নবীগঞ্জে ত্রানে চাল বিতরণের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশিত: ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

নবীগঞ্জ প্রতিনিধি:

নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণের তালিকায় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

তালিকায় একই ব্যক্তির নাম রয়েছে একাধিকবার, আছে অনেক ভুয়া নাম। যে গ্রামে কোনো হিন্দু পরিবার নেই, তালিকায় সে গ্রামেই দেখানো হয়েছে অনেক হিন্দু উপকারভোগীর নাম।

এমনকি পিতা মুসলমান কিন্তু ছেলে হিন্দু, আবার কোনটায় স্বামী মুসলমান স্ত্রী হিন্দু এমন অসংখ্য নাম রয়েছে তালিকায়। এছাড়া মৃত ব্যক্তিদের নামও আছে।

এমন অনিয়মকে অনেকেই বলছেন এ যেন হরিলুটের মহোৎসব। ইউপি সদস্যদের অভিযোগ, তারা চেয়ারম্যানের নির্দেশে ৫০টি করে নাম দিয়েছেন। বাকি ভুয়া নাম দেখে তারাও অবাক।

ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হওয়ায় অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে ভায় পান। এদিকে তালিকা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

এ ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় হইচই পড়ে যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চালপ্রাপ্তির তালিকায় মোট উপকারভোগী এক হাজার ১৮৫ জনের নাম রয়েছে।

২০১৬ সালে ওই তালিকাটি প্রণয়ন করা হয়। তখন থেকে উপকারভোগীদের চাল পাওয়ার কথা থাকলেও অনেকেই এখনো পাননি সে সুবিধা। একটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানে নেমে পাওয়া গেছে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র।

এ যেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এলো। আলোচিত এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুল। তিনি বর্তমান নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি।

এদিকে তালিকা যাচাইয়ে দেখা যায়, কোনো নাম চারবার, কোনো নাম তিনবার করে তালিকায় রয়েছে। এদেরই একজন কুটি মিয়া। বাড়ি ইউপি চেয়ারম্যানের নিজ গ্রাম সাতাইহালে।

তার নাম রয়েছে তালিকার ক্রমিক নং ৬৬৬, ৬৮০, ৭২০, ১০৭৩ অর্থাৎ চারবার। এরকম আরও অনেকের নাম আছে। একাধিকবার নাম প্রায় ৫০টির মতো রয়েছে তালিকায়। প্রাথমিক যাচাইয়ে পাওয়া গেছে এর সত্যতা। রয়েছে কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নামও।

কয়েকটি গ্রামে হিন্দু পরিবার না থাকলেও দেয়া হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভুয়া নাম। তালিকায় রয়েছেন অথচ একবারও চাল পাননি, এমন লোকের সংখ্যাও অনেক।

আলোচিত এ তালিকাটির ৪৯৯ নং থেকে ৫০৮ পর্যন্ত বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে সুবিধাভোগী হিসেবে। রাইধনী সরকার, বিজু সরকারসহ বেশ কয়েকজনের নামের পাশে গ্রাম লেখা রয়েছে তারালিয়া।

তালিকা নিয়ে তারালিয়া গ্রামে গিয়ে জানা যায়, গ্রামটিতে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের গোপ পদবির লোকজনের বসবাস। অর্থাৎ সরকার পদবির কেউ নেই।

তালিকায় যে নাম রয়েছে গ্রামবাসী কাউকেই চেনেন না। তাদের দাবি, নামগুলো ভুয়া। এ গ্রামের প্রায় ২২ জনের নাম আছে তালিকায়, বাস্তবে চাল পান তিনজন। বাকি নামগুলো ব্যবহার করে সংশ্লিষ্টরা চাল আত্মসাৎ করেছেন।

এমনটাই বললেন গ্রামবাসী। তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নাম। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে তারা জীবিত থাকতেও কোনো সময় চাল পাননি, মারা যাওয়ার পরও তারা জানেনই না যে তালিকায় নাম আছে। যে গ্রামের নামে ইউনিয়নের নাম, সেই গজনাইপুর গ্রামে নেই কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস।

ওই তালিকায় অনিয়মগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে যেটা নিয়ে মানুষ সমালোচনা করছেন সেটা হল- স্বামী মুসলমান আর স্ত্রী হিন্দু, ছেলে হিন্দু কিন্তু পিতা মুসলমান।

তালিকার ৫৮২ নম্বরে থাকা নাম আ. আহাদ, পিতা পিরিজা সরকার। ৫৮৬ নম্বরে মহেশ সরকার, পিতা সুনুজ উল্লা। ৫৯২ নম্বরে স্বরসতী সরকার, স্বামী আকবর মিয়া।

অর্থাৎ এসব পরিবারে দুই সম্প্রদায়ের লোক! বাস্তবে না হলেও এই তালিকাতে এমটাই লেখা হয়েছে। কয়েকজন ইউপি সদস্যদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, তারা ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে তালিকায় ৫০টি করে নাম দিয়েছেন।

বাকি নামের কোনো কিছুই তাদের জানা নেই। ইউপি চেয়ারম্যান ইমদাদুর রহমান মুকুল তালিকায় অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেন। তার দাবি, সবার সমন্বয়ের মাধ্যমেই করা হয়েছে এ তালিকা।

তিনি বলেন, এটা আমাদের একটা গাফিলতিও বলা যায়। আমরা এর সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল বলেন, অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।