“মানুষ গড়ার এক জীবন্ত কারিগর ছিলেন মরহুম মুকসুদুল ইসলাম”

প্রকাশিত: ২:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০
মানুষ বাঁচে তার কর্মে, বয়সে নহে।  এমনি এক জাজ্বল্যমান প্রানোচ্ছল প্রগাড় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন মরহুম মুকসুদুল ইসলাম। ছিলেন মানুষ গড়ার এক জলন্ত কারিগর, জীবন্ত বাতিঘর।
নিরবে নিভৃতে প্রচার বিমুখ পথচলা এই শিক্ষাগুরু ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাটি অঞ্চল নাসিরনগর উপজেলাধীন কাঠালকান্দি গ্রামের কৃতিসন্তান।
দারিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে পথচলা সক্রেটেসীয় জীবন লালনকারী এই উদিয়মান কৃতিসন্তান সহকারী অধ্যাপক মুকসুদুল ইসলাম ১৯৮৫ সালে ২য় বিভাগে আলিম, ১৯৮৭ সালে ১ম বিভাগে ফাজিল,  ১৯৯০ সালে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সহিত বি,এস,সি সম্মান রসায়ন এবং ১৯৯১সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রখর মেধার স্বাক্ষর রেখে সাফল্যের সহিত এম,এস,সি (রসায়ন) পাশ করেন।
তিনি ১৯৯৫ ইং সনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাধিন সরাইল উপজেলার অরুয়াইল আবদুস সাত্তার অনার্স কলেজে  রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান।
তিনি একজন রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হলেও বাংলা, ইংরেজী, পদার্থ, জীব বিজ্ঞান এবং গনিত বিষয়ে সম পারদর্শী ছিলেন এবং একাধিক কলেজে ইংরেজী প্রভাষক হিসেবে গেষ্ট টিচারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন সদা হাসিখুশি, প্রাণবন্ত রসিক মানুষ। কারোর মনে কষ্ট দেয়ের মত কোন কাজ বা কথা পারতপক্ষে বলতেন না।
আপাদমস্তক জ্ঞান অন্বেষনে নিবৃত এই গুনি ব্যক্তি ছিলেন ইংরেজী, আরবী, উর্দ্দু, হিন্দী ও ফারসী ভাষায় যথেষ্ট সিদ্ধহস্ত। তার সুললিন কন্ঠে উর্দ্দু এবং ফারসি  ভাসার বয়ান মগ্ধ হয়ে শুনতেন আধুনিক শিক্ষিত সমাজ কিংবা আলেম ওলামা। তার কন্ঠে গীত যে কাউকে প্রবল ভাবে আকৃষ্ট করত।  তাকে বিভিন্ন সময়ে মসজিদ মক্তবে বয়ান করতে দেখা যেত।  ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক কর্তৃক ইমামদের প্রশিক্ষনে প্রায় প্রতি বছর ই তাকে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হত।  তাছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যাপক মুকসুদুল ইসলাম একজন সাহিত্যানুরাগী অসাম্প্রদায়িক চিন্তার অধিকারী ছিলেন। ছাত্র জীবনে তার অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়। তার অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্হ বংশী বানী, আলেয়া, কশাঘাত, ছায়াস্বপ্ন ইত্যাদি।
মুকসুদুল ইসলামের অসাধারন একটি গুন আধুনিক সমাজে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। তিনি ছিলেন একজন ধ্যানমগ্ন গভীর মনোযোগী পাঠক। বই কেনা এবং পড়া ছিল তার প্রধান নেশা। তাই তো তিনি ব্যক্তিগত বিশাল সংগ্রহের এক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
২০০৪ সালে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরন করেন এই অমীয় প্রতিভাবান গুনি মানুষটি। বাঁচার খুব ইচ্ছা ছিল উনার মনে। ব্যক্তি জীবনে উনি স্ত্রী ও একটি ফুটফুটে মেয়ে ছিল। তিনি জীবনে পারিবারিকভাবে মারাত্মক সংগ্রাম মোকাবেলা করে মাত্র সংসার ও সুখের সন্ধান পেয়েছিলেন, কিন্তু মহান রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা, উনার ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
মৃত্যু পরবর্তীতে ব্যক্তিগত সংগ্রহের প্রায় আড়াই হাজার বই  (গ্রীক পৌরানিক, হেলেনেস্টিক, কোরআন, বাইবেল, ইন্জিন, পৌরানিক বেদ, চিকিৎসা শাস্ত্র, আইন শাস্ত্র, ইসলামী বিশ্বকোষ, আধুনিক বাংলা পিডিয়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মহৎ ব্যক্তিবর্গের জীবনী, অনুবাদ গ্রন্হ সহ অনেক দূর্লভ বইয়ের সমাহার তার সংগ্রহশালায় ছিল) তার প্রাণের প্রতিষ্ঠান  আবদুস সাত্তার অনার্স কলেজে হস্তান্তর করা হয়।যা মুকসুদুল ইসলাম স্মৃতি পাঠাগার হিসেবে নাম করণ করা হয়।
“আমি চিরতরে দূরে চলে যাব তবু আমাকে দেব না ভুলিতে” কবির এই সত্য বানীকে বাস্তবিক রূপ দিয়ে আলোর দিশারী মুকসুদুল ইসলাম অপরিনত বয়সে ধরা ত্যাগ করলেও রেখে গেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর, অসংখ্য গুনগ্রাহী ছাত্রছাত্রী, শুভান্যুধায়ী ও শুভাকাঙ্খী। রেখে গেছেন গর্ব করার মত জীবন দর্শন ইতিহাস।
উল্লেখ্য- মুকসুদুল ইসলাম স্মৃতি স্মরনে তার  মৃত্যু বার্ষিকীতে কলেজ কর্তৃপক্ষ “হারামনি ” নামে একটি ম্যাগাজিন বের করেন।
সরাইল, নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পক্ষ থেকে এই গুনী ব্যক্তির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও পরকালে শান্তি কামনা।।
মোজাম্মেল হক ও শাহ মিরান, উনার স্নেহের ছাত্র।

Categories