বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের পথে পথে ক্ষত

প্রকাশিত: ১০:৪৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২১

বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের পথে পথে ক্ষত

শিক্ষা যদি রাষ্ট্রের মেরুদন্ড হয়, তবে শিক্ষকরা হচ্ছেন সভ্যতার অভিভাবক ও সমাজের বলিষ্ঠ প্রতিনিধি। তারা শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ও সমাজ বিনির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁরা দেশের ৯৭ শতাংশ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একজন শিক্ষক তার জীবন যৌবন উজাড় করে শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়াকে ব্রত ভাবেন। সেই শিক্ষকরা বার্ধক্যে উপনীত হয়ে অসহায় হয়ে পড়েন, তাদের দায় দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপরেই বর্তায়। তাই মাসিক পেনশন সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বার্ধক্যে উপনীত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। তাদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ নিয়মিত পেনশনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। প্রতিমাসের বেতন থেকে হাজার হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ সমিতি করার কোন মানে হয়না। জাতীয় পে-স্কেলভুক্ত কোন পেশার কর্মচারীরা পেনশন সুবিধা পাওয়ার জন্য চাঁদা দিতে হয়না। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকরা একই বিধিবিধান ও কর্ম সম্পাদন করেন। অবসর সুবিধা পেতে তাদের সামান্য বেতন থেকে কেন প্রতিমাসে হাজার হাজার টাকা চাঁদা দিতে হবে? অবসর পরবর্তীতে কেনই বা সেই সঞ্চিত অর্থ ফেরত পেতে অবসর কল্যাণ ট্রাস্টের দুয়ারে ধর্ণা দিতে হবে? চাকরি শেষে পেনশন একজন চাকরিজীবীর সারা জীবনের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ। দেশের জাতীয় উন্নয়ন অগ্রগতিতে শিক্ষকদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাদের কর্মের অবদানের স্বীকৃতি না দিয়ে জোর করে বেতন থেকে হাজার হাজার টাকা চাঁদার বিনিময়ে এককালীন অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ সমিতি বন্ধ করতে হবে। তাদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ অবসর পরবর্তী পেনশন সুবিধা চালু করে রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব প্রতিপালন করা উচিত।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের দীর্ঘদিন ধরে অনেক আবেদন নিবেদনের পর ১৯৯০ সালে তৎকালীন সরকার বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য  কল্যান ট্রাস্ট আইন-১৯৯০ অনুমোদন করে। বিভিন্ন জটিলতার কারণে আইনের প্রবিধি ১৯৯৯ সালে প্রকাশ করা হয়। সেই আইনের প্রবিধিতে শিক্ষক কর্মচারীদের চাঁদার হার নির্ধারণ করা হয় মাসিক বেতনের ২ শতাংশ। আইনে বলা হয়েছে সময়ে সময়ে সরকার আর্থিক সংকটে সহায়তা প্রদান করবে। আইন দ্বারা স্বীকৃত কল্যাণ ট্রাস্টের এই চাঁদায় একজন শিক্ষক যতো বছর চাকরি করবেন সর্বশেষ বেতন স্কেলে ততো মাসের একালীন সুবিধা পাবেন।

অবসর সুবিধা বোর্ড আইন ২০০২ সালে অনুমোদিত হয়।  প্রবিধি তৈরি করা হয় ২০০৫ সালে। এ বোর্ডে শিক্ষক কর্মচারীদের মাসিক বেতনের ৪ শতাংশ চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। এ চাঁদা কর্তনের বিপরীতে একজন শিক্ষক কর্মচারী নিরবচ্ছিন্ন ২৫ বছর চাকরি শেষে, সর্বশেষ বেতন স্কেলের ৭৫ মাসের একালীন সুবিধা প্রাপ্য হবেন। অর্থাৎ অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে শিক্ষকদের বেতনের ৪ শতাংশ + ২ শতাংশ = ৬ শতাংশ চাঁদা ১৯৯০ কল্যান ট্রাস্ট আইন ও ২০০২ সালের অবসর সুবিধা বোর্ড এর আইন দ্বারা স্বীকৃত। উল্লেখিত হারে চাঁদা কর্তনের পরও বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে সরকার আর্থিক যোগান দিয়ে তা সমন্বয় করবে। পে-স্কেলভূক্ত এমপিও শিক্ষক কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট সুবিধা প্রদানের দায়িত্ব সরকারের। শিক্ষকদের বহু আকাঙ্ক্ষিত অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন শিক্ষকদের অবসর পরবর্তী কল্যান তো বয়ে আনতে পারেইনি বরং পদে পদে বিরম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের এই সংস্থা দুটি পরিচালিত হয় ২১ সদস্য বিশিষ্ট দুটি পরিচালনা কমিটি দিয়ে। শিক্ষা সচিব সহ ৭ জন সরকারি কর্মকর্তা বাকি ১৪ জন স্কুল কলেজ মাদ্রাসা কারিগরি ও কর্মচারী দ্বারা সরকার কর্তৃক মনোনীত। দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও সরকারের ছত্রছায়ায় এই সংস্থা দুটির, দূর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার আখড়া হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।  সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কর্মচারীদের কাছ থেকে তাদের জমা টাকা ফেরত পেতে ঘুষ দিতে হচ্ছে। শিক্ষক কর্মচারীদের মাসিক চাঁদা ও বিভিন্ন সময়ে সরকারি সহযোগিতা সত্ত্বেও হাজার হাজার শিক্ষক কর্মচারীরা বছরের পর বছর ঘুরেও তাদের জমানো টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও পরিদর্শন কালে জানা যায়, কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষকদের জমানো কোটি কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। একই আবেদনের বিপরীতে দুইবার টাকা পরিশোধের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ক্যাশ বই-তে আয়-ব্যয় হিসাব সংরক্ষণ না করা। প্রাপ্তি ও পরিশোধ সংক্রান্ত কোনও হিসাব সংরক্ষণ না করা। বার্ষিক হিসাব বিবরণী ও স্থিতিপত্র সরকারের নিকট পেশ না করার ঘটনা ঘটেছে।

১৯৯০ সালের কল্যাণ ট্রাস্ট আইন এবং ২০০২ সালের অবসর সুবিধা আইন লঙ্ঘন করে মাসিক বেতনের নির্ধারিত ৬ শতাংশ টাকা কর্তনের অতিরিক্ত ৪ শতাংশ টাকা কর্তন করা হচ্ছে। পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মচারীদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও বিদ্যমান আইন উপেক্ষা করে এই টাকা কর্তন করা হচ্ছে। ৬ শতাংশ কর্তনের বিপরীতে যে সুবিধা ১০ শতাংশ কর্তনের পরও একই সুবিধা। এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের উপর সীমাহীন অন্যায়। একজন শিক্ষক সারা জীবন শিক্ষকতার সেবা দিয়ে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পেনশন সুবিধা পাওয়া প্রাপ্য অধিকার।

সরকারি আর্থিক সহযোগিতা ব্যতীত শুধুমাত্র শিক্ষকদের বেতনের চাঁদায় অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? শুধুমাত্র শিক্ষক কর্মচারীদের চাঁদার জমানো টাকা দিয়ে অবসর প্রাপ্তদের সুবিধা দিতে হবে কেন? সেবা বা শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক পাওয়া সবার সাংবিধানিক অধিকার। শ্রমের বিনিময়ে সাহায্য, দান বা অনুদান দেয়া অনুচিত, এটি কখনো কাম্য হতে পারে না। এ থেকেই প্রতীয়মান, দেশের পাঁচ লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারের জ্ঞাতসারেই রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা ও  বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

”এমপিও শিক্ষার বৈষম্য আছে যতো,
প্রকৃত সত্য এ পেশার পথে পথে ক্ষত”

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম


Categories