* বড়শিবিদ্ধ সৃজনশীলতা * ফয়জুন্নেসা জেসমিন

প্রকাশিত: ৩:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২০

ঘটনাটি দু’ বছর আগের।
একদিন হঠাৎ ছেলে মেয়েদের পিঠে খাওয়ার ইচ্ছে হল। আমার স্টকে থাকা পিঠে তৈরির রেসিপি অনুযায়ী সব উপকরণ তখন ঘরে ছিল না। ভাবলাম, যা আছে তা দিয়েই কিছু তৈরি করি। আটা, ডিম দিয়ে প্যানকেকের আদলে তৈরি করলাম একরকমের পিঠা। মোটামুটি খাওয়ার মতো হলো।

আসলে তখন স্মার্ট ছিলাম না অর্থাৎ স্মার্ট ফোন ছিল না আমার। থাকলে ঐ সীমিত উপকরণ দিয়ে তৈরীকৃত বিভিন্ন নাস্তার রেসিপি দেখতে পারতাম! যা হোক, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছেলে বলল, “”আম্মু! তুমি যে নিজে চিন্তা ভাবনা করে নুতন এক ধরনের পিঠা তৈরি করেছ। এটাই তো সৃজনশীলতা”। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির কল্যানে ছয় অক্ষরের শব্দটির সাথে তার ইতিমধ্যেই পরিচয় ঘটেছে।

মূলতঃ অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের মতো করে কোন কিছু বলতে, লিখতে ও তৈরি করতে পারাই সৃজনশীলতা। একবার এক লোকের গলার টাকরায় ঘটনাচক্রে একটি ‘বড়শি’ আটকে গিয়েছিল। ঢাকা মেডিকেল ও পিজি হাসপাতালের ডাক্তাররা বললেন, ওরকম সেনসিটিভ জায়গায় অপারেশন করলে রোগী মারা যেতে পারে। নিরাশ হয়ে আত্মীয় স্বজন ফিরে আসলেন। মেডিকেল বোর্ডে বসা জনৈক ডাক্তার বাড়ি গিয়ে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে করতে একটা উপায় খুঁজে বের করলেন।  পরদিন রোগীকে খবর দিয়ে হসপিটালে আনা হলো। রোগীর হা করা মুখের সামনে শক্তিশালী চুম্বক ঘুরাতে লাগলেন। হঠাৎ বড়শিটা এসে চুম্বকে আটকে গেল। রোগী বেঁচে গেল।। সৃষ্টিশীলতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ । (বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাংবাদিক আলহাজ্ব রবিউল হোসেনের লেখা থেকে ঘটনাটি নেয়া)

আমার এক খালাাতো ভাই পরিত্যক্ত জিনিস , নারকেলের মালা, বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন মনোমুগ্ধকর শোপিস তৈরি করতেন। নারকেলের মালার ভেতর উনি ঘর বাড়ি বসিয়ে গ্রাম তৈরি করেছিলেন। খুব সুন্দর লেগেছিল আমার। তিনটি ওয়ালম্যাট, কাঠের তৈরি ওয়াল শোকেস — আজ থেকে ১৫/১৬ বছর আগে আমাকে দিয়েছিলেন। কিছুটা Fade হয়ে গিয়েছে………

এই শিল্পকর্মের উপর উনার না ছিল কোন প্রশিক্ষণ, না ছিল কোন একাডেমিক শিক্ষা। নিছক শখবশত করতেন। একজন কোরআনে হাফেজ। একবছর ঢাকার এক কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তখন। পরে বুঝতে পারলেন ঐ কোম্পানিটি উনাকে উপযুক্ত মূল্য দিচ্ছে না। আফসোস করলেন। কি আর বলবো? প্রতিভার মূল্যায়ন দিতে অনেক সময়ই আমরা কার্পন্য করি। জীবিকার তাগিদে এই সৃষ্টিশীল ভাইটি এখন বিদেশে। আসলে সবার মাঝেই সৃজনশীলতা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে তাকে নিজের মাঝে আবিষ্কার করা ও তার বিকাশ ঘটানো। আবিস্কারের পর তাতে নিয়মিত শান দিতে হয় যাতে জং ধরে নষ্ট না হয়।
একজনের সৃজনশীলতা অপরজনকেও উদ্বুদ্ধ করে। যেমন করেছিল আমাকে। যার ফলে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস ছিল….

… দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেখতে হবে না বোনটি কার? একজন প্রকৃত সৃষ্টিশীল মানুষ অপরের সৃষ্টিকে ও সম্মান প্রদর্শন করে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির এক গবেষনায় দেখা গেছে যে, ২০ থেকে ২৬ বছর বয়সে আমাদের মস্তিষ্ক প্রথমবারের মতো উদ্ভাবনের জন্য উর্বর স্থল হয়ে উঠে। গবেষণাটি পড়ে আক্ষেপ হলো – উক্ত বয়সটা বৃথাই পার করেছি বিধায়। আবার অন্য একজন গবেষক এর বক্তব্যে মনে আশা জাগলো। গবেষক, লেখক প্রফেসর ওয়েইনবার্গ বলেছেন, ” বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের জীবনের সেরা কাজটি করেছেন অনেক দেরীতে”। মনে হলো, সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। প্রকৃতপক্ষে শিশুকাল থেকেই সম্ভাবনার আলো জালিয়ে দিতে হয় শিশুদের মনে। তবেই তা যথাসময়ে পরিস্ফুটিত হয়।

নিঃসন্দেহে শিশুরা প্রখর কল্পনাশক্তির অধিকারী।  তাদের সৃজনশীল ভাবনা ও কর্মের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রায়শই। একবার বিদেশে চার থেকে আট বছর বয়সী বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভালবাসা কি? অনেক সুন্দর সুন্দর উত্তর পাওয়া গেলো। যেমন – একজন বলল, ” আমার দাদি যখন নেইলপালিশ লাগাতে পারেন না পায়ে, তখন দাদা বাতের ব্যথা নিয়ে ও দাদির পায়ে নেইলপালিশ লাগিয়ে দেন। এটাই হচ্ছে ভালবাসা”। একজন বলল, ” আমার মা আমার বাবার জন্য কফি বানায়। কিন্তুু বাবাকে কফি দেয়ার আগে চেখে দেখে তা স্বাদ হয়েছে কিনা! এটাই ভালবাসা”। আরেকজন বলল, “ভালবাসা হচ্ছে এক বুড়ো আর বুড়ি, যাদের মাঝে এখনো প্রচুর বন্ধুত্ব। যদি ও তাদের দু’জন দু’জনের সম্পর্কে জানার কিছুই বাকী নেই”। সম্প্রতি বৃটেনের স্ট্যাফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটির গবেষকরা তিন বছরের ৬০ টি শিশুর উপর গবেষনা চালিয়ে দেখেছেন যে, দিনে ১৫ মিনিটের বেশি সময় টিভি দেখলে শিশুদের সৃজনশীলতা কমে যায়। জাতির ভবিষ্যৎ এই শিশুদের সৃজনশীল বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে সরকার মাধ্যমিক স্তরে ২০০৮ সাল থেকে এবং প্রাথমিক স্তরে ২০১২ সাল থেকে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রনয়ন করেছে। পরীক্ষার খাতায় অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রীদের প্রদত্ত উত্তরের নমুনা দেখে মনে হয় তারা সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির মূল চেতনাকে অন্তরে ধারন করতে পারেনি।

একবার ইন্টার লেবেলের এক ছাত্রী বলল, ম্যাডাম, জি বাংলা ও স্টার জলসায় যারা কুটচাল গিরির মাধ্যমে অপরের ক্ষতি করে তারা তো অনেক চিন্তা ভাবনা করে ক্ষতি করার উপায় বের করে। তাদের কাজটা কি সৃজনশীল নয়? “এটা তো সৃজনশীলতার অপব্যবহার। সে তার জ্ঞান কে ভাল কাজে না লাগিয়ে খারাপ কাজে প্রয়োগ করেছে। সে তো জ্ঞানপাপী”।  উত্তরে বললাম। তবে প্রশ্নটা শুনে বুঝলাম, ছাত্র – ছাত্রীরা তাদের নিজস্ব চিন্তার জগতটাকে ঝাঁপির ভেতর রেখে দিয়েছে। নোট বই, গাইড বই, বিদেশি সংস্কৃতি দ্বারা এই ঝাঁপির মুখ সীল মারা। কোচিং ও গৃহশিক্ষক নির্ভর শিক্ষার্থীরা আরোপিত জ্ঞানের উপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল। জাতির গলায় আটকে থাকা অসহনীয় দুর্নীতি র বড়শিটাকে শক্তিশালী চুম্বকের সাহায্যে টেনে বের করতে হবে। নচেৎ মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবর্তিত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এ ব্যর্থতার দায় বহন করতে হবে অতি যত্নবান অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রায় সকলেরই।

প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ।