বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থীকে স্কাউটিংয়ে সম্পৃক্ততার পরিকল্পনা।

প্রকাশিত: ৫:২৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০

 

প্রদীপ কুমার সাহাঃ

স্কাউট হলো বিশ্বব্যাপী একটি অরাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক সুসংগঠিত বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিশু কিশোর যুবক, যুবতীদের শারীরিক মানসিক, নৈতিক এবং সামাজিক গুনাবলী উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের পরিবার সমাজ দেশ তথা বিশ্বের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। দেশ, জাতি বর্ণ ও ভাষাভেদে স্কাউটদের কার্যক্রমে তেমন কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না।

অনুসদ্ধানে জানা যায়, বিশ্বের প্রায় ১৭১ টি দেশে স্কাউটিং চালু আছে। এছাড়া প্রায় অর্ধ শতাধিক দেশ ও বিশেষায়িত অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়া ও স্কাউট কার্যক্রম চলছে।

মানুষের মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে স্কাউটরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা-খড়া এমনকি বর্তমান করোনা দুর্যোগেও বিপন্ন মানুষদের সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে অগ্রনীভূমিকা পালন করছে। দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষের আশা ও ভরসার আশ্রয়স্থল হিসেবে ইতিমধ্যেই স্কাউটরা সুনাম অর্জন করেছে। এছাড়া মাদক প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, ইভটিজিং প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনেও স্কাউটরা অংশ নিচ্ছে। কথায় বলে, Ôঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোকে যারা সময়ের অপচয় ভাবেনা, তারাই কেবল পারে মানুষের কল্যানে নিজেকে আত্মোৎসর্গ করতে Õ। স্কাউটদের ক্ষেত্রে কথাটির পূর্ণ বাস্তবায়ন যথার্থ বলেই আমি মনে করি। স্কাউটিংয়ে দীক্ষা গ্রহনের মাধ্যমে স্কাউটরা আর্থ সামাজিক ও মূল্যবোধ অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতি গঠনে আত্মনিয়োগ করছে।

 

প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একটি সম্পূরক সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম হচ্ছে স্কাউটিং। পরিকল্পিত উপায়ে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির লক্ষ্যে দেশের প্রায় প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কাউটিং প্রথা চলমান রয়েছে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ স্কাউটস প্রনীত স্ট্রাটেজিক প্লান ২০১৩ এর আলোকে স্কাউটিং এর গুনগত মান অক্ষুন্ন রেখে স্কাউট সংখ্যা ১৭ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সেই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।

আমাদের দেশে স্কাউটিং এর শুরুতে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবশ্যিকভাবে অন্ততঃ একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাব দল, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্কাউট দল এবং কলেজ পর্যায়ে রোভার দলের কার্যক্রম সিমীত ছিল। প্রতিটি ইউনিট একজন প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত দক্ষ শিক্ষকের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইউনিটে সর্বোচ্চ ২৪ জন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইউনিটে সর্বোচ্চ ৩২ জন স্কাউট সদস্য অন্তর্ভূক্ত থাকতে পারে। স্ট্রাটেজিক প্লান এর পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারীকৃত পরিপত্রের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২ টি করে  স্কাউট দল বা ইউনিট চালু করার নির্দেশনা আসে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বাস্তবে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে তা বোধগম্য নয়। দল পরিদর্শনে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে স্কাউট কার্যক্রম চলছে কাগজে কলমে। মুক্তাঙ্গনে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের স্কাউটরা অনেকাংশে বঞ্চিত। স্ট্রাটেজিক প্লান ২০২১ এর আলোকে স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের স্কাউট সংখ্যা ২১ লাখে উন্নীত করার আরেকটি মহাপরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছে। এরি মধ্যে আবার গত ২৮ জুন ‘২০২০ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমিক ও  উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে এক পরিপত্রের মাধ্যমে দেশের সকল ছেলে মেয়েকে স্কাউটিং এর আওতায় আনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এই মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের স্কাউট সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের দক্ষ মানব সম্পদের গুনগত মানোন্নয়ন হবে নিশ্চই কিন্তু “কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই“ সেই প্রবাদ বাক্যের প্রতিফলন যাতে না ঘটে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৩২০ জন শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২ জন ইউনিট লিডারের নেতৃত্বে ২ টি ইউনিট চলমান থাকলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬৪ জন শিক্ষার্থী স্কাউট দলে অন্তর্ভূক্ত হতে পারবে। কিন্তু ৩২০ জন শিক্ষার্থীর সকলকে স্কাউট দলে অন্তর্ভূক্ত করতে হলে ১০ জন প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন অনেকটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

শতভাগ শিক্ষার্থীকে স্কাউটিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষার্থী অনুপাতে  শিক্ষক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান প্রধানকেও প্রশিক্ষনের আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য যে স্তরের প্রশিক্ষন কর্মসূচি চালু রয়েছে তা পরিবর্তনের মাধ্যমে আলাদা কোর্স ডিজাইন প্রনয়ন করতে হবে। প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের আকর্ষণীয় প্রনোদনার ব্যবস্থা থাকলে তারা ক্রমশই আগ্রহী হয়ে উঠবে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজন হবে ইউনিট লিডারের সক্রিয় আন্তরিকতা আর প্রতিষ্ঠান প্রধানের সার্বিক সহযোগিতা। এ দুয়ের মাঝে সমন্বয়ের অভাব হলে কাঙ্খিত ফলাফল প্রাপ্তিতে অন্তরায় সৃষ্টি হবে। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন দেশে স্কাউট সংস্থাসমূহ তাদের সম্পদ একাগ্রতা, দায়িত্বশীলতা ও উদ্ভাবনী চেতনার আলোকে এডাল্ট লিডারদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করছে। আমাদেরকেও সে পথের পথিক হতে হবে। আর যাদের জন্য এতো আয়োজন তাদের প্রোগ্রামগুলো যদি আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর হয় তবে তারা সানন্দে সাড়া দেবে। মনে রাখতে হবে, একজন স্কাউট চিন্তা কথা ও কাজে নির্মল। স্কাউটের এ কথাকে বাস্তবে রুপ দিতে পারলে আমাদের যুবক যুবতীদের মাঝে দৃশ্যমান সামাজিক অবক্ষয়সহ সকল সংকটের অবসান হবে।

লেখকঃ শ্রীনগর পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের একজন উডব্যাজধারী সিনিয়র শিক্ষক, সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ স্কাউটস, শ্রীনগর উপজেলা, প্রাক্তন সম্পাদক, শ্রীনগর উপজেলা স্কাউটস ও প্রাক্তন জেলা স্কাউট লিডার, মুন্সীগঞ্জ।