ফোরাম: একটি নাম, একটি ইতিহাস

প্রকাশিত: ১:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২০
 আজ ২৮ জুলাই বাংলাদেশের শিক্ষক আন্দোলনের এক স্মরণীয় দিন। ২০১৭ সালের এই দিনে সাধারণ শিক্ষকদের প্রাণের স্পন্দন বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম(বাবেশিকফো) প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ সংগঠনটির তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।  প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে একের পর এক কর্মসূচী দিয়ে অল্প দিনেই সংগঠনটি শিক্ষক সমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করে যা এ দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
তখন ২০১৭ সালের জুলাই মাস। জুন মাস গত হয়ে জুলাই মাস ও  শেষ হওয়ার পথে। শিক্ষকরা তখনো জুন মাসের বেতন পায়নি। এর মধ্যে হুট করে কোনরুপ সুবিধা না বাড়িয়ে শিক্ষকদের বেতন থেকে অতিরিক্ত ৪% কর্তনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর বোর্ডের সভায় গতানুগতিক সংগঠন/ সমিতিগুলো  ৪% কর্তনের রেজুলেশনে স্বাক্ষর করে আসল। এহেন অমানবিক সিদ্ধান্তে  সারাদেশের  শিক্ষকরা হায় হুতাশ করছিলেন  , ৫ লক্ষ বেসরকারি শিক্ষকের প্রায় ৪৬টি সংগঠনের মধ্যে  একটি সংগঠনকে ও এ ব্যাপারে কোন প্রতিবাদ করতে দেখা গেলনা। তখন একমাত্র  বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম নেতৃবৃন্দই  ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান, সারাদেশের শিক্ষকরা ফোরামের গ্রুপ পেজ, লাইক শেয়ার দিয়ে বিষয়টি ভাইরাল করলে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রধান শিরোনাম করে। সরকার শিক্ষকদের ক্ষোভ উপলব্ধি করতে পেরে বিষয়টি স্থগিত করেন।
    ফোরাম নেতৃবৃন্দ উপলব্ধি করতে পারেন, একমাত্র জাতীয়করণই শিক্ষকদের সকল বঞ্চনা থেকে মুক্তির স্থায়ী উপায়। তারপর ১৪ জুলাই , ২০১৭ কুর্মিটোলায় সমবেত হন সারাদেশের ১৪ জন শিক্ষক, সিদ্ধান্ত নেন জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনকল্পে ফোরাম গঠনের। এরপর ২৮ জুলাই , ২০১৭ কুর্মিটোলায় বিশাল শিক্ষক সমাবেশে আসেন সারাদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষক। গঠন করা হয় বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম। “সংগঠন যার যার, জাতীয়করণ সবার” এই নীতির ভিত্তিতে অন্যান্য সংগঠনগুলোকে ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়। এরপর বাকিটুকু ইতিহাস।
অল্প দিনেই দেশের প্রত্যেকটি বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ফোরামের কমিটি গঠিত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে প্রধান অতিথি করে জাতীয়করণের একদফা দাবিতে সর্ব প্রথম স্মরণকালের সর্ববৃহৎ শিক্ষক মহাসমাবেশ  ফোরামই আয়োজন করে। জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাতীয়করণের দাবি তুলে ধরবেন, কিন্তু গতানুগতিক রাজনীতিবিদদের মত তিনি ও তার প্রতিশ্রুতি ভুলে যান।
    ফোরাম  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর  স্মারকলিপি প্রদান করে, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারকে বারবার আল্টিমেটাম দেওয়ার পরও কোন কাজ না হওয়ায় ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার ২০ দিন অবস্থান ও আমরণ অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যায়। দেশের সবকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় অনশনের খবর সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অনশন চলাকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দেন, পর্যায়ক্রমে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে। কিন্তু ফোরাম একযোগে জাতীয়করণের দাবিতে কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে অনশন চালিয়ে যায়।  অনশনের শেষ দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২ জন সচিব এসে ঘোষণা দেন জাতীয়করণ পর্যায়ক্রমে হবে এবং আপাতত সরকারি শিক্ষকদের ন্যায় বেসরকারি শিক্ষকদের ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখী ভাতা প্রদান করা হবে। তখন আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার কথা চিন্তা করে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনশন স্থগিত করা হয়।
এরপর ফোরাম নেতৃবৃন্দ মন্ত্রী এমপি সহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ চালিয়ে যান  সরকারকে প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য তাগাদা দিতে থাকেন। আমরা সিলেটে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদের সাথে চার দফা সাক্ষাৎ করি। ঢাকায় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আরো দু’ দফা সাক্ষাৎ করেন। অবশেষে সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ২০১৮ সালের জুলাই থেকে প্রথমবারের মত বেসরকারি শিক্ষকরা বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এবং ২০১৯ সালে থেকে বৈশাখী ভাতা পেয়ে যাচ্ছেন। ফোরাম নেতৃবৃন্দ সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
কিন্তু বিধিবাম! বেসরকারি শিক্ষকদের কপালে বেশিদিন এ সুখ সইল না। সরকার ৫% ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার পরই অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের সচিবদ্বয় আবারো ৪% কর্তনের পাঁয়তারা শুরু করেন।  আবারো আন্দোলন শুরু করে ফোরাম। সিলেটের নেতৃবৃন্দ আবারো তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে সিলেট শহর থেকে তার গ্রামে ছুটে যান । তখন নির্বাচনের সময় , শিক্ষামন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ‌। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষকদের আশ্বস্ত করেন।
নির্বাচনের পর বর্তমান সরকার আবারো ক্ষমতায় এলে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী হন চাঁদপুরের  জনাব ডাঃ দীপু মনি এমপি। ফোরাম নেতৃবৃন্দ সচিবালয়ে উনার এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান ন
নওফেল এর কার্যালয়ে গিয়ে দুজনকেই পুস্পস্তবক ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করে অভিনন্দন জানান। কিন্তু দায়িত্ব নিয়েই উনারা শিক্ষকদের মতামত সম্পুর্নভাবে অগ্রাহ্য করে ৪% কর্তন কার্যকর করেন। শিক্ষামন্ত্রী  শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি সম্মেলনে এলে  কঠোর নিরাপত্তা ব্যাবস্থা সত্বেও সিলেটের ফোরাম নেতৃবৃন্দ , অধ্যাপক জ্যোতিষ মজুমদার, আমি নিজে ও জনাব নজরুল ইসলাম উনার সাথে সাক্ষাৎ করে ৪% কর্তন বাতিলের দাবি জানাই। উনি বললেন, এটা করতেই হবে, না হলে বছর বছর সরকার এত টাকা কোথা থেকে দিবে?
ইতোমধ্যে ফোরাম ৪% কর্তন বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন,  মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। আগামীতে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে।
শুধু শিক্ষকদের দাবি দাওয়া ই নয় বরং যখনই শিক্ষকরা কোন সমস্যায় পড়ে , শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা হয় , তখনই সর্বপ্রথম নির্যাতিত শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ায় একমাত্র ফোরাম। সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ , কুমিল্লা সহ দেশের যেকোনো জায়গায় শিক্ষকরা নির্যাতিত হওয়ার পর একমাত্র বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম ই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম শুরু থেকেই বেসরকারি শিক্ষকদের দুর্দশা লাঘবে জাতীয়করণের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বৈশ্বিক  মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে  বর্তমানে সংগঠনটি ভার্চুয়াল ভাবে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং করোনা পরবর্তী সময়ে সমমনা শিক্ষক সংগঠনগুলোর সাথে লিঁয়াজো করে চলতি মুজিব বর্ষে জাতীয়করণের দাবিতে তুমুল আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন শিক্ষকরা লাভ করবে জাতীয়করণের লাল সূর্য  । জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত ফোরামের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তাই সারাদেশের শিক্ষক সমাজকে ফোরামের পাশে থাকার জন্য অনুরোধ করছি।
লেখক
 এম.এ.মতিন
যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম
কেন্দ্রীয় কমিটি।

Categories