নীরবে কাঁদছে বেসরকারি শিক্ষক।

প্রকাশিত: ১০:৩১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০২২

নীরবে কাঁদছে বেসরকারি শিক্ষক।

নীরবে নিভৃতে কাঁদছ দেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। এ কান্না যেন দেখার মত কেউ নেই। নেই কোন বুঝার মত অভিভাবক।  তাদের বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না। লোকলজ্জা ও সামাজিক মান মর্যাদার ভয়ে বুকফাটা কান্না নীরবে বয়ে বেরাচ্ছে তারা।
প্রায় দুই যুগ ধরে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছি। শিক্ষক সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার সুবাদে শিক্ষক মহলে বেশ বিচরণ আমার। শিক্ষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। যারা একটা দেশের মেরুদণ্ড, যারা জাতি গড়ার কারিগর তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা যে কত শোচনীয় তা ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়।
অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করে প্রায় বিসিএস লেবেলের পরীক্ষার মত নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর তীব্র প্রতিযোগিতা পূর্ণ নিযোগ কার্যক্রম অতিক্রম করে একজন প্রার্থী সহকারী শিক্ষক হিসেবে ১২৫০০ টাকা বেতন স্কেলে নিয়োগ পান। এ সামান্য টাকায় মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তাদের নিয়ে একটি সংসার পরিচালনা করা দুর্মূল্যের এ বাজারে কতটা যে কঠিন তা একমাত্র ঐ শিক্ষকই জানেন। রোগ ব্যাধি বর্তমানে আমাদের নিত্য সঙ্গী। ডাক্তাররা তো রীতিমতো কশাই। যে কোন রোগ নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেই ১০ হাজার টাকার কমে আসা যায় না। বাড়িতে মেহমান আসলে যেন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ে তার। সামাজিকতা রক্ষা করে তাদেরকে বিদায় করা শুধু কঠিনই না বরং একেবারেই  অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখন ঈদ-চাঁন আসে তখন মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা হয় তাদের। আপনজনদের একটু নতুন পোশাক দিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার তাওফিক অনেকেরই হয় না। ১২ শত টাকা কেজি দরের ইলিশ মাছ আর ৭ শত টাকা দরের গরুর গোশত কিনে খাওয়ার মত সাহস অনেক শিক্ষকেরই নাই। আমার কাছের একজন শিক্ষক একদিন বলতেছিলেন স্যার, এ তিন বছরে এক কেজি গরুর গোশত কিনি নাই। আর খাশির গোশত তো স্বপ্নেও দেখি নাই। তবে গোশত খেয়েছি ঈদে -কোরবানীতে, আর খেয়েছি দাওয়াতে।
আমাদের দেশের একজন দিনমজুরের কথা যদি চিন্তা করুন, দেখেন তার দৈনিক হাজিরা ৭ শত টাকা। মাসে দাড়ায় ২১ হাজার টাকা। অথচ একজন শিক্ষক সর্ব সাকুল্যে ১৫ হাজার টাকাও পান না। যে দেশের শিক্ষক একজন সামান্য একজন  দিনমজুরের চেয়েও কম বেতন পান সে শিক্ষক দ্বারা উন্নত জাতি গড়ার দায়িত্ব পালন করানো কতটা সম্ভব ?
গ্রাম্য প্রবাদ আছে- পেটে দিলে পিঠে সয়, যেমন পাতে তেমন ক্ষেতে। আপনি পেটে না দিয়ে যদি পীঠে বোঝা  চাপিয়ে দেন তাহলে এ বোঝার ভার সে সইবে কেমনে? আগে তার পাতে দেন, সে ঠিকই আপনার ক্ষেতে এর ফল দিবে।
২০২৩ সাল থেকে চালু হতে যাচ্ছে নতুন কারিকুলাম। এর সফল বাস্তবায়নের দায়িত্বটা শিক্ষকদেরই। কিন্তু শিক্ষককে অভুক্ত রেখে কঠিন একটা দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে ক্ষুধার্ত শিক্ষক তা বাস্তবায়নে কতটুকু সফল হবেন তা সময়ই বলে দিবে।
বেসরকারি শিক্ষকরা এক সময় অনেক অবহেলিত ছিল। সে অবস্থা থেকে বর্তমান সরকার টেনে অনেক দূর নিয়ে এসেছে। শিক্ষকরা বর্তমানে স্কেলের শতভাগ বেতন পান। ২৫% হারে দুটি উৎসব ভাতাও পান। ২০% হারে বৈশাখী ভাতা পান। ৫% হারে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টও পান।  কিন্তু বর্তমান বাজারে এ বেতন ভাতায় টিকে থাকা কঠিন। তাই শিক্ষকের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তাদের চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে। দূর করতে হবে তাদের নীরব কান্না।  তাহলেই তাদের দ্বারা সম্ভব হবে একটি উন্নত জাতি গড়া।
লেখক – মুহাম্মদ জসিম উদ্দীন,প্রভাষক,
জিরাইল আজিজিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল।

Categories