নীতিমালা সংশোধন কমিটির মুল আকর্ষন হোক বদলি

প্রকাশিত: ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০
 শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন একটি দেশের শিক্ষার সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনা, আলোচনা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড আর শিক্ষক শিক্ষার মেরুদন্ড। ” শিক্ষা আইন ” প্রণয়নের এই সিদ্ধান্তকে মুজিববর্ষে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে মনে করি। বিভিন্ন সময় শিক্ষা নীতিমালা বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি ব্যবস্থা প্রণয়নের কথা বলা থাকলেও আজও প্রণয়ন হয়নি। একটি নীতিমালা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা হয়। ১৯৯৫ সাল থেকে পরবর্তী একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেই নীতিমালা বলবৎ। ২০০০-২০১০,২০১৮ সহ প্রত্যেকটি নীতিমালায় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পরে আবার পরিবর্তন হয়।
নীতিমালার প্রত্যেকটি অংশ আলোচনা-পর্যালোচনা প্রণয়ন ও পরিবর্তন হয়ে থাকলেও বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ও সেই বিষয়টা  আজও পর্যন্ত সে বদলি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি।সরকার প্রয়োজন মনে করেনি। নীতিমালার মেয়াদ পার হয়ে যায় নতুন নীতিমালা আবার হয় কিন্তু নীতিমালাগুলোর  বদলির অনুচ্ছেদ অংশটুকু অপরিবর্তিত রাখা এবং বদলি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন না করা খুবই দুঃখজনক।তাই শিক্ষা আইনে বদলি বিষয়টি নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট বিধি ও নির্দেশনা প্রদানের জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ আজীবন স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা বিভাগের আর কোন উন্নয়ন মাধ্যম হতে পারে না। সাড়ে পাচ লক্ষ শিক্ষক কর্মচারী, কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী, লক্ষ লক্ষ অভিভাবক তথা আপামর বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও সুফল নিহিত রয়েছে। মুজিবর্ষে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন শিক্ষা সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নিশ্চিত করতে বদলি ব্যবস্থা চালু অপরিহার্য।
বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ অনুসারে ২৩ অনুচ্ছেদের ৩ ধারা মতে “সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রয়োজনবোধে নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করতে পারবেন।”
 বেসরকারি মাদ্রাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ এর ১২ নং অনুচ্ছেদের (খ) ধারা মতে “সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রয়োজনবোধে নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করতে পারবেন”।
 বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান( স্কুল কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ এর ১২ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে “সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রয়োজনবোধে নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করতে পারবেন পরবর্তীতে অভিজ্ঞতা গণনার ক্ষেত্রে চাকরির বিরতিকাল বাদ যাবে।”
বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ ভাগ শিক্ষা বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের মাধ্যমে হলেও শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন কিংবা বদলির কোন সুযোগ নেই।  দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষকরা দেশের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানে পাঠদান করে যাচ্ছেন। দেশের শিক্ষা বিষয়ক একমাত্র পত্রিকা সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারলাম এমপিও ” শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন” দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়ন, বৈষম্য দূরীকরণ ও শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে  উক্ত শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন  সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তন করে থাকবেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। আশা করছি যৌক্তিক ও মানসম্মত একটি  নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করবেন।
শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন – দ্রুত মন্ত্রীসভা  উঠতে যাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা এ আইন প্রনয়নের মাধ্যমে তাদের দৈন্যতা, সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্য এর অবসানের দরজা খুলবে। এমপিও নীতিমালা ১৯৯৫  থেকে এমপিও নীতিমালা ২০০৫, ২০১০ ও ২০১৮ এর বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও ধারায় এমপিওভুক্ত  শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থার নির্দেশনা থাকলেও আজও পর্যন্ত বদলি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক।
সীমাহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রোধে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা চালু একান্ত জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ নিম্নগামীর পরিবর্তে ঊর্ধ্বগামী করতে, বিশ্ব মানের শিক্ষা অর্জন করতে বদলি ব্যবস্থা চালুর বিকল্প নেই। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারলাম সরকার ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তথা মুজিববর্ষ  থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় বদলি ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের গণবিজ্ঞপ্তি  থেকে অনলাইনে সফটওয়্যার মাধ্যমে বদলি পদ্ধতি চালু করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা আইন  সংশোধন ও পর্যালোচনা কমিটির প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি। । বদলি ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষকদের মধ্যে গতিশীলতা আসবে, দক্ষতা সম্প্রসারিত হবে নতুন পরিবেশে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন শিক্ষক পেয়ে আনন্দ-উল্লাসের সাথে সুন্দর ও উপভোগ্য পরিবেশ
পরিবেশ সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় একই প্রতিষ্ঠানে অবস্থানের ফলে শিক্ষকদের একঘেয়েমি দূর হবে। শিক্ষকরা স্থানীয় পলিটিক্সে জড়াতে পারবে না এনং শিক্ষকদের এসিআর বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা চালু হলে  শিক্ষকদের প্রাইভেট – কোচিং, গাইড ও নোটবাণিজ্য  বন্ধ হবে। শিক্ষকরা দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করার ফলে শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট দূর হবে যার ফলে শিক্ষার মান বাড়বে। অন্যদিকে শিক্ষকদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ ; নীতি বহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতি, বহিষ্কার ও ম্যানেজিং কমিটির নির্যাতন কমবে। যার ফলে ভাল শিক্ষকের কদর বাড়বে, মেধাবী প্রার্থীদের শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং শিক্ষকতায় ভাল শিক্ষক আসবে।ভাল মন্দ শিক্ষক বদলির মাধ্যমে দেশের সকল প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার সকল স্তরে  শিক্ষার মান সমন্বয় করা সম্ভব হবে। দেশের সব প্রতিষ্ঠানের মান প্রায় সমান হবে। অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করার লক্ষ্যে  শিক্ষকদের শাস্তিমূলক বদলি করা সহজ হবে এবং শিক্ষকদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদান বিষয়ক আলোচনার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে, মেধা বিকাশ নিশ্চিত হবে। বদলি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সকল স্তরের শিক্ষকদের চাকরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
২০২০ খ্রিষ্টাব্দের মুজিববর্ষ থেকে  এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অনলাইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বদলি ব্যবস্থা চালুর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, চেয়ারম্যান, শিক্ষা আইন প্রনেতা ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাদের প্রতি আমাদের বিনীত আবেদন। মন্ত্রীসভায় বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি বাস্তবায়নের নীতি ও সিদ্ধান্ত হোক মুজিববর্ষের উপহার। মুজিববর্ষকে আজীবন লালিত ও স্মরণীয় করে রাখার একমাত্র উপায় বদলির সিদ্ধান্ত।
লেখক: মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, প্রভাষক ইংরেজি, সমষপুর বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ ও সদস্য-সচিব, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি বাস্তবায়ন কমিটি       ।