মুজিববর্ষেই সমগ্র বেসরকারি  শিক্ষা ব্যবস্থা  জাতীয়করণের ঘোষণা চাই। 

প্রকাশিত: ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০
বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  জাতীয়করণের স্বপ্ন এই মুজিববর্ষেই বাস্তবে রুপ দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট বিনীত অনুরোধ রইল।
বর্তমান সময়ে জাতীয়করণ  সকলের প্রাণের দাবি। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের যেহেতু ১০০ শতাংশ সরকারি অংশ দেওয়া হয়। সেহেতু সমগ্র বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করলে ক্ষতি কিসের। বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতার মধ্যে বিরাট বৈষম্য বিরাজমান। যা কোন দিনই ছিল না তাহলো সন্তানের শিক্ষা ভাতা, বদলি প্রথা এবং স্বল্প সুদে গৃহঋণ সহ নেই পেনশনের সুযোগ সুবিধা। এই কয়েকটি সুযোগ সুবিধার পূর্ণাঙ্গ রুপ দেওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ রইল।
প্রতিটি পেশায় আছে পরিবর্তন এবং আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় আজও হলো না কোন পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা রয়ে গেল এনালগ যুগে। আধুনিকতার পূর্ণাঙ্গ ছোঁয়া এখনো লাগেনি। শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো পর্যন্ত চরম বৈষম্য বিরাজমান। বর্তমান সময়ে পরিবর্তন এসেছে প্রতিটি সেক্টরে। সরকারি শিক্ষকরা পূর্ণাঙ্গ সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। কিন্তু  হতাশাগ্রস্ত রয়ে গেল বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজ।  দীর্ঘকাল ধরে পরে আছে বৈষম্যের যাঁতাকলে। একটি দেশের মেরুদণ্ড নির্ভর করে শিক্ষিত জাতির ওপর। আর এই শিক্ষিত জাতি গঠনের নিপুণ কারিগর বর্তমান সমাজে চরম হতাশায় নিমজ্জিত।  শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়।  কথায় আছে, যে দেশ যত বেশি শিক্ষিত সে দেশ তত বেশি উন্নত। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা কবজ হলো শিক্ষক সমাজ।  স্বাধীনতার এত বছরেও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পেল না স্বস্তি । বর্তমান সময়ে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন ধারণ করা অনেকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।  বৈষম্যের শিকলে বাঁধা পড়ে বেশিক জীবন আজ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিরব কান্না ছাড়া আর কোন গতি নেই। সামাজিক অবস্থা ও নড়বড়ে। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক পরিচয় দিলে  কেউ মূল্যায়ন করে না।  সরকারি এবং বেসরকারি এমপিওভুক্ত,স্বীকৃতি প্রাপ্ত নন- এমপিওভুক্ত এই তিন ধারায় বিভক্ত বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা।  কারিকুলাম এক এবং পাঠ্যপুস্তক এক তবুও শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম  বিভাজন বহমান। যুগ পাল্টাচ্ছে, জীবন যাত্রার মানের পরিবর্তন হয়েছে, দেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে গেছে এবং উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় দ্বিতীয়। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো পূর্বের ন্যায় বৈষম্য বিরাজমান।সরকারি শিক্ষকরা পায় পূর্ণাঙ্গ সুযোগ সুবিধা আর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পায় নাম মাত্র সুযোগ সুবিধা। শিক্ষা ব্যবস্থায় এ বৈষম্য বিরাজমান থাকার কারণে শিক্ষক অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে সর্বস্তরে।  বর্তমান সময়ে পরিবর্তন এসেছে  মাসিক সরকারি অংশ বা অনুদানের প্রতি মাসেই উত্তোলন করা যায়। কিন্তু ৭ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত সময় লেগে যায় ব্যাংকে বিল জমা হতে। বর্তমান সময়ে কিছুটা হলেও পরিবর্তন হয়েছে সরকারি অংশ বা অনুদান উত্তোলনে সত্য কিন্তু দুঃখের বিষয় বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আজও বাড়ি ভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতা,উৎসব ভাতা  পায় নাম  মাত্র।একজন সরকারি শিক্ষক ঈদ বোনাস পায় মূল স্কেলের সমপরিমাণ টাকা। আর একজন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক পায় মূল স্কেলের ২৫ শতাংশ।  যা বর্তমান সময়ের জন্য সত্যিই হতাশাজনক । বিশ্বের কোথাও শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া,  চিকিৎসা ভাতা এবং উৎসব ভাতা   এত নগণ্য তা লক্ষণীয় নয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশে শিক্ষকরা সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। শুধু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম বৈষম্য বিরাজমান আছে বলে মনে হচ্ছে। সভ্যতার পরিবর্তন হয়েছে। যুগের পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের জীবন যাত্রার মানের পরিবর্তন হয়েছে। সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বর্তমান বিশ্বের জন্য একটি রুল মডেল হিসেবে পরিগনিত।  প্রতিটি মানুষের মাথা পিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ আরও মেগা প্রকল্পের কাজ সরকার হাতে নিয়েছেন। অনেক প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ প্রান্তে। ডিজিটাল যুগে  শুধু মাত্র বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা অবহেলিত রয়ে গেল।
   অনেক শিক্ষকের আবার নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা।  পরিবারের ভরণপোষণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজের।   পরিবার বর্গের আশা পূরণ করা একজন শিক্ষকের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোন উপায় না পেয়ে তাই ধারদেনা কিংবা বিকল্প আয়ের উৎস খোঁজতে হয় পরিবারের  স্বপ্ন পূরণে।   প্রতিটি মুহূর্তে হিমশিম খেতে হচ্ছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের  জীবনযাপনে। আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বৈষম্যের অবসানকল্পে। মনে হচ্ছে  ভাগ্যের চাকায় জং ধরে গেছে। কেউ নেই দেখভাল করার। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা আজও রয়ে গেল এনালগ যুগে আধুনিকতার ছোঁয়া পড়েনি।  বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের  বহু দিনের লালিত স্বপ্ন জাতীয়করণ আজও অধরা রয়ে গেল।  দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত হচ্ছে তবুও বাড়ি ভাড়া কিংবা চিকিৎসা  ভাতা এবং উৎসব ভাতার কোন পরিবর্তন হলো না। বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে পে-স্কেল ঘোষণার মাধ্যমে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভাগ্যের কিছুটা হলেও পরিবর্তন করেছে সত্য কিন্তু  বাড়ি ভাড়া   পরিবর্তন  করে  ৫০০ টাকার বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে  ১০০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা করা হয়েছে ৫০০ টাকা।কিন্তু উৎসব ভাতার হলো না কোন পরিবর্তন। সেই ২৫ শতাংশ মূল স্কেলের।    যে সামান্য বাড়ি ভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয় বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের তা দিয়ে বাড়ি ভাড়া কিংবা চিকিৎসা কোন প্রয়োজনই মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা। বাংলাদেশের কোথাও বর্তমানে এই ১০০০ টাকায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। সর্বনিম্ন বাড়ি ভাড়া গ্রামাঞ্চলে যেখানে ৪০০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকা এবং শহরাঞ্চলের বাড়ি ভাড়া সর্বনিম্ন ১০০০০ টাকা থেকে ২০০০০ টাকা। এমতাবস্থায় শিক্ষকরা বাকি টাকার প্রয়োজন মিটাবে কীভাবে ? চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা যেখানে ডাক্তার ফি সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা। বাড়ি ভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতার প্রয়োজন মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে তা দিয়ে সংসারের ভরণপোষণ করা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। জীবন যাপন স্বাভাবিক রাখার জন্য  তাই  বিকল্প পথের সন্ধান করতে হয় বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। বিকল্প কোন পথ না পেলে ধারদেনার আশ্রয় নিতে হয় প্রতি মাসে।  শিক্ষকদের এ পিছুটান শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে বাধ্য। তাই শিক্ষকদের আগে স্বাবলম্বী করা প্রয়োজন।
নেই বদলি প্রথা। বদলি প্রথা শিক্ষা ব্যবস্থায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ফলে জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। কারণে অকারণে শিক্ষকদের হতে হয় লাঞ্ছিত।
নেই পেনশনের সুযোগ সুবিধা। একজন শিক্ষক চাকরি শেষে পেনশন পাওয়ার কথা কিন্তু বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা তা থেকেও বঞ্চিত। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা অবসর ও কল্যান তহবিল নামে সর্বমোট ১০০ মাসের বেতন পায়। তাও আবার সর্বশেষ স্কেলের সমপরিমাণ টাকা। অবসরে ৭৫ মাস এবং কল্যান তহবিলে ২৫ মাস। এই অবসর ও কল্যান তহবিলের জন্য পূর্বে কর্তন করা হতো ৬ শতাংশ হারে। বর্তমানে তা বাড়িয়ে কর্তন করা হচ্ছে ১০ শতাংশ হারে। বাড়তি কোন সুযোগ সুবিধা না দিয়ে। এই কর্তনকৃত টাকার আর্থিক সুযোগ সুবিধা পূর্বেরটাই বহাল আছে। অর্থাৎ পূর্বে একজন শিক্ষক যা পেত বর্তমানেও তাই পাবে। শুধু বৃদ্ধি পাবে বাৎসরিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট। ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট শুধু এখন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আর্শীবাদ স্বরূপ। এই বাৎসরিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিয়ে তা থেকে আবার অবসর ও কল্যান তহবিলের জন্য ৪ শতাংশ হারে কর্তন করা হচ্ছে। যার ফলে মূল স্কেলের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে।
২০১৫ সালে ৮ম জাতীয়  পে-স্কেল ঘোষণার আগে যাদের চাকরির সময় সীমা আট বছর হয়েছিল শুধু মাত্র তারাই উচ্চতর গ্রেড পাবার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। ঐ পে-স্কেল ঘোষণার পূর্বে যারা উচ্চতর গ্রেড পাবার জন্য আবেদন করেছিল শুধু মাত্র তারাই পর্যায়ক্রমে উচ্চতর গ্রেড পেয়ে আসছে । পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে আজও পর্যন্ত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড বন্ধ থাকার পর গত কিছু দিন পূর্বে আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনো পর্যন্ত কিছু সমস্যা রয়ে গেল। চাকরির এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে না বি এড স্কেল থেকে উচ্চতর গ্রেড হবে এ নিয়ে চলছে মতানৈক্য। বি এড স্কেল যেহেতু শিক্ষকদের যোগ্যতার মাপকাঠি সেহেতু এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেড ধরা উচিত বলে মনে করি আমরা সাধারণ শিক্ষক বৃন্দ। আমাদের দাবি উচ্চতর গ্রেড এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে দেওয়া হউক।   বর্তমান নিয়মে  বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা চাকরি জীবনে দুটি উচ্চতর গ্রেড পাবে। একটি পাবে চাকরির ১০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর এবং অন্যটি পাবে ১৬ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জটিলতার কারণে আবেদনই করতে পারতেছে না।  এতে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ৬০০০ – ৭০০০ টাকার আর্থিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এই বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে তাই  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট   বিনীত অনুরোধ আপনি বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের  সার্বিক দিক বিবেচনা করে  বৈষম্যমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতিকে উপহার দিবেন বলে আশা করি  এই মুজিববর্ষেই।   বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক বৃন্দ আপনার এই অবদানের কথা চিরকাল স্মরণে রাখবে।
ধন্যবাদান্তে
মোঃ আবুল হোসেন
কুকুটিয়া কে, কে, ইনস্টিটিউশন
শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ

বি.দ্র. : মতামত একান্তই লেখকের।কর্তৃপক্ষ কোন ভাবেই এর সাথে সম্পৃক্ত নয়।