মুজিব বর্ষেও শিক্ষকদের জন্য খয়রাতি বোনাস!

প্রকাশিত: ৫:২৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০

এ.কে.এম সেলিম:
অনেক স্বপ্ন ছিল
ছিল বুক ভরা আশা,
মুজিব বর্ষে পূরণ হবে
শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা!

কিন্তু বুমেরাং! কিছুই হয়নি।মুজিব বর্ষ উপলক্ষে শিক্ষক সমাজ আশায় ছিল এবার হয়তো শতভাগ ঈদ বোনাস পাওয়া যাবে।কিন্তু না।শিক্ষকদের আশায় ছাঁই ঢেলে এবারও দেওয়া হচ্ছে খয়রাতি বোনাস!কেসিনো সম্রাট, রিজেন্ট শাহেদ কিংবা জেকেজি সাবরিনা দেশের সাথে প্রতারণা করে শত শত কোটি টাকা লুট করলেও দেশ গরিব হয়না। একটি বালিশের দাম সাত হাজার টাকা কিংবা একটি কলার দাম এক হাজার টাকা ধরে বিল নিলেও দেশ গরিব হয় না! দেশের যত গরিবিয়ানা সব বেসরকারি শিক্ষকদের সুবিধা দেওয়ার বেলায়।বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ প্রক্রিয়া এ বছর নাও হতে পারে এটা আগেই ভেবেছিলাম। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের ‘শতভাগ বোনাস’ এটাতো মুজিব বর্ষের উপহার হতেই পারে! এ ব্যাপারে খুবই আশাবাদী ছিলাম।

সরকারি বেসরকারি সকল ক্ষেত্রে যেখানে পদ মর্যাদার ভিত্তিতে উৎসব ভাতা বা বোনাস দেওয়া হয় সেখানে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন চিত্র। এখানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা বোনাস পান মূল বেতনের ২৫% আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা পান মূল বেতনের ৫০%! আমি কখনোই এ বিষয়টি হিংসার দৃষ্টিতে দেখিনি।কারণ তারও এ টাকায় কিছুই হয়না।আমি শুধু এ বিষয়টাকে পদ মর্যাদার অবমাননা হিসেবেই দেখি।সরকারের এত এত প্রতিষ্ঠান থাকতে শুধুমাত্র এখানেই উদারতা দেখাতে হল কেন? শুধুমাত্র বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য দরদ উতলে উঠলো! শিক্ষকদের জন্য কেন দরদ হল না?

যাইহোক, মমতাময়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ পুরো জাতির কাছে প্রশ্ন – দেশের আর কোন সেক্টরে মূল বেতনের ২৫% বোনাস দেওয়া হয়? বেসরকারি এনজিও কর্মীরাও মূল বেতনের সমপরিমাণ বোনাস পেয়ে থাকেন।অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরাও মূল বেতনের সমপরিমাণ বোনাস পায়।তবে শুধুমাত্র শিক্ষকদের বেলায় কেন ভিন্ন হবে?

ঈদ মানে শুধু আনন্দ নয়।ঈদ মানে বাড়তি খরচও বটে।মুসলমান ভাইয়েরা দয়া করে কথাটা ভিন্নভাবে নিবেন না।একজন শিক্ষকের একটা পরিবার থাকে।ঈদ আসলে পরিবারের সদস্যদের বাড়তি কিছু চাহিদাও থাকে। কিন্তু ২৫% নামের এই খয়রাতি বোনাস দিয়ে আদৌ কি তা পূরণ করা সম্ভব? আজ বলতেই হচ্ছে- “আমি গর্বিত কারণ আমি শিক্ষক। কিন্তু আমি লজ্জিত কারণ আমি পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে পারি না।”

একজন সহকারী শিক্ষক (বিএড বিহীন) চাকরি জীবনে প্রবেশ করে ১১ তম গ্রেডের মাধ্যমে। যেখানে মূল বেতন ১২,৫০০ টাকা। সাথে বাড়ি ভাড়া ১,০০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে মোট বেতন হয় ১৪,০০০ টাকা।এখান থেকে আবার মূল বেতনের ১০% কর্তন করা হয় ১,২৫০ টাকা। অর্থাৎ মাস শেষে হাতে পান মাত্র ১২,৭৫০ টাকা। এ টাকায় একটি পরিবার নিয়ে বর্তমান বাজারে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা কতটা সুখের তা কেউ ভেবে দেখেছেন কি? এখন আসি একজন সহকারী শিক্ষকের বোনাসের হিসেবে। ১২,৫০০ টাকা মূল বেতনের একজন সহকারী শিক্ষক বোনাস পাবেন ২৫%। অর্থাৎ ৩,১২৫ টাকা।আর বিএড করা শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে বোনাস পাবে ৪,০০০ টাকা।এ পরিমান খয়রাতি টাকা কি আসলেই সরকার দিতে পারে? আমি বলবো একে বোনাস না বলে রাষ্ট্রীয় যাকাত বললেই উত্তম হবে।একজন শিক্ষক একটি সমাজে শ্রদ্ধাজন ব্যক্তি। সমাজে তার এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের আলাদা একটা মর্যাদা থাকে।এখন সেই ব্যক্তি যদি ঈদে তার পরিবারকে নতুন জামা দিতে না পারে কিংবা কোরবানি দিতে না পারে তাহলে কি তাঁর সম্মান থাকে? ৩,১২৫ টাকা আর ৪,০০০ টাকা নামের নামদস্তুর এই খয়রাতি বোনাস দিয়ে আসলেই কি দুইয়ের একটি চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব? বাধ্য হয়ে কিছু শিক্ষক প্রাইভেট পড়ায়।তাও সবাই না।বিএসসি আর ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকরা।এখানেও কড়া বাঁধা।সরকারি নিষেধ, নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানো যাবে না। শুধুমাত্র এরকম কঠোর নিয়ম আর নিষেধাজ্ঞা আসলেই মনে হয় যে শিক্ষকরা সরকারের সুনজরে আছেন।আর নয়তো সারা বছর বেসরকারি শুনতে শুনতে সরকারকে প্রায় ভুলেই যেতে হয়।

মানবতার মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার নিকট অনুরোধ বেসরকারি শিক্ষকদের দৈন্যদশা দূর করুন।শিক্ষকতাকে নিম্ন শ্রেণির বা গরিবী পেশা নামক বদনাম থেকে রক্ষা করুন।জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বেসরকারি শিক্ষকদেরকেও সামনের সারিতে জায়গা করে দিন।২৫% নামের খয়রাতি বোনাসের অবসান করে ১০০% বোনাস ও জাতীয়করণ ঘোষণা দিয়ে শিক্ষক সমাজের প্রাণের দাবি পূরণ করুন।

এ.কে.এম সেলিম
শিক্ষক ও সাংবাদিক
সহ সাংগঠনিক সম্পাদক,
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম(বাবেশিকফো),
নরসিংদী জেলা।


Categories