ফাইল গুনে গুনে ঘুস, বরগুনা পাসপোর্ট অফিস।

প্রকাশিত: ৯:১৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০২১
জহিরুল হক, বরগুনা:

ফাইল গুনে গুনে ঘুস, বরগুনা পাসপোর্ট অফিস।

অফিসে আবেদন জমা পড়লেই টাকার গন্ধ খোঁজেন একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ পাসপোর্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা ঘুসের টাকা নেন ফাইল গুনে গুনে। দালালচক্রের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়ে এরা গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট। যাদের হাতে অবৈধ আয়ের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।
কেউ কেউ রাতারাতি অর্থসম্পদে আঙুল ফুলে হয়েছেন কলাগাছ। তাদের আছে চেয়ারে টিকে থাকার শক্ত প্রটেকশন। যে কারণে দু-একজন সৎ কর্মকর্তা থাকলেও তারা পাসপোর্টকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারছেন না। ফলে দুর্নীতিবাজ চক্রের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হতে পারছে না পাসপোর্ট সেবা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রতিবেদকের নিকট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা পাসপোর্ট অফিসে অভিযান পরিচালনা করব না। এভাবে দালাল ধরে কোনো লাভ হবে না। আগে পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের ঘুস নেওয়া বন্ধ করতে হবে। ভেতরে ঘুস নেওয়া অব্যাহত থাকলে বাইরে থেকে দালাল ধরে কী হবে? জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার শুরু করবে।’ তিনি বলেন, ‘ভেতরে মধু খাওয়ার সুযোগ থাকলে তো বাইরে থেকে মধু পাঠানো বন্ধ হবে না।’
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিনই দালালের মাধ্যমে ঘুসের ফাইল জমা নেওয়া হয়। ঘুস ছাড়া কোন ফাইল গেলে সাধারণত বেলা ১টার পরে জমা নেওয়া হয়না বলে সাধারণ মানুষকে ফেরত পাঠান বরগুনা পাসপোর্ট অফিসের আনছার বাহিনী। কিন্তু দেখা যায় ঘুষ দিলে ফাইল নিয়ে সরাসরি পাসপোর্ট অফিসের দ্বিতীয় তলার ২০৪নং কক্ষে গেলেই ফাইল জমা করে ছবি, ফিঙ্গার, স্বাক্ষর নিয়ে আবেদন সম্পান্ন করা হয়। এ কার্যক্রম বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলমান রাখে বরগুনা পাসপোর্ট অফিস। দালালের কাছ থেকে আদায় করা ঘুসের টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হয় রাত গভীর হলে। এজন্য অফিস সময়ের পরও কর্মকর্তাদের অনেকে অফিসেই বসে থাকেন।
স্থানীয় সূত্র বলছে, বরগুনা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন ৩০-৫০টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে বেশির ভাগ আবেদন জমা হয় ‘ঘুস চ্যানেলে’। আবেদনপ্রতি ন্যূনতম ঘুস নেওয়া হয় ২ হাজার টাকা। এ হিসাবে দৈনিক ঘুসের পরিমাণ দাঁড়ায় নিদেনপক্ষে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। মাসে আসে প্রায় ১৮-৩০ লাখ টাকা।
ঘুস না দিলে পদে পদে হয়রানি আর চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। নানাবিধ উদ্যোগ সত্ত্বেও পাসপোর্ট সেবা অনেকটাই যেন আটকে গেছে দুর্নীতির দুষ্টচক্রে। পাসপোর্ট অফিসের ঘাটে ঘাটে ঘুসের রেট বাঁধা। নতুন পাসপোর্ট ইস্যু বা নবায়ন ছাড়াও বিদেশি নাগরিকদের ভিসা সংক্রান্ত কাজেও বড় অঙ্কের ঘুস দিতে হয়। টাকা না দিলে হয়রানির শেষ নেই। বিশেষ করে বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ভিসা নবায়ন, নো ভিসা ইত্যাদি কাজে বিভিন্ন রেটে ঘুস আদায় করা হয়। বিষয়টি অনেকটাই ওপেন সিক্রেট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কম্পিউটার ব্যবসায়ী বলেন, পাসপোর্টের আবেদন ফর্ম বর্তমানে অনলাইনে পূরণ করতে হয়। ফর্ম পূরণ করার পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা জমা নেয়। টাকা জমা দিয়ে ঘুস না দিয়ে কেউ অফিসে গেলে পরতে হয় ভোগান্তিতে। বাবা মায়ের আইডি কার্ডের সাথে আবেদনকারীর আইডি কার্ডে ‘া’ ‘’ি অথবা ‘ধ’ তে ‘ব’ অথবা ‘র’ মিল না থাকলেই চরম ভোগান্তিতে পরতে হয় আবেদনকারীকে। সবকিছু মিল থাকলেও সর্বশেষ ফর্মে টাকা জমা দেওয়ার তথ্য পূরণ করতে হবে বলে ফেরত পাঠায়। কিন্তু অনলাইনে আবেদন করতে টাকা জমার তথ্য পূরণের কোন অপশন নেই। ফর্ম ডাউনলোড করলে পিডিএফ ফাইলের তৃতীয় পৃষ্ঠায় টাকা জমা দেওয়ার তথ্য চাহিত ছক থাকে। এভাবে নানা কারণ দেখিয়ে আবেদনকারীকে হয়রানী করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তার আবেদন ফর্ম জমা নিলেও পরতে হয় ভিন্ন ঝামেলায়। আবেদন ফর্ম জমা রেখে ফেলে রাখা হয়। কোন কার্যক্রম করা হয় না। পাসপোর্টে বেশ কয়েকটি তথ্য সংশোধনের ওপর কড়াকড়ির কারণে ব্যাপক ঘুস বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নাম, পিতা-মাতার নাম এবং জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব বিষয়ে ঘুসের রেট খুবই চড়া। তবে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এ ধরনের পাসপোর্ট করে নিতে অনেকে দালালদের কাছে ধরনা দেন। নাম অথবা জন্মতারিখ সংশোধনে মোটা অঙ্কের ঘুস নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে ভিন্ন তথ্য, খুব সুক্ষ প্রতিটি আবেদনে ভিন্ন ভিন্ন চিহ্ন দিয়ে প্রেরণ করলেই কোন ঝামেলা ছাড়াই আবেদন জমা হয়। আর চিহ্ন পেতে দিতে হয় ঘুষে টাকা। ঘুষের টাকা না দিলে চিহ্ন পাওয়া যায় না। আর চিহ্ন ছাড়া ফাইল জমা হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। চিহ্ন সম্পর্কে অবগত আছেন অফিসের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন- তাদের সকল কাগজপত্র সঠিক থাকার পরেও পরতে হয়েছে ভিন্ন ভোগান্তিতে। আবেদন ফর্মে কেন টাকা জমা দেওয়ার তথ্য পূরণ করা হয়নি? প্রশ্ন করে বের করে দেয় অফিস কর্তৃপক্ষ। অথচ দেখা গেছে অনলাইনে আবেদনফর্ম পূরণ করতে হলে টাকা জমার অপশনটি অফলাইন রাখা হয়েছে। সেহেতু টাকা জমা দেওয়ার তথ্য আবেদন ফর্মে উল্লেখ করার কোন সুযোগ নেই। বেশিরভাগ সময়ই উক্ত অফিসের আর আই মোঃ ইকবাল হোসেনের নাম শুনতে পাওয়া যায় আবেদনকারী ও দালাদের মুখে।
এছাড়া পুরোনো এমআরপি (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট) নবায়নের আবেদন নেয় না বরগুনা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুখ খুলতে নারাজ অফিসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এ বিষয়ে বরগুনা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোঃ আইয়ুব আলীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি।
জহিরুল হক
বরগুনা জেলা প্রতিনিধি
০১৭৬৪৪৪০৪৪৪

Categories