“নির্বাচিত কবিতা ও এই প্রজন্মের লেখকদের অনুকরণীয় ও চর্চার আধুনিক একটি খোরাকের নাম..কবি ওমর কায়সার”। নাসিমা হক মুক্তা

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০
( ওমর কায়সার- একান্ত অনুভূতি প্রকাশ থেকে-  “নাসিমা হক মুক্তা”)
কবিতা শুধু প্রেম, প্রেমিক বা প্রেমিকার পৃষ্ঠপোষকতার গুণগানের শুধুই প্রতিশ্রুতির অংশ নয়।কবিতা সামগ্রিক জীবনবোধের গভীরতম অনুধাবন বা প্রকাশের পার্থিব চিন্তার কাব্যিক অংশ। কবি ওমর কায়সারের কাব্য প্রতিভার পোক্ততা এই প্রজন্মের লেখকদের অনুকরণীয় ও চর্চার আধুনিক একটি খোরাক। তাঁর কবিতা কল্পলোক পাঠককে আবদ্ধ না রেখে নিয়ে গেছেন – প্রেম, দেশ, কাল, সময়, প্রকৃতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ও সমাজের অনাচার – দৈন্যতার সামগ্রিক কাব্যিক সত্তাতে । কবি তাঁর কবিতা রচনায় শব্দের নন্দনতত্ত্ব, শব্দের নিপুণ সৌন্দর্য , ছন্দের কলাকৌশল, শব্দের বাচনশৈলী দেবদেবী পূজনীয় সখ্যকে ছাড়িয়ে সাহিত্যগুণ ও সাহিত্য শিল্প কে উপস্থাপন করেছেন নিজস্ব স্বকীয়তায়। কবি শুধু লেখক তা নয় একজন ভাল পাঠকও। তিনি পাঠ করেছেন অসংখ্য বিশ্ব- সাহিত্য। ব্যক্তিগত ভাবে কবিকে আমি দূর থেকে দেখলেও কখনো কাছে যাওয়ার সুয়োগ হয় বা কাছে গেলেও কথা বলার সুয়োগ ও সাহস দুটো আমার ছিল না। তবুও উনাকে পাঠ করে নিজেকে যতটুকু সমৃদ্ধ করতে পেরেছি ততটুকুই ধরে তুললাম। একান্ত অনুভূতি প্রকাশ থেকে….
কবি কতটুকু জীবনদর্শন অনুভব ও মগ্ন হলে এমন সত্য উচ্চারণ করতে পারেন। ” মগ্ন জাতিস্বর “ কবিতায় প্রাচীন সভ্যতা থেকে নারী যে ভোগবিলাসে সামগ্রী ছিলো তাই তিনি বলতে চেয়েছেন। নারী কখনো সেই যুগ থেকে সোজা পথে হাঁটতে পারিনি। উচুনিচু ঢালু পথ বেয়ে দস্যুর সোহাগমাখা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যা হলে ঘরের আলো নিভিয়ে বারংবার পাখির সুরে মুক্তির গান গেয়েছেন। তিনি এই কবিতায় নারীতে লালায়িত ও সন্তানদানের চাষবাসের অন্ধকার গুহা থেকে মুক্তির আশা প্রত্যাশা করে যৌবন ও অযৌবনের মত্ততা থেকে মগ্ন জাতিস্বরের চেতনাকে জাগাতে চেয়েছেন। কবির একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে এই কবিতাটির জাত বিচার করা শূন্য মেধায় আমি হাঁফিয়ে উঠছি। তাই কবির কাছে প্রার্থনা ভিক্ষা মাগছি…..
“মাথা তুলে উঠে এসো মগ্ন জাতিস্বর।
বৈদিক হ্নদয় জুড়ে তোমার প্রশস্ত পথে
আর্যের রমণী আজো হাঁটে
অনন্ত বন্ধুর কাল, দস্যুপরিবেষ্টিত হরপ্পার বিজন প্রদোষ।
( বই : প্রতিমাবিজ্ঞান – মগ্ন জাতিস্বর,
নির্বাচিত কবিতা  পৃঃ ৪৫)
কবি “ঘাম “ কবিতাটিতে মানুষকে এক ফোটা ঘামের সাথে তুলনা করে দার্শনিকত্বের প্রজ্ঞাময় চমৎকার রূপ দিয়েছেন। তবে ঘাম কথাটি জন্মান্তরের লাস্যময় এক অধ্যায় প্রতিটি মানব সমাজের। এখানে একজন নারী ও পুরুষ যে একসূত্রে প্রকৃতিকে গেঁথেছেন তার স্বর্গীয় শক্তির উৎস ক্ষমতাতে বুঝিয়েছেন। নর ও নারী মিলনরেখায় প্রকৃতির মাধ্যমে যে আবেগ অকর্ষিত,  সুখকর অনুভূতি ও অমৃত সুধার আনন্দটুকুর বদৌলতে একটি সন্তান পৃথিবীতে আসে তার স্মৃতি অর্থ্যাৎ বাবা ও মা’য়ের যে কষ্টের সংশয় তা বুঝাতে গিয়ে কবিতায় প্রকাশ করেন… …..
তৃপ্ত নই, তৃপ্তির ফসল।
নরম গিরির পথে নেমে যাব লবণাক্ত জল।
শেষপ্যারা..
দুই পাহাড়ের পথে এই বোধ আরো গাঢ় হয়
স্মৃতিতে সমুদ্র রেখে মনে আসে ঘামের সংশয়।।
(বই : প্রতিমাবিজ্ঞান -ঘাম,
নির্বাচিত কবিতা  পৃঃ ২৭ )
নারীর নগ্ন শরীর দেবতার সৌন্দর্যের প্রতীক তাই সূর্যবংশীয় প্রাচীন যুগের রাজারা তাদের যৌন চাহিদা যখন কাঠফাটা রোদের মত উত্তিজত হয়ে আকাশ কে ডাকত ঠিক তখনি নারী নামক আদিম নেশাটি তাদের কাছে বন্ধক নিত এবং পাগলের মত ঝাঁপিয়ে পড়ত চুলার আগুনে। তাই সূর্যবংশীয় রাজা চির লোভাতুর ইচ্ছাটির কথা কবি এই ভাবে প্রকাশ করেন….
খরায় চৌচির মৃত্তিকা হলো
কালের রুপালি ডিম।
তারপর ছেঁড়া তমসুক
ছিন্নভিন্ন হয়ে ঝরে পড়ল হাঁড়িহীন গনগনে চুল্লির ওপর।
(বই : প্রতিমাবিজ্ঞানঅগ্নিকান্ড
নির্বাচিত কবিতা  পৃঃ ৩৩)
          ওমর কায়সার
ওমর কায়সার বিশ্বাস করেন, মানুষের সাথে প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। তাঁর বই
“প্রতিমাবিজ্ঞান” কবিতা শিরোনাম নদী ও অর্চনার সম্পর্ক বিষয়ক কবিতায় তাই ফুটে উঠেছে। নদী ও নারী প্রকৃতির একই ধারায় প্রবাহিত হলেও কবির লিখিত কবিতায় নদী ও অর্চনা দুজন দুটি ধারা। নদী যেমন নীরবে বয়ে চলে, ঠিক তেমনি নারীও ক্ষয়ে ক্ষয়ে নীরবে সয়ে জীবন চালায়। তবে কবির মতে, নদী আনন্দে বান আনে আর অর্চনা বিক্ষুদ্ধ হলে পোড়ে পোড়ে অঙ্গার হয়। রহস্যময় জীবনের একাংশ নারীও বটে।
তাই কবি তাঁর কবিতায় বলেন….   (“বিক্ষুব্ধ হলে নদী, জনপদ ভেঙ্গে তার বিস্তৃত পরিধি ; অর্চনা বিক্ষুব্ধ হলে শুধুই পোড়ায়।   নদী ও অর্চনার সম্পর্ক বিষয়ক পৃঃ৫১)
একজন নারীর সৌন্দর্যের ধারক ও বাহক তার সন্তান – সন্ততিরা। প্রতিটি নারীই এসব সুন্দরকে ভালবেসে ও লালন করে জীবন অতিবাহিত করে। ঠিক কবি ওমর কায়সারের কাব্যগ্রন্থ “প্রতিমাবিজ্ঞান” বইটির “শিউলি পাপড়িরা” পৃ/৫৮ কবিতায় তেমনি একটি ধারণ করা জীবনের ছন্দপতন কে সাফল্যের চূড়া থেকে বৃক্ষের ছায়া থেকে বঞ্চিত ভয়ংকর এক লিপিকা। শিউলির সন্তানগুলো এই বিভোর জীবন থেকে সরে গিয়ে অন্যত্র বসবাস করছে। শিউলির জীবন বিছানায় আলোহীন লেপটে থাকা দিনগুলো আকাশের নীলপরীরা ব্যঙ্গ করে হাসে। তাই খুব ভারাক্রান্ত মনে বলেছেন –
মায়ার কন্ঠ নিঃসৃত শিউলির পাপড়িগুলো ছড়িয়ে পড়েছে, সাভান্নার উন্মত্ত সিংহীর গর্জন থেকে…
কবি ওমর কায়সার আবার তাঁর কবিতার বই “বাস্তুসাপও পালিয়ে বেড়ায়” বইয়ে শিরোনাম” এই কবিতায় ” তিনি তাঁর কবিতার অঙ্গ -ভঙ্গি পরিবর্তন করে এসে দাঁড়িয়েছে অনেকটায় ছড়ায়। যদিও ছড়া কবিতার মত দেখাও “এই কবিতায় ” কবিতাটি সম্পূর্ণ একটি প্রেমের কবিতা। কতটুকু বিস্ময়ময় কাব্য জ্ঞান থাকলে এমন উচ্চারণ করতে পারেন। নতুন ও অভাবিত উপমা -রূপকের ব্যবহার করে তাতে কবিতা অন্ত্যমিল ঘটিয়েছেন।এই রকম কবিতা আরও অনেক আছে উনার বইয়ে। যেমন-
এই কবিতায় পঙক্তিতে সব, মেঠোপথের তুচ্ছ ধুলো, মন্দাকিনীর ঊর্মিবমালা, বিন্দু বিন্দু শিশিরগুলো।
( পৃ/৭২ / নির্বাচিত কবিতা)
সৃষ্টি ঐশ্বরিক সত্তাকে অনুধাবন করতে গিয়ে কবি ওমর কায়সার তাঁর কবিতার বই ” বাস্তুসাপও পালিয়ে বেড়ায় “ বইটিতে ” কান্না “ নামক কবিতাটি পাঠ করে আমি নিজেকে সৃষ্টি জগতের রহস্যকে বারবার ভেবেছি। তিনি এই কবিতাটিতে সমুদ্রের ডিম, জন্ম, সৃষ্টি, আকাশ, বৃক্ষ নিয়ে আধ্যাত্মিক উচ্চারণ করেন। এই সব সৃষ্টি মানবের জন্য তবে কবি যেন কোলাজের ভেতরে ডুবে বলেছেন- আকাশ কখনো কাঁদে না তবে জলের শিশুরা ফুটে বের সেটাকে মানুষ কান্না বলে কিন্ত বৃক্ষের জন্ম আছে, তাদের কান্না কখনো মানুষ খুঁজে না। তাই কবিতার অমুক ভাবে বলেছেন –
মূলত আকাশ কখনো কাঁদে না, জন্ম আর সৃষ্টির আদি ও চিরন্তন বেদনার বোধ থেকেই, আকাশের কান্না।
কিন্তু বৃক্ষেরও তো জন্ম পরস্পরা আছে, সৃষ্টির উত্তরাধিকার আছে – তাদের বেদনা নেই।
লেখক ওমর কায়সার শুধু শহরকেন্দ্রিক তা নয়। উনি গ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গিয়ে তাঁর বন্ধু বা তাঁর প্রিয় লেখকদের কবিতা লিখতে খুব উদার ও দরদী সত্তার পরিচয় দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে আছেন – যেমন কবি জ্যোতির্ময় নন্দী / যে কবিতা জন্ম নেবে কাল, এটি তার প্রসব বেদনা।
(কবিতার জন্মের আগে / পৃ/৯৬/ নির্বাচিত কবিতা)
প্রমা অবন্তী ও কুন্তল বড়ুয়া কে নিয়ে লিখেছেন-
পুলকে নাচে রক্ত স্রোত, অবনী তোর কাঁদে, জলের দেহে আগুন ফোটে, নটরাজের আর্তনাদে।
আবার দেখলাম বাঁশখালীর সাধনপুরে গ্রামে দুহাজার তিনসালে যে এগারজনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছির তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে… লিখলেন..
বাতাসে আজ মানুষ পোড়া ছাই
আকাশ জুড়ে মেলল পাখা উই
ইচ্ছে করে প্রাচীন পৃথিবীটা
ধোপার মতো গঙ্গাজলে ধুই।।
(ধোপার মতো /প্রাচীন প্রার্থনাগুলো / নির্বাচিত কবিতা  পৃ/ ১১৫)
কবি ওমর কায়সার আমার কাছে অন্যান্য উচ্চমার্গী একজন শ্রদ্ধার মানুষ হয়ে ওঠার কারণ হলো তাঁর রাজসিক উপস্হাপন, মহাকাব্যোচিত উপমা প্রয়োগ ও চিত্রাঙ্কনে শব্দের নৈপুণ্যের ঢালি সাজিয়েছেন। আমি রীতিমতো পাঠ করছি, লিখছি ও আরও জানতে চেষ্টা করছি। কবি যখন ১৯৮৮ সালে দুঃখ দিয়ে কাব্য সাজান, এর অল্প কয়েক বছর আগে আমার জন্ম। কবির ” নির্বাচিত কবিতা “ বইটি পড়ে আমার আরও লোভ বেড়ে যায়। এই বইটি তাঁর কাব্যগ্রন্থ চারটির  (প্রাগৈতিহাসিক দুঃখ, প্রতিমাবিজ্ঞান, বাস্তুসাপও ও পালিয়ে বেড়ায়, প্রাচীন প্রার্থনাগুলো ) সংযোজনে একটি গ্রন্থ নাম “নির্বাচিত কবিতা” বইটি প্রকাশিত হয় দ্বিতীয়বারে ২০১৯ সালে, এর আগে ২০১৪ সালেও প্রকাশিত হয়েছিল। লেখককের অন্যান্য বইগুলো ও পড়ার মনস্থির করেছি  (পরিবেশ / তৃণভূমি, ছোটদের বই / দূর সাগরে পথ হারিয়ে, মেছো ভূতের গল্প, পরি ও জাদুর তুলি, জাদুর বেলুন, উপন্যাস / অ্যাকুরিয়ামের দিনগুলো) । এসব বইগুলো সম্পর্কে এই প্রজন্মের লেখকদের পাঠ করা খুব জরুরি।
উনার মতো মেধা, প্রজ্ঞা ও কাব্যিক সত্তাকে বিচার করা আমার মত নগন্য পাঠক হয়ে এই ধৃষ্টতা দেখার জন্য প্রার্থনা ভিক্ষা চাইছি। আমার কাছে উনি মধ্যমনি হয়ে উঠার কারণ হলো – তাঁর সৌন্দর্যলক্ষীর কাব্যময়তা। যদি আবার কখনো সুযোগ হয় কবি ও তাঁর কবিতা সত্তাকে আরও বিশদপাঠে জেনে তুলে ধরবো। এটা আমার একান্ত অনুভূতিতে লেখা, যদি মনের অজান্তে কোন দিক থেকে ভুল- ত্রুটি  হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি আশা করছি।
কবি ও প্রাবন্ধিক ঃ নাসিমা হক মুক্তা।