** ‘বে’- নিয়ে বে-কায়দায় বে-সরকারী শিক্ষকরা** আশরাফুল রাংগা।

প্রকাশিত: ১২:২৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২০

*‘বে’-নিয়ে বে-কায়দায় বে-সরকারী শিক্ষকরা*        এ টি এম আশরাফুল ইসলাম সরকার রাংগা।

কোনো পেশা গ্রহণ বা অবলম্বনের পেছনে মানুষের মূলত: দুটি কারণ থাকে।

প্রথমত: পেশাটির প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ বা ভালোবাসা এবং

দ্বিতীয়ত: অর্থ ও সম্মানবোধ এবং তার ব্যক্তিস্বাধীনতা।

একজন সচেতন শিক্ষিত অভিজ্ঞ ব্যক্তি সাধারনত এ রকমই সুবিধা খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে  শুধুমাত্র শিক্ষকতা পেশায় এ দুটি কারণ ব্যতিত তৃতীয় আরও একটি কারণ কাজ করে। সেটি হল- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যখন এই সচেতন শিক্ষিত অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ অন্য কোন অপেক্ষাকৃত লোভনীয় বা আকর্ষণীয় পেশায় সুযোগ পান না, তখন তারা (মেধাবীরা) শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।

তবে যে কারণেই শিক্ষকতা পেশাকে গ্রহণ করা হোক না কেন, স্বীকার করতেই হবে- শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। পেশাগত নীতির প্রতি দৃঢ় আস্থা এবং এ সকল নীতি অনুসরণের ক্ষেত্রে অবিচল নিষ্ঠা কেবল একজন শিক্ষকের মর্যাদাকেই বৃদ্ধি করে না,  বরং পেশাকেও দৃঢ় আসনে অধিষ্ঠিত করে।

যিনি শিক্ষকতা করেন, তিনি একজন শিক্ষক। একজন শিক্ষক সমাজের গুরু, পথ প্রদর্শক, আলোকিত ব্যক্তি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- একজন দাম্ভিকতাপূর্ণ তর্জন-গর্জনকারী কিংবা রাজনৈতিক মার-প্যাঁচে কলুষিত ব্যক্তির এ মহান পেশায় দায়িত্ব সাজেনা। একজন শিক্ষক হবেন সকল কিছুর উর্ধ্বে।

অথচ, মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার সেই নিপুণ কারিগরদেরকে আজ রাজপথে নামতে হচ্ছে দাবী আদায়ের মিছিলে। বিষয়টি ভাবতেও অবাক লাগে। বিশ্বের অন্য কোন দেশে দাবী আদায়ের জন্য অন্ততঃ শিক্ষকদের রাজপথে নামতে হয়েছিল কিনা তা আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রে দেখলাম ও জানলাম।

মহান সৃষ্টিকর্তা শিক্ষকের জীবনকে আলাদা বৈচিত্র, সুখময় মাধুর্য দিয়ে সম্মানী করেছেন। যেখানে সুখ আছে, শান্তি আছে, মর্যাদা আছে এবং আছে আনন্দঘন উচ্ছ্বাস ভরা প্রগতিশীলতা। সুতরাং শিক্ষকতা নামক মহান পেশায় পদার্পণকারী ব্যক্তি অবশ্যই সামাজিক ছাঁচে গড়া সুন্দর নৈতিকতা পূর্ণ আদর্শের প্রতীক হবেন। শিক্ষক হবেন সুন্দর মন ও পবিত্র আত্মার শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী প্রজ্ঞাধারী আদর্শ মানুষ। নীতি বর্জিত কোনো মানুষ কোন কালেই আদর্শ শিক্ষক হতে পারেনা।

কিন্তু আমাদের বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অনেক বে-সরকারী শিক্ষক তাদের আদর্শের পথ ছেড়ে দূরে ছিটকে পড়ছেন। সে কারণেই বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন ভাবে সমালোচিত হচ্ছেন এসব গুরুজনরা। তারা শ্রেণি পাঠদান ছেড়ে প্রাইভেট/কোচিং-এর দিকে কেন ঝুঁকে পড়ছেন? পাঠদানে কেন মনযোগ বসাতে পারছেন না? কেন তারা বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপোকরণ (যেমন, ল্যাপটপ, মডেম, স্মার্ট ফোন, ডায়েরী, পোস্টার পেপার, মার্কার সহ আরও অনেক কিছু) ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছেন? নিজ পেশার প্রতি কেনই বা এতটা অশ্রদ্ধা! পাঠ পরিকল্পনা তৈরী করছেন না কেন? শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্যকাজে নিয়োজিত হচ্ছেন কেন? আর কেনই বা তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন?

এরুপ হাজার “কেন” আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু কেউ বোঝেনা, বুঝতেও চায়না; এই “কেন” টাই বা “কেন” আজ শিক্ষকদের জন্য “কেন” হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে এই “কেন” টাকে দূর করা যেতে পারে। কেন এই অনাকাঙ্খিত “কেন”- ঘটনার জন্য শুধু শিক্ষকদের দায়ী করা হয়? বরং দায়ী হিসেবে কি চিহ্নিত করা যায় না আমাদের সমাজ, রাষ্ট্রের, প্রতিকুল পরিবেশকে? আজ একজন শিক্ষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই।

একই পেশায় কর্তব্যরত সরকারী একজন শিক্ষকের যে সামাজিক মর্যাদা, সেই অবস্থান থেকে একজন বেসরকারী শিক্ষক সামাজিকভাবে অবমূল্যায়নের স্বীকার হচ্ছে, একই যোগ্যতা সম্পন্ন সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষকদের মধ্যে অর্থনৈতিক দূরত্ব তাদেরকে অনেকটা নিরুৎসাহিত করে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। এমপিও এবং বিশেষ করে নন-এমপিওভুক্ত বেসরকারী শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষের ভৌত অবকাঠামোগত যে সমস্যা (ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ছাড়া)  তা সরকারী যে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে একবারেই নগন্য।

এই রকম আরও অনেক আছে, যেমন- অল্প শিক্ষিত ম্যানেজিং কমিটির দৌরাত্ম, শিক্ষকদের মৌলিক চাহিদাগুলোর অপূর্ণতা, উপযুক্ত সম্মানী প্রদানে বৈষম্য, বাড়িভাড়া ১০০০ টাকা,  উৎসব ভাতা ২৫%, চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা, পদোন্নতি, অনুপাত প্রথা, উচ্চতর স্কেল, বদলীসহ বহুবিধ। এখন আমরা যদি এই ‘কেন’- এর উত্তরে বলি- এ রকম বৈষম্য হচ্ছে কেন? হয়ত উত্তর আসতে পারে- আপনারা এভাবে বলবেনই বা কেন?

সে যাই হোক। প্রসঙ্গত: বৈষম্যের একটা ছোট্ট উদাহরণ তুলে ধরছি। পিএসসি’র অধীনে নিয়োগ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে যখন বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হত, তখন ডিজি মহোদয়ের প্রতিনিধি হিসেবে সেই নিয়োগ বোর্ডে একজন নিয়োগকর্তা থাকতেন। বিধি মোতাবেক একজন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও কিন্তু ডিজি মহোদয়ের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন। সহকারী শিক্ষকের নিয়োগ পিএসসি’র অধীনে গেলেও প্রধান শিক্ষক সহ তৃতীয ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীবৃন্দের নিয়াগ এখনও কিন্তু ডিজি মহোদয়ের প্রতিনিধি দিতে পারেন। ভেবে দেখুন, একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়ে আরেকটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ প্রদানের ক্ষমতা তিনি রাখেন। অথচ ওনারা পদে, যোগ্যতায় সবকিছুতেই সমান।

কারণটা কি জানেন? কারণ শুধু একটাই- একজনের ‘বে’ নেই; আরেকজনের ‘বে’ আছে। এই ‘বে’ শব্দটি আমাদের ঘাড়ে এখন এমনভাবে চেপে বসেছে যে, আমরা যেসব দাবী করছি সেগুলো এখন *বে-মানান, *বে-আইনী, *বে-কারে পরিণত করে দিচ্ছে। আমাদের হাত থাকতেও *বে-হাতি, জাতীয়করণে আমরা *বে-নামী; আমাদের সকল চেষ্টাই *বে-গারে পরিণত হচ্ছে।  অথচ আমরা *বে-কসুর। অবস্থার *বে-গতিক দেখেই যে আমরা এই ‘বে’ উপসর্গটার বিলুপ্ত চাইছি, কর্তৃপক্ষ মনে হয় তা *বে-মালুম ভুলে গেছেন। আমাদের অবস্থাও তাই দিন দিন *বে-হাল হয়ে যাচ্ছে। আমরা *বে-কায়দায় পড়ে যাচ্ছি।

আমরা *বে-পরোয়া হতে চাইনা। গোটা শিক্ষক সমাজ জানে- জাতির কর্ণধার একজন শিক্ষক। দেশ ও জাতির সাথে প্রতারণা করা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু চাই- দয়া করে বেসরকারী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ‘বে’- উপসর্গটি উঠিয়ে নিয়ে সরকারী-বেসরকারী শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করে দিন। সামাজিক ভাবে শিক্ষকদের উপযুক্ত মূল্যায়নের সুযোগ দিন। শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা নিশ্চিত করে তাদের দৃষ্টি ভঙ্গিকে পাল্টে দেয়ার সুযোগ করে দিন। একজন ভালো শিক্ষককে ভালো পথ প্রদর্শক হিসেবে তখনি আশা করা যায়, যখন তার চলার পথে মৌলিক চাহিদা পূরণের কোন অন্তরায় থাকবেনা। তখন দেখবেন, এক-একজন শিক্ষক জীবনভর একজন ভালো ছাত্র হয়ে থাকবে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, A good teacher is a live long good student. A good teacher must be a good guide director.

পরিশেষে শিক্ষক সম্পর্কে ভার্কির দেয়া বিখ্যাত এই উক্তি দিয়েই আজকের মত ইতি টানছি। ভার্কি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সানি ভার্কি তার এক গবেষণায় বলেছেন-

“এই গবেষণায় একটি প্রচলিত বিশ্বাস প্রমাণিত হলো যে, যেসব সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা বেশি, সেখানে শিক্ষার্থীরা ভালো শিক্ষা পায়।”              তিনি আরও উল্লেখ করেন-

“কোনো সন্দেহ ছাড়াই আমরা এখন বলতে পারি, শিক্ষককে মর্যাদা করা কোনো নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটা কোনো দেশের শিক্ষার মানের জন্য জরুরী।” [তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া]

একবার গভীরভাবে ভেবে দেখুন। একবার নয় কয়েকবার, হাজার বার ভেবে দেখুন। দেখবেন এর সকল কিছুর সহজ সমাধান আপনাদের মাঝেই লুকিয়ে আছে।

লেখক: শিক্ষক, কবি, কলামিস্ট।  জাহাঙ্গীরাবাদ দ্বি মুখী উচ্চ বিদ্যালয়, পীরগঞ্জ, রংপুর।rangasarker100@gmail.com

 

 


Categories