মানবিক পুলিশের সেবায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধা 

প্রকাশিত: ৩:০৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২০
অহিদুল ইসলাম, নওগাঁ।।
নওগাঁয় মানবিক পুলিশের সেবাযত্ন ও খাবার পেয়ে সুস্থ্য হয়ে দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস পর বাড়ি ফিরলেন মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধা! আজ থেকে প্রায় ৭ মাস পূর্বে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার নওহাটামোড় (চৌমাশিয়া) বাজারে নওগাঁ-রাজশাহী মহা-সড়কের ধারে একটি গাছের নিচে গুরুতর অসুস্থ্য অবস্থায় বৃষ্টির মধ্যে এক বৃদ্ধা নারীকে পড়ে থাকতে দেখে নওহাটামোড় পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত মানবিক পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন সেই অসুস্থ্য বৃদ্ধাটিকে উদ্ধার করে প্রথমে চিকিৎসা সহ খাবারের ব্যবস্থা করেন।
কিছুটা সুস্থ্যতা বোধ করার পরও বৃদ্ধাটি তার নাম, পরিচয় বা ঠিকানা কিছুই বলতে পারেন না। বৃদ্ধাটি ছিলো মানসিক ভারসাম্যহীন। সে সময়ই পুলিশ কনেস্টবল সরোওয়ার হোসেন ঘটনাটি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে জানিয়ে অসুস্থ্য বৃদ্ধাটি’র থাকার ব্যবস্থা করেন। এরপর থেকেই পুলিশ কনেস্টবল সরোওয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস ধরে সেবাযত্ন ও খাবার দেওয়াসহ ভালো ব্যবহার করার মাধ্যমে দিনে দিনে সুস্থ্য করে তোলেন সেই অজ্ঞাতনামা মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধা নারীটিকে।
নওগাঁ জেলার সুযোগ্য পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া বিপিএম মহোদয় সাহেব, অতিরিক্তি জেলা পুলিশ সুপার রাকিবুল আকতার মহোদয় সাহেব ও মহাদেবপুর থানার ওসি নজরুল ইসলাম জুয়েল সাহেব এর সার্বিক দিকনির্দেশনায় পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন বৃদ্ধাটি’র সাথে এমন সর্ম্পক গড়ে তোলেন, যে কারণে ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাটি পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেনকে ছেলে বলে মানতে শুরু করেন।
বৃদ্ধাটিকে কেউ কিছু বললেই মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাটি তার ছেলে পুলিশ বলেও পরিচয় দিতেন। এভাবেই কেটে যায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, তার মধ্যেই দেশে আসে করোনা দূর্যোগ। তবুও থেমে থাকেননি মানবিক পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন তিনি তার কর্মস্থলের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৃদ্ধাটি’র নাম-পরিচয় জানতে বা বৃদ্ধাকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছাতে কৌশল অবলম্বন করে খাওয়া ও সেবা যত্ন করার ফাঁকে ফাঁকেই সুযোগ বুঝে বৃদ্ধাটির কাছে থেকে নাম-পরিচয় জানার চেষ্টা করেই চলেছেন।
মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাটি মাঝে মাঝে নাম ও ঠিকানা দিলেও সাথে সাথে কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন সেই নাম-ঠিকানা উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে অবগত করেন। কিন্তু তার দেওয়া ঠিকানা সঠিক মিলেনা এমন পরিস্থিতি’র পরও হাল ছাড়েননি কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন।
এরই মাঝে গত ২৫ জুলাই পূর্বের ন্যায় খাবার দিতে গিয়ে ফের কৌশলে মা ডেকে পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাটিকে বলেন, যে আর কয়েকদিন পরই তো কুরবানীর ঈদ, ঈদের দিন পড়ার জন্য নতুন শাড়ি কিনতে হবে, এছাড়া বাড়িতে যারা আছে তাদেরকেও দাওয়াত দিতে হবে ঈদের এমন কথা শুনেই বৃদ্ধাটি বলে ওঠেন আমার নাতনীকেও ঈদের কাপড় দিতে হবে এবং তাকে নিয়েই আমি ঈদ করিব বলেই বৃদ্ধাটি ফের কনেস্টবল সারওয়ার হোসেনকে বলেন, রাজশাহীর রাজপাড়া থানা আছে না সেখানে হরগ্রাম শেখ পাড়ায় গিয়ে আমার নাতনীকে তুমি নিয়ে আসো আমরা এক সাথে ঈদ করিব।
এমন কথা শোনার পরই কনেস্টবল সরোওয়ার হোসেন ঘটনাটি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের জানালে নওগাঁর সুযোগ্য ও মানবিক জেলা পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া বিপিএম মহোদয় সাহেব এর দিকনির্দেশনায় অতিরিক্তি জেলা পুলিশ সুপার রাকিবুল আকতার মহোদয় সাহেব বৃদ্ধাটির ব্যাপারে খোঁজ নিতে রাজশাহী পুলিশের সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যমে বৃদ্ধাটির পরিচয় নিশ্চিত হোন, মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাটির নাম মোসাঃ ফজিলা বেওয়া, স্বামী মৃত মতিউর রহমান, মাতা মোসাঃ জমেলা বেওয়া, গ্রাম- হরগ্রাম-শেখপাড়া, থানা-রাজপাড়া, জেলা-রাজশাহী।
বৃদ্ধাটি’র এক মেয়ে আছে নাম মোসাঃ মর্জিনা খাতুন ও নাতনী যাকে নিয়ে বৃদ্ধাটি ঈদ করতে চেয়েছিলেন সেটি মর্জিনার মেয়ে মোসাঃ মৌসুমী খাতুন (৯)। এছাড়াও জিয়ার উদ্দীন, ইয়ার ইদ্দীন ও সিদ্দিক নামে বৃদ্ধাটির ৩ জন ভাই ও রয়েছেন। ঠিকানা নিশ্চিত হওয়ার পরই রাজপাড়া থানা পুলিশের সহযোগীতায় বৃদ্ধাটির স্বজনদের খবর পাঠানো হলে।
আজ ২৯ শে জুলাই বুধবার সকাল ১১ টার দিকে বৃদ্ধা ফজিলা বেওয়ার নাতনী মোসাঃ মৌসুমী খাতুন ও রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার সাবেক (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান খাইরুন্নেছার স্বামী আব্দুর রহিমকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধা ফজিলা বেওয়ার বোনের ছেলে (ভাগ্নে) কোরবান আলী ঘটনাস্থল নওগাঁর নওহাটা মোড় (চৌমাশিয়া) বাজারে আসেন পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন এর কাছে। এসময় পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন সহ উপস্থিত লোকজনের সামনেই বৃদ্ধা তার নাতনীকে কাছে পেয়ে আনন্দের কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। স্বজনরা বৃদ্ধাটিকে সনাক্ত করেন এবং সাথে আনা বৃদ্ধা ফজিলা বেওয়ার ন্যাশনাল (ভোটার) আইডি কার্ড ও দেখান।
এসময় নওগাঁর সুযোগ্য ও মানবিক জেলা পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আবদুল মান্নান মিয়া বিপিএম মহোদয় সাহেব সহ অতিরিক্তি জেলা পুলিশ সুপার রাকিবুল আকতার মহোদয় সাহেব এর দিকনির্দেশনায় মানবিক পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন ঈদের দিন পড়ার জন্য বৃদ্ধাটির জন্য কেনা নতুন শাড়ি ও বৃদ্ধার কাছে থাকা নগদ টাকা সহ বৃদ্ধাটিকে নিতে আসা স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেন।
বিদাই মহূর্তেও বৃদ্ধা ফজিলা বেওয়া পুলিশ কনেস্টবল সরোওয়ার হোসেন এর মাথায় হাত বুলিয়ে চোঁখের পানি ফেলে গাড়িতে ওঠার সময়ও অপলক দৃষ্টিতে পুলিশ কনেস্টবল সরোওয়ার হোসেন এর দিকেই চেয়ে ছিলেন বৃদ্ধা ফজিলা বেওয়া। এসময় নিজের চোঁখের পানিও আটকে রাখতে পারেননি পুলিশ কনেস্টবল সারওয়ার হোসেন। আর এমন দৃশ্য দেখে উপস্থিত লোকজনরাও হয়েছেন হতবাক।

 


Categories