“বার্সেলোনার ভুল দলবদলে জুভেন্টাসে আর্থুর, বার্সেলোনায় পিয়ানিচ”

প্রকাশিত: ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

সোমবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রথমে আর্থুরের ব্যাপারে জুভেন্টাসের সঙ্গে সমাঝোতায় পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করে বার্সেলোনা। খানিক পর পিয়ানিচকে দলে আনার বিষয়টিও জানায় কাতালানরা।

চুক্তি সম্পন্ন হলেও দুই খেলোয়াড়র চলতি মৌসুম বর্তমান ক্লাবের সঙ্গেই থাকবেন। পরের মৌসুমে তারা যোগ দেবেন নতুন ক্লাবে। অর্থাৎ, বার্সেলোনার সঙ্গে চলতি মৌসুমের শেষ পর্যন্ত খেলবেন আর্থুর।

২০১৮ সালের গ্রীষ্মে বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেরার পর আর্থুরের কথাগুলো ছিল অন্য অনেক তরুণ ফুটবলারের প্রতিধ্বনি। মেসির সঙ্গে একই দলে খেলার লোভ কার নেই। আর্থুর নিজেকে বড্ড ভাগ্যবান ভেবেছিলেন সেদিক থেকে। কিন্তু ব্রাজিলের গ্রেমিও ক্লাব থেকে ইউরোপিয়ান ফুটবলের কঠিন লড়াইয়ে নাম লেখানোর পর তিনি কি ভেবেছিলেন জীবনের গতিপথ এভাবে বেঁকে যাবে? অপার সম্ভাবনা নিয়ে ন্যু ক্যাম্পে যোগ দিয়ে ‘বিতাড়িত’ হবেন এভাবে? আর্থুর নিজে তো দূরে থাক, ফুটবল বিশ্বের কেউই হয়তো প্রস্তুত ছিলেন না এই পরিস্থিতির জন্য, বিশেষ করে, যে খেলোয়াড়ের সঙ্গে অদল-বদল করে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ‍জুভেন্টাসে।

ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডারের বয়স মাত্র ২৩। বার্সেলোনা কিংবদন্তি জাভির ছায়া খোঁজা হয় যার মধ্যে। মাঝমাঠের কিছু দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে প্রমাণও করেছেন লম্বা রেসের ঘোড়া তিনি। বয়সের মাপকাঠিতে আরও স্পষ্ট হয়, সামনে অপেক্ষা করছে দারুণ ভবিষ্যৎ। যে কারণে বার্সেলোনার বড় ‘সম্পদ’ ভাবা হচ্ছিল তাকে। অথচ তরুণ সম্ভাবনাময় এই মিডফিল্ডারকে তাড়িয়ে জুভেন্টাস থেকে ৩০ পেরিয়ে যাওয়া মিরালেম পিয়ানিচকে নিয়ে আসছে কাতালানরা!

ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডারকে দিয়ে ১২ মিলিয়ন ইউরো লাভ হচ্ছে বার্সেলোনার। অদল-বদল ট্রান্সফারে আর্থুরের দাম ৭২ মিলিয়ন, আর পিয়ানিচের মূল্য ৬০ মিলিয়ন ইউরো। এতে বার্সেলোনার বর্তমান বোর্ডের আর্থিক বছরের হিসাব মেলানো গেছে। ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া আর্থিক বছরের অবস্থা যেন নেতিবাচক ধরা না পড়ে, সেজন্য বার্সেলোনার দরকার ছিল আরও ৩৮ মিলিয়ন ইউরো। যেটা পূরণ হয়েছে আর্থুরকে ‘বিদায়’ করে।

আরেকটি ব্যাপারও আছে। এবারের মৌসুমের শুরু থেকেই লাউতারো মার্তিনেজের বার্সেলোনায় আসার কথা শোনা যাচ্ছে। ইন্টার থেকে তাকে আনতে মোটা অঙ্কের অর্থ দরকার, থাকছে ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে’র ব্যাপারও। সেটা পূরণ করার সঙ্গে নন-ইউরোপীয় লাউতারোর জন্য বার্সেলোনায় কোনও কোটা ফাঁকা ছিল না। আর্থুরকে জুভেন্টাসের কাছে বিক্রি করে সেই জায়গাও ফাঁকা হলো।

এরপরও প্রশ্ন থেকে যায়, মেসি যাকে জাভির সঙ্গে তুলনা করেছেন, খোদ জাভিও যার মধ্যে তার ছায়া খুঁজে পেয়েছেন, তাকে এভাবে ন্যু ক্যাম্প ছাড়তে হচ্ছে কেন? মোটা দাগে কারণটা হলো বার্সেলোনার ভুলে ভরা দলবদলের নীতি। গত তিন বছর ধরে ভুল পাত্রে পানি ঢালায় তৃষ্ণার্তই থেকেছে কাতালানরা! এতদিনে এসে যার ‘বলি’ হলেন আর্থুর।

পুরো চিত্রটা বুঝতে ফিরে যেতে হবে ২০১৭ সালের গ্রীষ্মে। আচমকা ২২২ ‍মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনা ছেড়ে গেলেন নেইমার। এত কাঠখড় পুড়িয়ে যাকে আনা হয়েছিল সান্তোস থেকে, তার এভাবে বিদায়ে ভেঙে পড়ে বার্সেলোনা বোর্ড। খুঁজতে থাকে তার সম্ভাব্য বদলি। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের জায়গা পূরণে নিয়ে আসে দুজনকে- ফিলিপে কৌতিনিয়ো (১২০ মিলিয়ন ইউরো) ও উসমান ডেম্বেলেকে (১০৫ মিলিয়ন ইউরো)। যাদের কিনতে নেইমারকে বিক্রির অর্থের চেয়েও বেশি খরচ হয়ে যায় তাদের।

কৌতিনিয়োকে কেনার ভুল বুঝতে বেশি সময় লাগেনি বার্সেলোনার। ওদিকে চোটের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন ডেম্বেলে। বিক্রি করতে চেয়েও কাঁটা হয়ে বেঁধে থাকা কৌতিনিয়োকে কোনও রকমে বিদায় করে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ধারে পাঠিয়ে। অনেক চেষ্টা করেও ডেম্বেলেকে পাঠাতে পারেনি প্যারিস সেন্ত জার্মেইয়ে। অতঃপর ভুলে ভরা দলবদলে যুক্ত করে তারা আতোঁয়া গ্রিজমানকে। আতলেতিকো মাদ্রিদ থেকে আনতে খরচ ১২০ মিলিয়ন ইউরো। অনেক আশা করে ফরাসি ফরোয়ার্ডকে নিয়ে এলেও ব্যর্থতার নিত্যদিন সঙ্গী তার।

এর মধ্যে করোনাভাইরাসের আঘাতে অর্থনৈতিক অবস্থায় আরও আঘাত লাগে কাতালানদের। তাছাড়া সামনের মৌসুমের প্রস্তুতির ব্যাপারও আছে। লুইস সুয়ারেজের উত্তরসূরি আনতে লাউতারোর পেছনে লেগে আছে অনেকদিন থেকে। বাৎসরিক আর্থিক অবস্থা ও উয়েফার ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে ঠিক না থাকলে দলবদলের সমীকরণটা আরও কঠিন হয়ে যাবে, তাই ‘বলি’ বানানো হলো আর্থুরকেই!

আর্থুরের এই ঘটনায় বার্সেলোনার বর্তমান বোর্ডের ব্যর্থতার চিত্রই ফুটে ওঠে। এজন্য সমালোনার তীরে বিদ্ধও হচ্ছে তারা। সামনের নির্বাচনের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিক্তর ফন্ত ধুয়ে দিয়েছেন জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউয়ের বর্তমান বোর্ডকে। তার দাবি, নিজেদের পিঠ বাঁচাতে আর্থুরকে ‘বলি’ বানিয়েছে তারা। তা না হলে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে থাকা পিয়ানিচকে এনে সম্ভাবনাময় তরুণ ব্রাজিলিয়ানকে ছেড়ে দেওয়া হতো না। ফন্তের মতে, বর্তমান বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থরক্ষাকেই বানিয়েছেন মূল লক্ষ্য।

আর্থুর নাকি যেতে চাননি, বার্সেলোনায় ‘নতুন জাভি’ হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। আসল জাভির ছোঁয়ায় হয়তো আরও বিকশিত করতে পারতেন নিজেকে। শোনা যাচ্ছে, জাভি নাকি কোচ হিসেবে বার্সায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সত্যিই যদি তিনি ফেরেন ন্যু ক্যাম্পে, ২৩ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ানের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে আরও- এ কথা বলে দেওয়া যায় চোখ বন্ধ করে।

২০১৮ সালে গ্রীষ্মের দলবদলে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব গ্রেমিও থেকে বার্সেলোনায় নাম লিখিয়ে ২৩ বছর বয়সী আর্থুর সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন লিওনেল মেসিকে। আর সামনের মৌসুমে খেলবেন তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে। পিয়ানিচের ক্ষেত্রে বিষয়টা উল্টো। রোনালদোর সঙ্গে খেলে এসে সতীর্থ হিসেবে পাচ্ছেন মেসিকে।