহারা ও গলার স্বর থেকেই বুঝে নিতে হবে সে খেয়েছে কি খায়নি নচেৎ…। একটি ঘটনা ও উল্লেখ করেছিলেন– মন খারাপ থাকায় প্রেমিকা ভাত না খেয়েও প্রেমিককে বলেছিল খেয়েছেে, প্রেমিক তা ধরতে পারেনি বিধায় সম্পর্ক কাট আপ।     তৃতীয়তঃ- ভালবাসার প্রকাশ। ফেসবুকে দৈনিক তাকে ট্যাগ করে একটা স্ট্যাটাস দিতে হবে ( আমার জানুটা কত্তো ভালো…. এই টাইপ)। আর বিশেষ বিশেষ দিনে তাকে নিয়ে তোলা প্রোফাইল পিকচার / কভার ফটো তো মাস্ট। কালের কন্ঠ পত্রিকায় প্রেমের সেকাল- একাল নামক ফিচারে জনাব রফিকুল ইসলাম কামাল লিখেছিলেন, আগেকার প্রেম ছিল চোখে চোখে। এখনকার প্রেম হচ্ছে ফেসবুকের ইনবক্সে — love you লেখার সাথে সাথেই উত্তর ; হয় ব্লক খাওয়া নতুবা me too, Janu. আগে প্রেমিক প্রেমিকার মনে কোন কিছু ফাঁস হওয়ার ভয় ছিল না। এখনকার প্রেমিক প্রেমিকারা স্ক্রিনশট ফাঁস হওয়ার ভয়ে থাকে। এই হলো বর্তমান মোবাইল কালের প্রেমের অবস্থা।

বর্তমান সময়ের মার-মার কাটকাট প্রেম

আজকাল নাকি দীর্ঘ লেখা মানুষ তেমন পড়তে চায় না। স্বল্প ও সংক্ষিপ্ত লেখা পছন্দ করে অধিকাংশ মানুষ- বর্তমান প্রজন্মের একজন বললো। আমি বললাম, “তোমাদের problem হচ্ছে তোমরা সব শর্টকার্টে পেতে চাও। অর্থ সম্পদ, সাফল্য, ভালবাসা..। এজন্য তোমরা বেছে নাও শর্টকার্ট উপায় – তার ভাল মন্দ বিচার না করেই”।
বিশ্বের মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ( জি এস এম) এর এক প্রতিবেদনে ২০২০ সালে বাংলাদেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী হবে ৬০ শতাংশ। এ সময়ে স্মার্ট ফোন ব্যবহার বৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ টি দেশের মধ্যে ৭ নম্বরে উঠে আসবে বাংলাদেশ। যা বাস্তবিকই চিন্তার বিষয়।
আমরা জানি, “Excess of anything is bad”. স্মার্ট ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারে বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে তৈরি হতে পারে মোবাইল আসক্তি। শৃঙ্খলিত হতে পারে তাদের জীবন-দর্শণ, মন ও মনন….

মোবাইল দ্বারা শৃঙ্খলিত

এ আসক্তি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আত্ম – উপলব্ধি, ইচ্ছাশক্তি, অপ্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার না করা, রাতে ঘুমানোর সময় মোবাইল বিছানায় না রাখা, অন্য কাজে মনোনিবেশ করা ইত্যাদি। মোবাইলের এ সর্বনাশা আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু অ্যাপ — ইউর আওয়ার,
অ্যাপ ব্লকার, স্টে ফোকাস। ব্যবহার করা যেতে পারে এসব অ্যাপ। মোবাইল ব্যবহারকালীন সময় ২০-২০-২০ রুল অনুসরণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট মোবাইল চালানোর পর ২০ সেকেন্ড ধরে ২০ ফুট দুরের কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকা। এতে করে চোখের উপর চাপ কমবে।
যাদেরকে নিয়ে আমাদের স্বপ্ন ও যাদের উপর আমাদের নির্ভরতা তারাই যদি মোবাইল নির্ভর হয়ে পড়ে তবে অন্ধকারের করাল গ্রাসে আচ্ছন্ন হতে পারে জাতি। মোবাইলের যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে এর সুফলতায় বয়ে আনা সাফল্যের আলো যেন ছড়িয়ে পড়তে পারে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে- সে ব্যাপারে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে । মোবাইল আসক্তির মহামারী থেকে জাতির কর্ণধার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সকলকেই।

প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ।


Categories