মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠি।

প্রকাশিত: ১২:৪৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২০

তারিখ: ০৯/০৯/২০২০ খ্রি:।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়,

“আজ দুঃখ ভরাক্রান্ত মন নিয়ে তোমার কাছে এসেছি ৷ তুমি সবিই জানো, সবিই বোঝ ৷ আজ বাংলার বে-সরকারী শিক্ষকবৃন্দ জাতীয়করণ চায়, মুক্তি চায়, তাদের ন্যায্য অধিকার চায়—–‘

এ কথাগুলো যিনি আমাকে শিখিয়েছেন, তিনি আমাদের জাতির পিতা ৷ তিনি আমাদের গুরু হিসেবে দক্ষিণা দিয়ে গেছেন এ সকল কথা দাবী আদায়ের প্রেসক্রিপশনের কার্যকরী মহা ঔষধ হিসেবে ৷ তবে আমরা কেন বিপ্লবের জন্য কথা বলবনা ?

 

হে গণতন্ত্রের মানসকন্যা,

আমরা শিক্ষক ৷ আমাদের দেশ ও জাতি গড়ার কারিগর বলা হয় ৷ সম্মানে শ্রেষ্ঠত্বের আসনটিও নাকি আমাদের ৷ যদি সত্যিই হয় , তাহলে অসম্মানের সাথে কেন আমাদের ভাগা-ভাগি করতে হচ্ছে ? ন্যায্য অধিকারের সফল স্বপ্নগুলোকে কেন বার বার ভেঙে চুড়-মাড় করে দিচ্ছে ? কেন আমরা ওয়েটিং লিস্টে পড়ে আছি ? মা গো ! প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু একবার গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখ ৷

 

তোমার সরকার শিক্ষাবান্ধব সরকার,

তুমি সরকারী চাকুরীজীবীদের বেতন বাড়িয়ে দিয়ে তা কার্যকরণের তাগিদ দিয়েছিলে ৷ ব্যাস, হয়ে গেল ৷ এরপর বে-সরকারী এমপিও ভূক্ত শিক্ষকদের বেতন বাড়িয়ে দিলে ৷ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বেশ কয়েক দফায় এমপিওভুক্ত করে দিয়ে তাঁদের দুঃখ মোচনের ব্যবস্থা করে দিলে, আমরা আনন্দে নেচেছি ৷ কিন্তু দিন যায়, বাড়ে দুঃখ ৷ বে-সরকারী বলেই হয়ত এই পরাজেয়ের বিজয় মাল্যটা আমাদের প্রতি মাসেই গলায় শোভা পায় ৷ সরকারী শিক্ষকরা প্রতি মাসের ১-৪ তারিখের মধ্যে যখন বেতন উঠায়, তখন আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয় মাসের ১২ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত (কোনো কোনো সময়ে ২০-২২ তারিখ পর্যন্ত)। উৎসব ভাতা শতভাগ নেই। বাড়ি ভাড়া চিকিৎসা ভাতায়ও বৈষম্য। জাতীয়করণের জন্য আজ পুরো শিক্ষক সমাজ চেঁচিয়ে মরছে। বল তো কেন? তাঁরা সমতায়ন চায়। তাঁরা মাথা উঁচু করে বলতে চায়- “শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার” কিংবা “আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির”। কিন্তু এটাই আর হচ্ছেনা। একই দেশে সকলেই শিক্ষক, অথচ একই টেবিলে বেমানান ৷ শুধু একটা কথা ‘বে’ ৷ এই ‘বে’ কথাটি ব্যবহার করে আমাদের এত দূরে ঠেলে দিচ্ছ কেন! জাতীয়করণ তো আমাদের মুজিববর্ষের ন্যায্য পাওনা। তুমি আমাদের নিরাশ কর না?

 

মনে রেখ জননী,

সকল শিক্ষকের জন্ম কিন্তু শিক্ষার উদর থেকে ৷ আমরা সহোদর, আমরা ভাই ৷ হয়ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একটু আলাদাভাবে যেতে হয় ৷ যেমন একই মায়ের পাঁচটি সন্তান সমান হয়না ৷ তাই বলে কি মা আর দু’টো ছেলেকে ছিটকে ফেলে দেয় ? বোধ হয় না ৷ বরং তাদের জন্য আলাদা রকম জন্ম নেয় মায়ের ভাবনা ৷ তাদের জন্য যথেষ্ট ছাড় দিয়ে বিবেচনাটাও হয় আলাদা ৷ কারণ, তারাও সন্তান ৷ তাদের অস্বীকার, অবহেলা কিংবা অন্যভাবে দেখার বিধান ধর্মেও নেই ৷

 

মাতা !

তোমার লালিত স্বপ্ন হলো হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীর সমস্ত স্বপ্নকে ঘিরে ৷ তোমার স্বপ্ন হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ৷ এজন্য তুমি আমাদের আদেশ করেছ যাতে আমরাও ডিজিটাল হই ৷ তোমার আদেশকে মাথায় নিয়ে ডিজিটাল হওয়ার চেষ্টা করছি ৷ আইসিটি (কম্পিউটারে) ট্রেনিং নিয়ে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে ক্লাস উপাস্থাপন করছি ৷ শিক্ষক বাতায়ন, মুক্তপাঠের সদস্য হয়ে যথাসাধ্য কনটেন্ট আপলোডের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ৷ গভীর রাত জেগে জেগে মডেমে পয়সা ভরিয়ে নিত্য-নতুন চিন্তা ধারায় আধুনিক শ্রেণি উপযোগী ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরী করছি ৷ বলো মা, সকাল ১০’০০ টায় স্কুলে গিয়ে বিকেল ৪’০০ টায় বাড়ী ফিরে বাকী সময়ে পরের দিনের ক্লাস ভাবনা এবং কনেটন্ট তৈরী কি আমাদের এতটুকু ক্লান্ত করেনা ? বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে জুম অ্যাপ্‌স এর মাধ্যমে অনলাইন ক্লাশ পরিচালনা এবং ক্লাশের ভিডিও ধারন করে তা আপলোড করার দায়িত্ব কি আমরা পালন করছিনা? রাস্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে কি আমাদের কোনই ভূমিকা নেই ৷ তবে কেন তুমি বার বার আমাদের কাছ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছ ?

 

মাগো !

একটা সত্যি কথা বলি ৷ যে দিন তুমি আমাদের জন্য স্কেল ঘোষণার আনন্দ দিলে, সেদিন থেকেই আমাদের মনে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্নগুলো আস্তে আস্তে বড় হতে শুরু করেছে ৷ সমাজে মর্যাদা যেমন বেড়েছে, তেমনি চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে প্রচুর ৷ আমাদের মধ্যে এমন অনেক শিক্ষক আছেন যাঁরা এতদিনের ভেতরে থাকা স্বপ্নগুলো উগরে দিতেও শুরু করে দেন ৷ এজন্য ওনারা ধার-দেনার আশ্রয় পর্যন্ত নেন ৷ তবে সেটা ছিল আনন্দের ধার ৷ মনে একটাই শক্ত ধরনের এগিয়ে যাওয়ার বল কাজ করছিল-“পাচ্ছিই তো; হচ্ছেই তো”? কিন্তু সেই বল আজ দুর্বল হয়ে চোখের জলে অভাবের মাঠে খেলা করছে ৷ আমাদেরকে তুমি কেমন করে ফেরাবে বলো? তোমার কি একটুও মায়া হয়না।

 

হে জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসুরী,

আমরা জানি তুমি দেশরত্ন, তুমি গণতন্ত্রের মানস কন্যা ৷ জাতির পিতার বিপ্লবী রক্ত তোমার প্রত্যেকটি শিরা-উপশিরায় বইছে ৷ তুমি জীবন দেবে তবু জনগণের কোন ক্ষতি সাধন করতে দেবেনা ৷ তুমি বিচক্ষণ, শিক্ষানুরাগী, বাংলাদেশের যোগ্য শাসক ৷ তুমি দুঃস্বপ্নকে ভয় পাও তবে নতুন স্বপ্নে বিভোর ৷ দেশের এই চরম ক্রান্তি লগ্ন করোনা মহামারীতে তোমার যে ভূমিকা, যে বাণী, যে চিন্তা, তা জাতির জনকের রক্তের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তুমি বসে নেই। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রত্যেকটি এলাকার খোঁজ-খবর নিচ্ছ। বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা ঘোষণা করছ। তুমি সিদ্ধান্ত যা নাও, তা কার্যকর করার তাগিদেই নাও ৷ আমরা এ যাবত তাই দেখে এসেছি ৷ তুমি যদি হুকুম করো – আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমার সমস্ত শিক্ষকের ন্যায্য দাবী জাতীয়করণসহ যাবতীয় দাবী-দাওয়া কার্যকর করার জন্য যা যা করা দরকার, তার জন্য শিক্ষা মণন্ত্রলায় যেন আন্তরিক হয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং আগামী ০৬ দিনের মধ্যে তা কার্যকর করা হয়। আমি আরো বলছি, এব্যাপারে কোনোরুপ টালবাহানা বরদাস্ত করা হবেনা এমনকি আমার শিক্ষকমণ্ডলীর সম্মানে যেন কোনো প্রকার আঘাত না আসে ৷ তবে ০৬ ঘণ্টাও লাগবেনা ৷ তুমি একবার শুধু বল মা ৷ কোন নেতা হিসেবে নয়, একজন সাধারন শিক্ষক হয়ে আরজি করছি- তুমি জাতীয়করণ কার্যকর কর, কার্যকর কর, কার্যকর কর ৷ আমাদের কণ্ঠে আর নিয়ম ভাঙ্গার গান ধরিয়ে দিওনা ৷ তোমার কাছে তোমার সন্তান জয় যদি কিছু চাইত, তুমি কি ফিরিয়ে দিতে পারতে ? বলো মা ৷ যদি সন্তান বলে স্বীকার করো তবে সকল শিক্ষকের পক্ষ থেকে আমি হাত পেতেছি ৷ আমার হাত ভরিয়ে দাও ৷ নইলে কান্না ছাড়বনা ৷

 

জননী,

ভালো-মন্দ অনেক কথাই বলে ফেলেছি ৷ ভুল হলে ক্ষমা করে দিও। তবে এখানেও আমার একটা শিক্ষা আছে ৷ কার শিক্ষা জানো ? বঙ্গমাতা বেগম মুজিবের শিক্ষা ৷ ৭ মার্চ ভাষণ দেয়ার আগে চিন্তিত বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গমাতা সাহস দেয়ার জন্য বলেছিলেন,

“আল্লাহর নাম নিয়া তোমার মন-দিল-অন্তর থেকে যা আসে তাই বলে দিও”৷

আমিও সেই শিক্ষায় বললাম ৷ দেখি বঙ্গমাতার এই উপদেশটুকু আমায় কতখানি ফল দেয় ৷

 

তুমি দীর্ঘজীবী হও, করোনা বিজয়ী বীরঙ্গনা বেশে তোমার মাথা উঁচু হয়ে থাক সারা বিশ্বে। দেশ থেকে এই মহামারী অতিশীঘ্র বিদায় নিক, এই কামনা করি ৷

 

ধন্যবাদ ৷

 

তোমার স্নেহধন্য সকল বে-সরকারী শিক্ষকের পক্ষে-

এ টি এম আশরাফুল ইসলাম সরকার রাংগা

সহকারী শিক্ষক

জাহাঙ্গীরাবাদ দ্বি মুখী উচ্চ বিদ্যালয়

পীরগঞ্জ, রংপুর ৷

ই মেইল: rangasarker100@gmail.com.

 

 

 

 

 

 

 


Categories