মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের অধরা ট্রফিটা অবশেষে জিতল বাংলাদেশ।

প্রকাশিত: ১১:১৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২২

আসলে হিমালয়ের চূড়ায় ওঠা এই বাংলাদেশকে থামানোর সাধ্য যে নেপালের ছিলই না। মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের অধরা ট্রফিটা অবশেষে জিতল বাংলাদেশ। ফাইনালে আজ স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়েছেন সাবিনারা। প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শিরোপা যাচ্ছে বাংলাদেশের ঘরে। এমন দিনে, স্মরণীয় জয়ে শামসুন্নাহার করেছেন প্রথম গোল। পরের দুটি কৃষ্ণা রানী সরকারের। ২–০ হওয়ার পর নেপালের গোলটি করেন অনিতা বাসনেত।

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ৪৫ ধাপ এগিয়ে নেপাল। বাংলাদেশের র‌্যাঙ্কিং ১৪৭। নেপালের ১০২। অতীত পরিসংখ্যানও ছিল নেপালের পক্ষে। এর আগে বাংলাদেশ–নেপাল ৮ বারের সাক্ষাতে ৬ বার জয় নেপালের। ২ বার ড্র। আর ঘরের মাঠের দর্শকদের গগনবিদারী আওয়াজ তো ছিলই। কিন্তু কোনো কিছুই যেন আটকে রাখতে পারেনি বাংলাদেশের মেয়েদের।

ম্যাচের প্রথম মিনিটেই সুযোগ ছিল বাংলাদেশের গোল পাওয়ার। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া মারিয়ার দূরপাল্লার শট নেপালের গোলরক্ষক আনজিলা সুব্বা আটকালেও পুরোপুরি গ্লাভসে জমাতে পারেননি। সিরাত জাহানের শট শেষ পর্যন্ত কর্নারের বিনিময়ে ফেরান আনজিলা।

চোট নিয়েই আজ খেলতে নেমেছিলেন স্ট্রাইকার সিরাত জাহান। কিন্তু মাঠে নেমে তিনি বেশিক্ষণ খেলতে পারেননি। ব্যথায় কাতর সিরাতকে ১৩ মিনিটেই কোচ গোলাম রব্বানী তুলে নিতে বাধ্য হন। এরপর বদলি হিসেবে নামান শামসুন্নাহার জুনিয়রকে। কিন্তু কে জানত এই সুপার সাবই এগিয়ে নেবেন বাংলাদেশকে। শামসুন্নাহার নামতেই খেলার গতি বেড়েছে আরও।

ম্যাচের ১৪ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে মনিকার বাড়ানো বলে দারুণ ফ্লিকে গোল করেন শামসুন্নাহার। ৩৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি–কিক নেন নেপালের দীপা শাহি। কিন্তু শটটি দারুণ দক্ষতায় ফিস্ট করেন রুপনা। গোল শোধে মরিয়া নেপাল তখন পাল্টা আক্রমণে ব্যস্ত। কিন্তু ৪১ মিনিটে নেপালি দর্শকদের স্তব্ধ করে দেন কৃষ্ণা। সাবিনার ডিফেন্স চেরা পাস ধরে বক্সে ঢোকেন কৃষ্ণা। দুর্দান্ত হাওয়ায় ভাসানো শটে গোলকিপার আনজিলার মাথার ওপর দিয়ে বল জড়ান জালে ২-০।

পিছিয়ে পড়া নেপাল তখন মরণকামড় দিতে ব্যস্ত। দলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সাবিত্রা ভান্ডারি ছিলেন ডেঙ্গু জ্বরে অসুস্থ। পুরোপুরি ফিট না হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে নামিয়ে দেন নেপালের কোচ। সাবিত্রা নামার পর আক্রমণ বেড়েছে নেপালের। সাবিত্রা আর অনিতা মিলে বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের বক্সেও ঢুকেছেন। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে ঢোকেন অনিতা। শামসুন্নাহারকে ফেলে সহজেই ঢুকে যান বক্সে। এরপর কোনাকুনি শটে বাংলাদেশের জালে জড়িয়েছেন বল। মুহূর্তেই যেন আবারও জেগে ওঠে দশরথ স্টেডিয়াম। কিন্তু সেই উল্লাস আবারও থামিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশ।

কোচ গোলাম রব্বানী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবার বদলে যাওয়া বাংলাদেশকেই দেখা যাবে। কথা রেখেছেন তিনি। হিমালয় জয় করেই দেশে ফিরছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। ১৯৯৯ সালে এই নেপালেই প্রথমবার দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়েছিল বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দল, ২২ বছর পর সেই নেপালেই সেরা হলেন মেয়েরা।

সাবিনা খাতুনের একমাত্র আক্ষেপ হয়তো ফাইনালে গোল না পাওয়া! দল শিরোপা জেতার পর সাবিনা খাতুনের সেটাও ততটা থাকার কথা নয়। দেশের প্রথম সাফ শিরোপাজয়ী অধিনায়ক, এটাই আনন্দে ভেসে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও দুটি বড় প্রাপ্তি, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলের পুরস্কার। সব মিলিয়ে সাবিনার কাছে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ তার ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত।

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ছয়বারের চেষ্টায় প্রথমবারের মতো শিরোপা জিততে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে পাঁচ আসরে সাফের মঞ্চে খেলতে নেমে একবারই মাত্র ফাইনালে উঠতে পেরেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা।

সেটিও ৬ বছর আগে ২০১৬ সালে। সেই আসরে বাংলাদেশ ফাইনাল ম্যাচ মিলিয়ে মোট গোল করেছিল ১৩টি। যা ছিল সাফের কোনো একটি নির্দিষ্ট আসরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।

এবারের আসরে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করেছে বাঘিনীরা। প্রথমবারের মতো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে গোলাম রাব্বানী ছোটনের দল। আর প্রথমবার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে ৫ ম্যাচ থেকে ২৩ গোল আদায় করে নিয়েছে বাঘিনীরা।

যা সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে বাংলার মেয়েদের জন্য রেকর্ড। এমনকি এবার শিরোপা জেতার পথে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১ গোল হজম করেছে রুপনা চাকমা। অতীতের পাঁচ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিটিতেই এর চেয়ে বেশি গোল হজম করেছিল বাংলাদেশ।

এবারের আসরে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ থেকে ১২ গোল আদায় করে নিয়েছে বাংলাদেশ। যেখানে ভারত ও মালদ্বীপের বিপক্ষে সমান ৩ গোল করে করেছিল বাঘিনীরা। গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের বিপক্ষে আদায় করে নিয়েছিল অর্ধডজন গোল।

এরপর সেমিফাইনালে ভুটানের বিপক্ষে ছিল আরও বেশি আগ্রাসী। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ভুটানের জালে পাক্কা দুই হালি (৮) গোল দিয়েছিল বাংলাদেশ। আসরের প্রথম চার ম্যাচে ২০ গোল দিলেও একটিও হজম করেনি বাঘিনীরা।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে নেপালের দশরথের রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের ৩-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।

সোমবার তাদের এই জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


Categories