ঢাকা, ১৬ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১লা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ১৮ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

বেত ফলের উপকারীতা।


প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২০

মোঃ আবু সামাঃ
ফলের নামঃ বেতফল ।
ইংরেজি নামঃ cane fruit
স্থানীয় নামঃ বেতফল, বেত্তুন, বেথুন, বেথুল, বেতগুলা, বেতগুটি, বেত্তুইন ।
বৈজ্ঞানিক নামঃ Calamus tenuis পরিবার/ গোত্রের নামঃ Arecaceae
প্রাপ্তিরস্থানঃ বেতগাছ বাংলাদেশের সর্বত্র জন্মে। সাধারণত গ্রামের রাস্তার পাশে, বসতবাড়ির পেছনে, পতিত জমিতে ও বনে কিছুটা আর্দ্র জায়গায় জন্মে। এশিয়ার গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের অধিকাংশ বনেই বেত জন্মে। বিষুবীয় আফ্রিকার আর্দ্র অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ চীন, ফিজি, জাভা ও সুমাত্রা পর্যন্ত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এ বনগুলিতে বেতগাছ ছড়িয়ে আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বেতগাছ বর্তমানে আবাসন সংকটের জন্য বিলুপ্তির পথে। গ্রামে বেত গাছ হারিয়ে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে বেতফলও এখন হারিয়ে যাচ্ছে।আবার ভিনদেশি গাছের আগ্রাসনেও বেতগাছ হারিয়ে যেতে বসেছে ।বাংলাদেশের বেতফল একটি বিলুপ্ত প্রায় ফল। ২-৩ দশক আগেও আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের বনেজঙ্গলে, নিচু ডোবার ধারে নানা রকম বেত দেখা যেত। এখন আর দেখা যায় না। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলা থেকে বেত রপ্তানি হয়েছে। আমাদের জীব বৈচিত্র রক্ষার্থে অধিক পরিমাণে বেতগাছ রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষনে যত্নবান হওয়া আবশ্যক।বর্তমানে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু বেতগাছ দেখা যায়।শালবনে বেত দুষ্প্রাপ্য, দৈবাৎ বনপ্রান্তে C. viminalis var. fasciculatus দেখা যায়। ম্যানগ্রোভ বনেও একই পরিস্থিতি, অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অঞ্চলে C. tenuis জন্মে।
আদি নিবাসঃ এটির আদি আবাস হিমালয়ের উষ্ণ এলাকা, বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার।
জাতঃবিশ্বে ১৩টি গণের প্রায় ৬০০ প্রজাতির বেত রয়েছে। বাংলাদেশে আছে বেতের মাত্র ২টি গণ, Calamus এবং Daemonorops। Daemonorops গণের আছে একটি প্রজাতি D. jenkinsianus (গোলাব বেত বা গোল্লা বেত)। Calamus গণের ১০ প্রজাতির মধ্যে আছে: C. erectus (কদম বেত), C. flagellum, C. floribundus, C. guruba (জালি বেত), C. gracilis, C. latifolius (কোরাক বেত), C. longisetus (উদম বেত), C. tenuis (সাঁচি বেত), C. viminalis var. fasciculatus (বড় বেত), C. quinquenervius। সর্বমোট ১১ প্রজাতির মধ্যে C. flagellum, C. floribundus, C. gracilis, C. quinquenverius এখন আর সহজলভ্য নয়। এগুলি খুব কমে গেছে কিংবা তাদের উৎপাদন একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছে।

উদ্ভিদস্বরুপঃ বেত একপ্রকার সপুষ্পক, কাঁটাময়, চিরসবুজ, কাণ্ড চিকন, লম্বা, শাখাহীন ও খুবই শক্ত এবং অরোহী উদ্ভিদ যা ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ভেজা ও জংলা নিচুভূমিতে ভাল জন্মে । ফলের জন্য বেতের চাষ করা হয়না; তবে ফল খেতে সুস্বাদু ও অনেকেরই প্রিয়। কিছুদিনের মধ্যেই বেত ঘন হয়ে ঝাড়েও পরিণত হয়। বেতগাছ জঙ্গলাকীর্ন কাঁটাঝোপ আকারে দেখা যায়। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাড়াও হাওরের কান্দাতে বেতগাছ জন্মে। চিরসবুজ এই উদ্ভিদটি পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় ৪৫ থেকে ৫৫ ফুট এবং কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি লম্বা হয়ে থাকে।
সরু ও নলাকার কাণ্ড প্রস্থে সাধারণত ৫-১৫ মিলিমিটার। প্রতিটি কাণ্ডের আগা থেকে নতুন পাতা বের হয় ও বেড়ে ওঠে। কাণ্ড বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর নিচের অংশ পোক্ত হতে থাকে। কোনো ধারককে ধরে রাখার জন্য কাঁটাযুক্ত ধারক লতা বের হয়। বেতে ফুল ধরার আগে গাছ থেকে একধরনের মিষ্টি ঘ্রাণ আসে। তখন মৌমাছি, পিঁপড়া, মাছি এই রস খেতে বেত গাছে ভিড় জমায়। এই ফল গোলাকার বা একটু লম্বাটে গোলাকার, ছোট ও কষযুক্ত টকমিষ্টি। এর খোসা শক্ত হলেও ভেতরটা নরম। বীজ শক্ত। কাচা ফল সবুজ ও পাকলে সবুজাভ ঘিয়ে বা সাদা রঙের হয়। এটি থোকায় থোকায় ফলে। প্রতি থোকায় ২০০টি পর্যন্ত ফল হয়। বেতগাছে ফুল আসে অক্টোবর মাসে আর ফল পাকে মার্চ-এপ্রিল মাসে। এটি অপ্রচলিত ফল হলেও অনেকের কাছে খুবই প্রিয়। মাটির প্রকার ভেদে এই ফল টক মিষ্টি হয়।

ব্যবহৃত অংশঃ ফল ও মূল।
ব্যবহারঃ .
১.প্রথমে বেত গাছের মূল সেদ্ধ করে নিতে হবে। এরপর এই সেদ্ধ করা পানি দিয়ে কুলকুচি করলে দাঁতের গোড়া শক্ত হয়।
২.বেত গাছের মূল চূর্ণ্ করে ঘিয়ে ভেজে নিতে হবে। এবার মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে শুক্রাণুর বৃদ্ধি ঘটে।
৩.বেত গাছের মূলের ক্বাথ সেবন করলে মূত্র সংক্রান্ত যাবতীয় রোগ নিরাময় হয়।
৪.প্রথমে বেত ফলের রস চিনির সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর এটি নিয়মিত খেলে পিত্তশূল ভালো হয়ে যাবে।
৫.বেত ফলের শাঁস খেলে আমাশয় ভালো হয়ে যায়।
৬.দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেতের কচি কান্ড তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়।
৭.বেত অতি মূল্যবান ও অর্থকরী উদ্ভিদ। উন্নতমানের হ্যান্ডিক্রাফট, গৃহের আসবাবপত্র তৈরির জন্য বেতের ব্যবহার বেশি।