মেজর (অব.) সিনহা হত্যা : মৃত্যু নিশ্চিত করতে গুলি করেন ওসি প্রদীপও

প্রকাশিত: ৪:৫৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০২০
অাবদুল মান্নান, কক্সবাজার।।
পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। তার মরদেহের ময়নাতদন্তেও চারটির বেশি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। এর আগে সুরতহাল প্রতিবেদনে মরদেহে ছয়টি গুলির চিহ্ন পায় কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যক্তি বলেন, সেই রাতে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী চারটি গুলি ছোড়ার পর চরম আহত অবস্থায় মেজর রাশেদকে ফেলে রাখে। কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে গিয়ে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ মৃত্যু নিশ্চিত করতে সিনহার শরীরে আরো দুটি গুলি করেন।
গত ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে সিনহা রাশেদ নিহত হওয়ার পর বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক নন্দদুলাল রক্ষিতের এজাহারে উল্লেখ আছে যে, সেই রাতে পরিদর্শক লিয়াকত সিনহার দেহে চারটি গুলি করেন।
পরদিন ১ আগস্ট কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম নিহত সিনহার লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করেন।সেই রিপোর্টে মেজর সিনহার মরদেহে ছয়টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যাওয়ার প্রতিবেদন উল্লেখ করেন । এ বিষয়ে পরিদর্শক সাইফুল কয়েকটি  গণমাধ্যম কে বলেন, ‘আমি মেজর সিনহার মরদেহ তন্ন তন্ন করে দেখেছি। মরদেহে আমি মোট ছয়টি ফুটো দেখতে পেয়েছি, যা সুরতহাল রিপোর্টে উল্লেখ করা আছে।’
টেকনাফ থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলা এবং সুরতহাল রিপোর্টের গুলি ও মরদেহে গুলির চিহ্ন নিয়ে ভিন্ন তথ্যের পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় ছিলেন তদন্তকারী দল। গতকাল কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তদন্তকারী সংস্থা এলিট ফোর্স র‌্যাবের হাতে পৌঁছায়। ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। তবে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সিনহার মরদেহে চারটির অধিক গুলির চিহ্ন মিলেছে।
অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শী ইজি বাইক (টমটম) চালক সরওয়ার কামাল গতকাল বিকেলে গণমাধ্যম কে  বলেন, পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত গুলি করার পর মোবাইলে বলেন, ‘স্যার তিনটি দিয়েছি।’ টমটমচালক আরো জানান, এর কিছুক্ষণ পর টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়া মেজর সিনহার বুক-পিঠে লাথি মেরে কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দিয়ে আরো দুটি গুলি করেন। তার এই বক্তব্যের ভিডিও এখন ভাইরাল হয়ে গেছে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সরওয়ার কামাল জানান, তিনি গত ৩১ জুলাই সন্ধ্যার পর শামলাপুর লামার বাজার থেকে  গিয়ে পরদিন ঈদুল উপলক্ষে একটি পাঞ্জাবি ক্রয় করেন। ঘটনাস্থলে মেরিন ড্রাইভের পাশে ব্রিজে বসে সিগারেট টানছিলেন। এমন সময় তিনি দেখেন পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত ও তদন্তকেন্দ্রের ক্যাশিয়ার (কনস্টেবল) মামুন কক্সবাজারমুখী একটি কার থামান। কার থেকে এ সময় এক ব্যক্তি নামতেই পরিদর্শক লিয়াকত পর পর তিনটি গুলি করেন। এরপর ওই ব্যক্তির অন্য সঙ্গী নামতেই তাঁর পা লক্ষ্য করে একটি গুলি করেন। তবে সেই গুলি তাঁর পায়ে লেগেছে কি না তিনি জানেন না। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাস্থলে ওসি প্রদীপ এসে মেজর সিনহার শরীরে দুই রাউন্ড গুলি করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলে চারটি গুলির হিসাবই মামলার মাধ্যমে দিয়েছেন ওসি প্রদীপ। ফলে তিনিসহ আর কেউ বেশি গুলি করে থাকলে সেটিও এখন বড় অপরাধ হয়ে যাবে। কারণ সরকারি প্রতিটি গুলিরই হিসাব দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে কোটি টাকার প্রশ্ন —তাহলে বেশি গুলি কোথা থেকে এলো? সেই গুলি কি অবৈধ ?
এদিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি ও আদালতের নির্দেশে এলিট ফোর্স র্যাব তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। আসামি পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও সদ্য বরখাস্ত ওসি প্রদীপ সহ সাত পুলিশ আসামির রিমান্ড কার্যক্রম আজ থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

Categories