প্রভাষক খেকো জনবল কাঠামো -২০১৮।

প্রকাশিত: ৪:২১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২০


প্রভাষক মো. অাবদুল মান্নান::
২০১০ সালের জনবল কাঠামো প্রণীত হওয়ার পূর্বে এন্ট্রি লেভেলে প্রভাষকদের চাকরি  দুই বছর হলে তাদের স্কেল পরিবর্তন হত। অর্থাৎ ৯ গ্রেড থেকে ৮ম গ্রেডে উন্নীত হত।  ২০১০ ও ২০১৩ সালের সংশোধিত জনবল কাঠামোতে ২ বছর পরের ৮ম গ্রেড প্রাপ্তির বিধান রহিত করা হয়। অনুপাত প্রথার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে  যে সমস্ত প্রভাষক “সহকারি অধ্যাপক “পদে পদোন্নতি বঞ্চিত  হবেন তাদের ৮ বছর পর সরাসরি ৭ম গ্রেড উন্নীত করার বিধান সংযুক্ত করা হয়। ক্ষতিগ্রস্থ প্রভাষক যেন নূন্যতম আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। 

১)_অন্যদিকে  ১৯৯৫ এর জনবল কাঠামোকে  শিক্ষক স্বার্থ বিধংসী জনবল কাঠামো বলা হয়। উক্ত জনবল কাঠামোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেশ সংখ্যক পদের বিলোপ সাধন করা হয়। বেসরকারি কলেজ ও মাদ্রাসার প্রভাষকদের  ৫:২ অভিশপ্ত প্রথা আরোপ করে তাদের পদোন্নতি চিরস্থায়ী বন্ধের বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়!

সেই শিক্ষক বিদ্বেষী জনবল কাঠামোর বিধান ছিল প্রভাষকগণ চাকরির ৮ বছর পূর্তিতে ৫:২ অনুপাতে ৬ষ্ঠ  গ্রেডে উন্নীত হবে। যারা ৬ষ্ঠ গ্রেডে উন্নীত হতে পারবেনা তারা ৮ বছরের পূর্তিতে ৭ম গ্রেডে উন্নীত হয়ে সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে গণ্য হবেন। আর প্রত্যেক প্রভাষক গণ চাকরির ২বছর পূর্তিতে ৮ম গ্রেডের বেতন ভোগ করতে পারবেন।

২০১০ ও ২০১৩ ইংরেজি সালের সংশোধীত জনবল কাঠামোতে প্রভাষকদের ২ বছর পূর্তির পর ৮ম গ্রেডের বেতন ভোগের বিধান টি রহিত করে! ফলে শিক্ষকের আর্থিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার সূ-ব্যবস্থা করা হয়! 

তবে ৮ বছর পূর্তিতে ৫:২ অনুপাতে যারা ৬ষ্ঠ গ্রেড পাবে না তাদের জন্য ৭ম গ্রেড প্রাপ্তির বিধান বহাল রাখা হয়। যুক্তিতে হিসেবে শিক্ষকদের পূর্তিতে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করার জন্য ৮ বছর পর সবাই ৭ম গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। আর ৮ম গ্রেড বাতিল করা হয়।

২)_;২০১৮ সালের আলোচিত-সমালোচিত জনবল কাঠামো তে পূর্বের সমালোচিত সকল অন্যায়কে চুড়ান্ত রূপে রূপায়িত করা হয়! যে সমস্ত প্রভাষকগণ ৫:২ অভিশপ্ত অনুপাতের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে ৮ বছরে ৬ষ্ঠ গ্রেডে উন্নীত হয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পাবে না তারা চাকরির ১০ বছর পর ৮ম গ্রেডে ১৬ বছর পর ৭ম গ্রেডে উন্নীত হতে পারবেন! 

অর্থাৎ পূর্বেকার ২ বছর পূর্তির স্কেল ১০ বছরে ৮ বছর পূর্তির স্কেল ১৬ বছরে ভোগ করবে! কি আজব নীতিমালা! শিক্ষকদের ঠকানোর ব্যবস্থা!

৩)_বলা বাহুল্য, ১৯৯৫ ও ২০১৩ সালের সংশোধীত জনবল কাঠামোর বিধান অনুযায়ী,অনুপাত প্রথার কারণে যে  প্রভাষকগণ ৮ বছরে “সহকারী অধ্যাপক” পদে পদোন্নতি বঞ্চিত হবেন তারা সরাসরি ৭ম গ্রেডে  উন্নীত হবেন। তবে সর্বশেষ ২০১৮ সালের বিতর্কিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী সেই ৭ম গ্রেড স্কেলের জন্য পদোন্নতি বঞ্চিত প্রভাষককে  ১৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে! 

কেউ অনুপাত প্রথার আর্শীবাদ প্রাপ্ত হয়ে জেষ্ঠতার ভিত্তিতে ৮ বছরে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ৬ষ্ঠ গ্রেড পাবেন। আর অবশিষ্ট তরুণ মেধাবী প্রভাষক অনুপাত প্রথায় পিষ্ট হয়ে পদোন্নতি বঞ্চিত হবেন। আরো দুই বছর পর চাকরির বয়স দশ বছর পূর্ণ হলে  ৮ম গ্রেড প্রাপ্তির যোগ্যতা অর্জন করবেন! ১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী সেই ৮ম গ্রেড এমপিওভুক্তির দুই বছর পূর্তিতে প্রভাষকরা লাভ করতেন।আর এখন ৮ম গ্রেড পাবেন ১০ বছর পর! চাকরি জীবনে ১০ বছর পর বেতন বাড়বে এক তরুণ ও মেধাবী প্রভাষকের ১০০০=টাকা! কারণ ৯বম ও ৮ম গ্রেডের পার্থক্য এক হাজার টাকা! এই বিধান পরিকল্পিত ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকদের অপমানিত করার চুড়ান্ত আয়োজন।

৪)_যেখানে শিক্ষকরা দীর্ঘ দিন যাবৎ দাবি করছে আসছে যে, অভিশপ্ত অনুপাত প্রথার বিলোপ সাধন করে পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী , সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পদ্ধতি চালু করার। পদোন্নতি ব্যবস্থা চালু হলে  শিক্ষক গণ আর্থিকভাবে সুবিধা-সুবিধা লাভের পাশাপাশি পদোন্নতির জন্য গবেষণায় লিপ্ত হতো। ফলে দেশে যোগ্য শিক্ষক গড়ে উঠত। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হত। 

অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেই পথে না হেঁটে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ- সুবিধা বন্ধ করার যাবতীয় বন্দোবস্তের আয়োজন করে এই জনবল কাঠামোর মাধ্যমে। যে সমালোচিত জনবল কাঠামোর(১৯৯৫) অধীনে পদোন্নতি না পেলে ও ৮ বছর চাকরি শেষে ৭ম গ্রেডের স্কেল ভোগের বিধান ছিল; সেই ৭ম গ্রেডের স্কেল পেতে এখন অর্থাৎ২০১৮ সালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী  প্রভাষকদের ১৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে!!

৫)_ উক্ত জনবল কাঠামোতে(২০১৮ জনবল কাঠামো) প্রভাষকদের আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ করার পাশাপাশি উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ লাভের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। ফলে কোন প্রভাষক বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য বিবেচিত হবেনা। অন্যদিকে তারা আবার অনুপাত প্রথার কারণে সহকারি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি ও লাভ করতে পারবেনা। বর্তমান জনবল কাঠামোতে প্রভাষকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তাই এটিকে প্রভাষক খেকো জনবল কাঠামো আখ্যায়িত করা অত্যুক্তি হবে না।

৬)_মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজের এক  বাজেট বক্তব্যে বলছিলেন, দেশে যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে শিক্ষক আমদানি করে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এই উপলব্ধি কে সাধুবাদ জানাচ্ছি। তবে দেশের শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা সংকুচিত করা হলে।তাদের  পদোন্নতির ব্যবস্থা না থাকলে। দফায় দফায় কালো আইন ও প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষকদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে কিভাবে এই দেশে যোগ্য শিক্ষক গড়ে উঠবে?

যে দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দফায় দফায় শিক্ষকদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য কালো নীতিমালা জারি করে! সারা জীবন শিক্ষকতা করেও পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে চরম ব্যর্থতার স্বাক্ষর রাখে! মন্দাত আমলের অনুপাত প্রথা দিয়ে নতুন ও মেধাবী শিক্ষকদের পদোন্নতি গলা টিপে হত্যা করে! অর্থ সংকটের খোঁড়া অজুহাত তুলে শিক্ষকদের মূল বেতন কমিয়ে ৯০% করে ফেলে! ২৫% ঈদ বোনাস দেয়! এক হাজার টাকা বাড়ি-ভাড়া ও পাঁচ শত টাকা চিকিত্সা ভাতা দেয়! নামমাত্র ৫% ইনক্রিমেন্ট দিয়ে ৪% কেটে নেয়! সেখানে আবার কিসের যোগ্য শিক্ষক !!??

যে সমস্ত মেধাবিরা না বুঝে- ভুলক্রমে এই পেশায় জড়িয়ে পড়েছে তারা এ সমস্ত কালো আইনে বন্ধী হয়ে যখন উন্নতির সকল পথ বন্ধ দেখবে। তখন আফসোস করতে করতে নিজের মেধাশক্তি নষ্ট করে ফেলবে!

৭)_মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের নিকট এই অধমের আবেদন, দেশে যোগ্য শিক্ষক গড়ে তুলতে কিছু সুপারিশ হল। আপনি দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান(স্কুল-কলেজও মাদ্রাসা) কে জাতীয়করণের ঘোষণা দিন। শিক্ষা জাতীয়করণ বিরোধী অপশক্তির “মায়াবী চাপে” এই মূহুর্তে সেটি বাস্তবায়ন যদি সম্ভব না হয়। 

তখন, (১) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় সরকারি কোষাগারে জমা রাখার সুপারিশ বাস্তবায়ন (২)পরীক্ষার মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষকদের পদোন্নতির ব্যবস্থা গ্রহন।(৩) যোগ্য শিক্ষকদের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ ।(৪)বদলির প্রথা ।(৫)সম্মানজনক বাড়ি-ভাড়া ও চিকিত্সা ভাতাও শতভাগ বোনাস ।(৬)অতিরিক্ত ৪% কর্তন প্রজ্ঞাপন বাতিল(৭) সকল শিক্ষকদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক।(৮)শিক্ষানীতির সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূরীভূত করণ।(৯) এককালীন পেনশনের পরিবর্তে স্থায়ী পেনশনের ব্যবস্থা গ্রহন।(১০) অভিশপ্ত কমিটি প্রথা থেকে শিক্ষকদের মুক্তি ব্যবস্থা গ্রহন।(১১) শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে মুক্তি দান(১২) শিক্ষা ভাতা প্রদানের উদ্দ্যেগ,অবশ্যই গ্রহন করতে হবে।

সর্বোপরি দেশের শিক্ষা প্রশাসন কে দুর্নীতির উর্ধে রাখা।দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ  বিভিন্ন অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ড থেকে বিতাড়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে অনিয়ম ও দুর্নীতি চলমান থাকলে , শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে যোগ্য শিক্ষক গড়ে তোলার কোন উদ্যোগ আলোর মুখ দেখবেনা।

লেখক: আবদুল মান্নান  {বিএ(সম্মান)এম এ,এল এল বি