ব্যাংকের এটিএম বুথ জালিয়তি, হ্যাকার শরিফুল গ্রেপ্তার।

প্রকাশিত: ৫:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

এম. ইউছুফ।। চট্টগ্রামঃ

চট্টগ্রামে পূবালী ব্যাংকসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার এটিএম বুথে সাইবার নিরাপত্তা ভেঙে লক্ষ লক্ষ টাকা লুটের ঘটনায় অভিযুক্ত মূল হোতাসহ দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে এটিএম বুথের সিস্টেম ভেঙে দেয়ার চাবিসহ আনুষাঙ্গিক অনেক সরঞ্জাম ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে।

বুধবার চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এর আগের দিন নগরীর আগ্রাবাদ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দুজন হলো, শরীফুল ইসলাম (৩৪) ও মো. মহিউদ্দিন মনির (৩০)।

সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) ফারুকুল হক সাংবাদিকদের কাছে বলেন, “চক্রটি ক্রেডিট কার্ড ক্লোনিং ও বুথে জালিয়াতি করে টাকা উত্তোলন চক্রের সদস্য।” তাদের কাছ থেকে বেশকিছু ডেবিড ও ক্রেটিড কার্ড, কার্ড ক্লোন করার মেশিন, বুথের মেশিন খোলার চাবি উদ্ধার করা হয়েছে।

গত বছর নভেম্বরে চট্টগ্রামে পূবালী ব্যাংকের দুটি শাখা থেকে কৌশলে টাকা লুটের ঘটনার পর গত ২২ জুন আবারও একই প্রক্রিয়ায় নগরীর দুটি বেসরকারি ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা লুটের চেষ্টা করে চক্রটি। এসময় বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদের একটি ব্যাংকের বুথের সামনে থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডবলমুরিং থানা পুলিশ। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া শরীফুল মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর গ্রামের ইয়াজ উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে। সে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার নসরুদ্দিন রোডে। অন্যদিকে তার সহযোগী চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের মৃত হাজী আহম্মদ হোসেনের ছেলে।

নগর পুলিশের উপ কমিশনার (ডিসি-পশ্চিম) ফারুক উল হক বলেন, গত নভেম্বরের পূবালী ব্যাংকের বুথে টাকা লুটের ঘটনার পর থেকে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ হিসেবে থানায় তালিকাভুক্ত ছিল অভিযুক্তরা। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে শরীফুল রাশিয়ার মস্কো ও ইংল্যান্ডের লন্ডন থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে বিদেশি এক নাগরিককে সাথে নিয়ে জালিয়াতে জড়িয়ে পড়ে।

ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদীপ কুমার দাশ জানান, গত বছরের (২০১৯) ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৩৯ মিনিটে নগরীর চকবাজার থানার কলেজ রোডে পূবালী ব্যাংকের বুথ থেকে এটিএম মেশিনে জালিয়াতির মাধ্যমে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়। সেদিন একই প্রক্রিয়ায় রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে ডবলমুরিং থানার চৌমুহনী ফারুক চেম্বারের নিচে পূবালী ব্যাংকের আরেকটি বুথ থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা তুলে নেয়া হয়। দুটি ব্যাংকের সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে শরীফুলকে দেখা যায়। এই ঘটনার পর তারা জানতে পারেন, একই ব্যক্তি ১৬ নভেম্বর কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালী থানার কান্দিরপাড় এলাকায় পূবালী ব্যাংকের প্রধান শাখার এটিএম বুথ থেকে ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করে। আগের দিন ১৫ নভেম্বর সেই ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া এলাকায় পূবালী ব্যাংকের আরেকটি বুথ থেকে পরীক্ষামূলক ১০ হাজার টাকা তুলেন।

এর আগে ২০১৯ সালে চক্রটি ইসলামী ব্যাংক এবং আরব-বাংলাদেশ ব্যাংকের বুথে ঢুকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে ব্যর্থ হয় বলে জানান ওসি। তিনি জানান, একই চক্র গত ২২ জুন নগরীর কোতোয়ালী থানার জিপিও এলাকায় বিকেল পৌনে ৪টায় সাউথইস্ট ব্যাংকের বুথ এবং ৫টায় আগ্রাবাদ মিডল্যান্ড ব্যাংকের বুথে ঢুকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।
ওসি সদীপ বলেন, পূবালী ব্যাংকের চারটি বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে আমরা শরীফুলের বিষয়ে নিশ্চিত হই এবং যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শরীফুল সম্ভবত ভেবেছিল, বিষয়গুলোর দিকে আমরা যথেষ্ট নজর দিচ্ছি না। সেজন্য সে তার সহযোগীকে নিয়ে আবারও চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে বুথে ঢুকে এটিএম মেশিন জালিয়াতির মধ্য দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রামে তার প্রবেশের বিষয়ে নিশ্চিত হই এবং একপর্যায়ে গোয়েন্দা জালে ফেলে চক্রটির হোতাসহ দু’জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।

চক্রটির জালিয়াতির বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আদালতে আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে বলে জানান সদীপ কুমার দাশ। চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আবুল সালেহ নোমানের আদালত আসামীদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে জানিয়েছে পুলিশ।

ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহির উদ্দিন জানান, ২০১৩ সালে শরীফুল ইসলাম ও তার শিক্ষাগুরু যুক্তরাজ্যের নাগরিক মহোনতাজ পনোথোরাইসহ পাঁচলাইশ থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। তখন তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুইটি মামলায় ১৮ মাসের কারাদণ্ড হয়। ২০১৭ সালে সে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে। জেল থেকে বেরিয়ে সে একটি শপিং মলে চাকরি নেয়। পরবর্তীতে পাঁচটি ব্যাংকের কার্ড জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট তাকে ২০১৮ সালে ফের গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ কর্মকর্তা জহির বলেন, ব্যাংকের গ্রাহকেরা বিভিন্ন সুপার শপ ও ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে পণ্য কেনেন। কেনার পর তারা তাদের কার্ড পাঞ্চ করেন। সুপারশপে কার্ড পাঞ্চ করার সময় শরীফুল সুকৌশলে গ্রাহকদের তথ্য চুরি করে নেয়। সেই চুরি করা তথ্য মোতাবেক শরীফুল ক্লোন কার্ড তৈরি করে। পরে এসব ক্লোন কার্ড দিয়ে তারা এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে নেয়।

ডবলমুরিং থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অর্ণব বড়ুয়া জানান, ২০১৯ সালে জামিনে বেরিয়ে এটিএম মেশিন জালিয়াতির কলাকৌশল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন শরীফুল। ইউটিউবে ‘এটিএম জ্যাকপটিং’ অনুষ্ঠান দেখে এবং অনলাইনে পনথোরাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই কৌশল রপ্ত করে সে। তিনি বলেন, ‘দুই মডেলের এটিএম মেশিন শরীফুলের টার্গেট, যেগুলো থেকে সহজে টাকা উত্তোলন করা যায়। এসব মেশিনের স্পেয়ার চাবি তারা বিভিন্ন অনলাইন শপ থেকে খুঁজে সংগ্রহ করে। বিশেষ করে আলিবাবা অনলাইন শপিং থেকে চাবিগুলো সংগ্রহ করে থাকে।

পরবর্তীতে টার্গেট করা বুথে ঢুকে নির্দিষ্ট মেশিনে ম্যালাওয়ার সফটওয়্যার ব্যবহার করে পেনড্রাইভসহ একটি ইউএসবি হাবপোর্টের প্রবেশ করায়। সফটওয়্যারটি উইন্ডোজ প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে এই তারবিহীন মিনি কী-বোর্ডের মাধ্যমে মেশিনের প্যানেলের অপারেশনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন এটিএম মেশিনের সঙ্গে সেন্ট্রাল সার্ভারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর প্রয়োজনীয় কমান্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন করে নেয়।