বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

প্রকাশিত: ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০

কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। দীর্ঘায়িত বন্যায় বানভাসিদের কষ্ট বেড়েছে। ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জে পদ্মার পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ছয়টি ইউনিয়নের হাজারো পরিবার। মানিকগঞ্জে পদ্মা-যমুনার পানি কিছুটা কমলেও বিপদসীমার ৭৮ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দী অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থানে। জামালপুরে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বেড়ে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। টানা তিন সপ্তাহেরও অধিক স্থায়ী বন্যায় পানিবন্দী পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য সঙ্কট। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। যমুনার বিভিন্ন চরাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গোখাদ্যের মারাত্মক সঙ্কট। বন্যার পানিতে গ্রামীণ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও ঘাঘট নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দী। কর্মহীন হয়ে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ। বন্যায় কুড়িগ্রামে বানভাসিদের কষ্ট বেড়েছে দ্বিগুণ। ফরিদপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। নিচু এলাকার বাড়িঘর ও সড়ক এখনও পানির নিচেই রয়েছে। খবর স্টাফ রিপোর্টার, নিজস্ব সংবাদদাতা ও সংবাদদাতাদের।

মানিকগঞ্জে পদ্মা-যমুনার পানি গত কয়েকদিন সামান্য কমলেও রবিবার তা বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৭৮ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলার কালিগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে শিবালয়, ঘিওর, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। সাটুরিয়া ও সদর উপজেলাসহ জেলা শহরের আশপাশের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চরাঞ্চলে বানভাসি মানুষ কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন যাপন করছেন। বিশুদ্ধ পানি ও রান্না করা খাবারের পাশাপাশি পশু খাদ্যের সঙ্কটে পড়েছে এসব বন্যাকবলিত মানুষ। অনেকেই নিজদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু স্থানে অথবা সরকারী আশ্রয় কেন্দ্রে।

জানা গেছে, এ পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। ১৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৬৫০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এ পর্যন্ত ১০ হাজার পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য, গোখাদ্য ও নগদ অর্থও রয়েছে। বন্যায় সাত উপজেলার ৩০ হাজার ৫শ’ হেক্টর ফসলি জমি বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) ॥ পদ্মায় অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দুই উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নবাবগঞ্জ-মানিকগঞ্জ রক্ষা বাঁধের পশ্চিম অংশের ২৫ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া দোহারের অন্তত ছয়টি ইউনিয়নের বাসিন্দারা পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোহারের আটটি ইউনিয়নের মধ্যে নয়াবাড়ি, মাহমুদপুর, বিলাসপুর, সুতারপাড়া, নারিশা ও মুকসুদপুর ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী। দোহারের ‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত মৈনট ঘাট এলাকাটি পদ্মার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পর্যটন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এছাড়া ধোয়াইর বাজারসহ পূর্ব ও পশ্চিম ধোয়াইর গ্রামের বেশির ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নারিশা ইউনিয়নের মেঘুলা বাজার, বিলাসপুরের মধুরচর, রানীপুর, কৃষ্ণদেবপুর, রাধানগর, মাহমুদপুরের নারায়ণপুর, হরিচন্ডি ও মুকসুদপুরের পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পদ্মা তীরবর্তী পরিবারগুলো প্রাণ বাঁচাতে ও জীবন ধারণের জন্য অন্যত্র সরে যাচ্ছে। উপজেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকসহ ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে।

একই অবস্থা নবাবগঞ্জের পদ্মার তীরবর্তী জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের তিতপালিদয়া, পানিকাউর, কঠুরি, আশয়পুর, রায়পুর, ঘোষাইল, কেদারপুর, আর ঘোষাইল, রাজাপুর, বালেঙ্গা, কান্তারটেক, খাটবাজার, নয়াডাঙ্গী, চারাখালী ও পশ্চিম সোনাবাজু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

জামালপুর ॥ যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রসহ জেলার সব নদ-নদীর পানি ফের বাড়ছে। যমুনা নদীর পানি রবিবার দুপুরে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১১২ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আর ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার এক সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে টানা বন্যায় সাত উপজেলার ৬৭৭ গ্রামের প্রায় দশ লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।

ভূঞাপুর ॥ টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বানভাসিরা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এখনও লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় আছে। অন্যদিকে, যমুনা নদীর পানি বাড়তে থাকায় বিভিন্ন গ্রাম ও চরাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, গো-খাদ্যের চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বসতঘরে পানি ওঠায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে উঁচু বাঁধ ও সড়কের ওপর খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। আর ব্যাপক বৃষ্টিতে মানুষের ভোগান্তি বেড়ে গেছে বহুগুণে। বন্যার পানিতে গ্রামাঞ্চলের সড়কগুলো নষ্ট হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে।

গাইবান্ধা ॥ ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। এদিকে গত একমাসে পর পর দু’দফায় বন্যায় সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও ঘাঘট নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী থাকায় তারা চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ইতোমধ্যে যারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বিভিন্ন এলাকায় গরু-ছাগল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে তারা ঘরে ফিরতে পারছে না। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়ায় তারা চরম বিপাকে পড়েছে। এদিকে সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ি ও সদর উপজেলার ১৯টি পয়েন্টে ব্যাপক নদী ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ॥ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বন্যা পরিস্থিতি অনেকটা স্থিতিশীল রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার সাতটি পয়েন্টের মধ্যে সরাইল উপজেলা আজবপুর পয়েন্টে পানি এক সে.মি. কমেছে। কুরুলিয়া, গোকার্ন ও নবীনগরে তিতাস নদীর পানি কিছুটা বাড়লেও মেঘনা, হাওড়া ও গঙ্গাসাগর পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে। তবে সরাইল ও নাসিরনগরের নিচু এলাকার ঘরবাড়ি ও সড়ক এখনও পানির নিচে রয়েছে।

ফরিদপুর ॥ ফরিদপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পদ্মা নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার ১১৭ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে শহর রক্ষা বাঁধটি। বাঁধের বিভিন্ন অংশ দিয়ে পানি চুইয়ে বের হচ্ছে। পানির সঙ্গে বাঁধের নিচের মাটিও সরে যাওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বাঁধটিতে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বাঁধটি রক্ষা করার জন্য।

কুড়িগ্রাম ॥ কুড়িগ্রামে প্রধান দুটি নদ-নদী ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি সামান্য কমলেও বিপদসীমার ওপর প্রবাহিত হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। বরং এক মাস ধরে এই দুটি নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতির দিকেই এগোচ্ছে। এ অবস্থায় জেলার সাড়ে তিন শতাধিক চরাঞ্চলের প্রায় সাড়ে চার লক্ষাধিক মানুষ বন্যা দুর্গত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে গবাদি পশু নিয়ে অবর্ণনীয় কষ্টে দিন পাড় করছেন।


Categories