মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ কেন প্রয়োজন

প্রকাশিত: ১১:২২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২১
যে জাতি যত শিক্ষিত সেই জাতি তত উন্নত, এই কথাটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন গ্রাম বাংলার কিছু আর্থিক স্বচ্ছল অর্থাৎ ধনী শিক্ষানুরাগী সমাজ সেবক মহৎ মানুষ,যাদের শিক্ষার প্রতি অগাধ অনুরাগের কারণে তাদের মত মহতী মানুষের উদ্যোগে বিভিন্ন গ্রামে,শহরে,এমনকি সারাদেশে ব্যক্তি নামে বা এলাকার নামে প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং ধর্মপ্রাণ মুসলিম দানবীরেরা প্রতিষ্ঠা করেন মাদ্রাসা। এই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষার আলো গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পরে, দেশের শিক্ষার হার বাড়তে থাকে।এই সকল প্রতিষ্ঠান যখন স্থাপিত হয় তখন সাধারণত শিক্ষানুরাগী সমাজ সেবক যারা প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা কখনো ব্যক্তি স্বার্থের কথা বিবেচনায় আনেননি।
পরবর্তীতে একটা সময় রাজনৈতিক উচ্চ বিলাসী লোকেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা সহ পূর্বে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে আর্থিক সহযোগিতা শুরু করেন।এই সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো পরিচালিত হইতো মূলতঃ এলাকার সকল স্তরের মানুষের কমবেশি আর্থিক সহযোগিতায়,সমাজের মানুষগুলো এই সকল প্রতিষ্ঠান গুলোকে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে পরিচালনা করতেন।আর এই প্রতিষ্ঠান গুলোতে যারা শিক্ষাদান করতেন তারা মহান শিক্ষকতা কে ব্রত নিয়ে এলাকার অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করার প্রয়াসে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন,তবে তাদের জীবন জীবিকার মান স্বচ্ছল ছিল না।
তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর সাথে যারা জড়িত ছিলেন তারা ছিলেন সুশীল,তারা প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে আসতেন না,বরং দিতে আসতেন।পরবর্তী সময়ে দেশ স্বাধীন হলে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নজর দিলেন,তিনি ভাবলেন এই স্বাধীন দেশকে উন্নত দেশে পরিনত করতে হলে দেশের জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করতে হবে,তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করতে হলে,বিশ্বমানের সুনাগরিক তৈরী করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের বিকল্প নেই।সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হল,যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ,নেই রাস্তা ঘাট,নেই পর্যাপ্ত খাদ্য, নেই রাষ্টীয় কোষাগারে পর্যাপ্ত অর্থ, তারপরও তিনি ১৯৭৩ সালে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোকে জাতীয়করণ করলেন,তিনি ভাবলেন যারা সোনার মানুষ তৈরী করবেন তাদের পেটে ভাত, পরনে কাপড় না থাকলে সেই মহান পেশায় নিয়োজিত মহান মানুষ গুলো কিভাবে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরী করাসহ ও বিশ্বমানের শিক্ষাদান করবেন।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা ছিল পর্যায়ক্রমে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ কিন্তু কিছু কুলাঙ্গার, পথভ্রষ্ট জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক,লাল সবুজের পতাকার স্বপ্ন দ্রষ্টাকে বাঁচতে দিল না,থামিয়ে দিল বাঙ্গালী জাতির অগ্রযাত্রাকে।
১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে শিক্ষাকে নিয়ে জাতির পিতার ন্যায় আর কোন সরকার এতটা ভাবেননি।৭১ এর পরাজিত শক্তি আর ৭৫ এর ঘাতকেরা নিজেদের আখের ঘোছাতে, রাজনৈতিক ভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তারা ব্যস্ত ছিল কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে কোনঠাসা করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করা যায়।যখন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসল,বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শিক্ষাকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন, অবশিষ্ট রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে একযোগে জাতীয়করণ করলেন।মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার জন্য NTRCA গঠন করে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করলেন, যা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, তবে এদেশের শিক্ষক সমাজ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সকল নিয়োগ NTRCA মাধ্যমে দেয়া হউক তা চায়।
৭৫ পরবর্তী প্রত্যেক সরকার কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি করেন,যার ফলে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য হতে হতে আজ পাহাড়সম বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো ধীরে ধীরে সুশীল সমাজের নিকট থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সমর্থকদের নিকট কুক্ষিগত হতে থাকে,যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের লোকজন চর দখলের ন্যায় সমগ্র দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানেরা নিজস্ব চিন্তাচেতনার মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে অনেকাংশেই ব্যর্থ হন। প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের স্বাধীন ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে না পারার কারণে শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়ন বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে, আর ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে বা গভর্নিং বডিকে ম্যানেজ করতেই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের।এতে করে সঠিক শিক্ষাদান কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে হচ্ছে আর্থিক দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা,গ্রুপিং।এমনকি শিক্ষা বোর্ড বা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব বোধ করে।তাই ম্যানেজমেন্ট কমিটি /গভর্নিং বাতিল করে মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়ন সম্ভব।
এই সুযোগে শিক্ষায় বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, দেশে গড়ে উঠেছে নানা প্রকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন: সরকারি, এমপিওভুক্ত, ননএমপিওভুক্ত, প্রাইভেট বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম সহ নানা প্রকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভালো প্রতিষ্ঠান গুলো শহর কেন্দ্রিক।শিক্ষার ব্যয় মিটিয়ে সকলের এসব ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ নেই,অথচ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল এদেশের আপামর সকল স্তরের নাগরিক বৈষম্যহীন সমাজ তথা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, মুক্তিযোদ্ধারা এই বৈষম্যের জন্যে দেশ স্বাধীন করেনি,তাদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ,শোষণ মুক্ত দেশ,সকল নাগরিকদের সমান সুযোগ সুবিধা, মেহনতী শ্রমিক থেকে সকল স্তরের মানুষের রাষ্টীয় অধিকার থাকবে সমান,সংবিধানে সম অধিকারের কথা বলা আছে,আছে বৈষম্যহীন শিক্ষার কথা,শিক্ষা লাভের অধিকার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার।মূলত: একটি স্বাধীন দেশের শিক্ষার আর্থিক দায় রাষ্ট্র বহন করবে।
মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার গুনগত মানোন্নয়ন,শিক্ষায় বাণিজ্য বন্ধকরণ,রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ নিরুৎসাহিত করতে, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরী,বিশ্বমানের নাগরিক তৈরী করা সহ সুখী, সুন্দর, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা,বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা, শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূরীকরণ,বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা,বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শন মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের অসমাপ্ত কাজটি সমাপ্ত করার জন্য ঐতিহাসিক মুজিববর্ষে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবী এদেশের খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনতার,সর্বোপরি মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের স্বার্থে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ সময়ের দাবী।
মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ নির্ভর করে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর,যেখানে অর্থের যোগান কোন সমস্যা নয়।তাই এ দেশের শিক্ষক সমাজ বিশ্বাস করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে মোকাবেলা করতে হলে শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়ন সহ দেশের সার্বিক উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে একটি বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে মুজিববর্ষেই জাতীয়করণ ঘোষণা করবেন।
লেখক:
মো. মুজিবুর রহমান বাবুল
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান পরিষদ

Categories