বেসরকারি শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়

প্রকাশিত: ৪:১১ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

প্রতিনিয়তই পরিবর্তন ঘটছে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে । জীবন আর পরিবর্তন অনেকাংশে সমার্থক দুটি শব্দ । জীবন আছে মানে সেখানে পরিবর্তন থাকবেই, এবং থাকারও কথা বটে । কিন্তু শত সহস্র আইন কানুন, প্রত্যাশা প্রাপ্তির পরিবর্তন ঘটলেও কেবলমাত্র পরিবর্তন ঘটছে না বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের বোনাস বা উৎসব ভাতা প্রাপ্তির বিষয়টি ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮০ সালে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । তখন তাঁদের দেয়া হতো মুল বেতনের ৫০ শতাংশ । ১৯৮৭ সালে ১০০ টাকা বাড়ি ভাড়া, ১০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও ৫০ টাকার ইনক্রিমেন্ট প্রথা চালু হয় । অষ্টম বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত হবার পুর্ব পর্যন্ত এ নিয়ম বলবৎ ছিল । শিক্ষানীতি ২০১০এর আলোকে ১০০ টাকার বাড়ি ভাড়া ৫০০ টাকা এবং ১৫০ টাকার চিকিৎসা ভাতা ৩০০ টাকায় উন্নীত করা হয় । ২০১৬ সালের জুলাই থেকে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা আর চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা করে পেয়ে আসছেন । বৈষম্য বজায় রেখে বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বাড়লেও দীর্ঘ ১৭ বছরে বৈষম্যের অবসান হয়নি উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে । ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে ঈদুল আযহায় উৎসব ভাতার প্রচলন শুরু হয় । তখন থেকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দেয়া হয় মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ভাগ্যে জোটে ৫০ শতাংশ । উৎসব ভাতা প্রচলনকালে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীগন মূল বেতনের ৯৫ শতাংশ হারে সরকার প্রদত্ত বেতন
পেতেন । পরে ২০০৬ সাল থেকে ৫ শতাংশ হারে বেড়ে জাতীয় বেতন স্কেলের শতভাগ বেতন প্রাপ্তি নিশ্চিৎ হয় । ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে স্কেলের বেতন পরিবর্তিত হলেও উৎসব ভাতার আজও কোন পরিবর্তন হয়নি । এখনো বেসরকারি শিক্ষকদের দেয়া হচ্ছে অপ্রতুল, হাস্যকর ও অসম্মানজনক বাড়ি ভাড়া । মনে হয় বেসরকারি শিক্ষকদের ভাগ্যের চাকায় মরিচা ধরেছে ।

বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের লক্ষে । ৫ শতাংশ হারে প্রতিবছর ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্তি ও বৈশাখী ভাতা আদায় বাবেশিকফো এর আন্দোলনের ফসল । সরকার প্রদত্ত উৎসব ভাতা বৃদ্ধিকল্পেও বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের নেতৃবৃন্দ সরকারের কাছে প্রতিনিয়ত দাবী জানিয়ে আসছেন, সচেতনতামূলক সভা করছেন ।

বাবেশিকফো এর নেতৃবৃন্দ মনে করেন, উৎসব সর্বজনীন । করোনা সংকটে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীরা ঘরে বসে ২৫ শতাংশ হারে ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছেন । করোনাকালে বেসরকারি শিক্ষকদের জীবন যাত্রায় নেমে এসেছে অচলাবস্থা । করোনায় সৃষ্ট মহামারীর পাশাপাশি শিক্ষকদের জীবনে চলছে অর্থ সংকটের মহামারী । বর্তমান অবস্থায় শিক্ষকগন আজ গৃহবন্দী । কাঙ্খিত কোন কাজ নেই, নেই কোন বিকল্প আয়ের উৎস । তাই পেটের টানে কেউ দিনমজুর আবার কেউবা তরকারী বিক্রেতা সেজেছে । এরিমধ্যে আবার বড় ঈদ বা কোরবানীর ঈদ আসন্ন । প্রজাতন্ত্রের কর্মকতা, কর্মচারীরা যে রীতি নীতি মেনে ঈদ উৎসব পালন করে থাকেন, বেসরকারি শিক্ষকেরাও তার ব্যতিক্রম নয় । কারণ তাঁদেরও রয়েছে সামাজিকতা আন্তরিকতা ও পরোপকারের মানসিকতা । তবে কেন তাঁরা বৈষম্যের শিকার হবে ? ধার দেনা করে প্রতিবছর কেন তাঁদের পরিবারের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে ? তাহলে এবছরও কী তাঁরা সিকি পরিমান ঈদ উৎসব পালন করবে ? বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা শিক্ষকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে । কর্তৃপক্ষকে রক্ষনশীল গন্ডি থেকে বেরিয়ে এসে একটা আধুনিক চিন্তাশীল ও উৎপাদনমুখী মানসিকতা সৃষ্টি করা উচিৎ বলেই মনে করেন দেশের সচেতন জনগন । মুজিববর্ষেই তাঁরা পেতে চান বৈষম্যহীন শিক্ষার স্বাদ ।

দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক ছাড়াও রয়েছে খন্ডকালীন শিক্ষক । বিদ্যালয়ের বাড়তি শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁরা আমাদের সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকেন । করোনা দূর্যোগে এমপিও বিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত প্রনোদনা প্যাকেজে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন । কিন্তু এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের খন্ডকালীন শিক্ষকবৃন্দ কোন সরকারি প্রনোদনা বা ত্রানপ্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত রয়েছেন । তাই তাঁরা নিরবে, নিভৃতে শুধু চোখের জল ঝরাচ্ছেন । এরি মধ্যে আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে খন্ডকালীন শিক্ষকদের ছাটাই প্রক্রিয়া । যেমন- শ্রীনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাগ্যকুল হরেন্দ্র লাল স্কুল এন্ড কলেজের ৩১ জন খন্ডকালীন শিক্ষককে ইতিমধ্যেই ছাটাইয়ের নোটিশ দেয়া হয়েছে । এবং ষোলঘর এ কে এস কে উচ্চ বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক কর্মচারীদের করোনাকালে বেতন ভাতা বন্ধের সিদ্বান্ত গৃহীত হয়েছে । বাবেশিকফো এর শ্রীনগর শাখার নেতৃবৃন্দ ইতিমধ্যেই এঘটনার নিন্দা এবং গৃহীত সিদ্বান্ত পূর্নবিবেচনার আহবান জানিয়েছেন ।
লেখক
প্রদীপ কুমার সাহা
সিনিয়র শিক্ষক
শ্রীনগর পাইলট স্কুল এন্ড কলেজ, মুন্সিগঞ্জ


Categories