নওগাঁয় একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শীতবস্ত্র বিতরণ করতে গিয়ে যা বললেন, আপনিও অবাক হবেন

প্রকাশিত: ৬:৩৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২১
স্টাফ রির্পোটারঃ সম্পতি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়া মারীয়া পেরেরা তার নিজের কিছু জীবন কাহিনী তুলেধরে এবং উপস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবন বললাতে করণীয় সম্পর্কে অসাধারনভাবে জন সচেতনতা মূলক বক্তব্য রাখেন। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে বক্তব্যগুলো শুনার পরই উপস্থিতরা অনেকেই বাস্তবমুখি এমন কথাগুলো বলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রশংশা করেছেন।
এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ”’জয়া মারীয়া পেরেরা”’ তার কর্মস্থল নিয়ামতপুর উপজেলাধীন ঝাজিরা ( শ্রীমন্তপুর) গ্রামে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উদ্যোগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের দরিদ্র শীর্তাতদের মাঝে শীতবস্ত্র (কম্বল) বিতরণ উপলক্ষে আলোচনা সভায় দেয়া বক্তব্যর কিছু অংশ লিখে গতকাল তিনি সোস্যাল মিডিয়া ফেসবুক আইডিতে ও সেয়ার করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দেওয়া পোস্টটি পাঠকদের জানাতে হ্বুহু নিচে তুলে ধরা হলো।
দয়া করে বলবেন না যে আমরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বলবেন না আমরা গরীব মানুষ, বলবেন না আমাদের হয়ে কথা বলবার কেউ নেই…..।
কারণ এ উপলব্ধি আপনাদের কেবল পিছনেই টানবে। এগিয়ে আসতে দিবেনা।
চুয়ানি বানানো এবং বিক্রি ছেড়ে দিন। বাড়িতে শিশুদের বড় হওয়ার সুস্থ পরিবেশ তৈরি করুন। তাদের লেখাপড়া করতে উৎসাহ দিন। পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা দিন। মেয়েদের উপযুক্ত বয়সে বিয়ে দিন। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মনের মাঝে একজন আদর্শ মানুষ হওয়ার এবং সমাজে নিজেকে কিছু একটা হয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ‘স্বপ্ন’ তৈরি করে দিন।
সন্তানকে উপলব্ধি করতে শিখান আপনার যত কষ্টই হোক সে লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হলে সব কষ্ট ধুয়েমুছে যাবে। তার ২০০ টাকা রোজগারের ভাগ পাওয়ার জন্য স্কুলের বই ফেলে দিয়ে যদি ধানের ক্ষেতে ঠেলে পাঠান তাহলে ভবিষ্যতে তার ভাগ্যচক্র ২০০ টাকার মধ্যেই আবদ্ধ করে দিলেন! অথচ সুযোগ পেলে লেখাপড়া শিখে সে হয়তো বড় অফিসার হতে পারতো! সম্মানের সাথে কত টাকা রোজগার করতো…!
আপনার জীবন যেমন গিয়েছে যাক ওদের জীবন হোক বর্ণিল এবং কর্মময়। এভাবেই রচিত হবে আপনাদের এগিয়ে আসার ইতিহাস। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নিজেদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের অনেকেই এ সফলতার গন্ডি ছুঁয়েছে। তাদের কর্মময় জীবন থেকেও শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।
আমার মায়ের নাম ‘শেফালী’। বাবা ভালবেসে ডাকতেন ‘শেফু’ বলে। মাত্র ক্লাশ টেন অবধি পড়েছিলেন। বিয়ের পর পেয়েছিলেন চরম দারিদ্র্যতায় ভরা যৌথ পরিবার। অজ পাড়া গাঁয়ের এ দরিদ্র গৃহবধূও স্বপ্ন দেখেছিলেন তার মেয়ে লেখাপড়া করে বড় অফিসার হবে। পাশে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন আমার বাবাকে।
মায়ের মুখে শুনেছি রাতে বৃষ্টি এলে বাবা-মা বিছানা গুটিয়ে আমাকে কোলে নিয়ে ঘরের কোনে রাতভর বসে কাটিয়েছেন। অপেক্ষায় থেকেছেন কখন থামবে বৃষ্টি! ঘরের মেঝে একটু শুকালে কখন আবার বিছানা পাতবেন। সেই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে এখন সরকারি গাড়ীতে ছুটে বেড়াই।
তবুও কি বিশ্বাস করেন আপনারা দরিদ্র বলে আপনার সন্তানেরা পারবেনা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে?
নিজেদের বাস্তব অবস্হাকে মেনে নিন। যার যেমন আছে সেখান থেকেই শুরু করুন। তাছাড়া আপনারা অনেক পরিশ্রমী। উপার্জিত অর্থ একটু বুদ্ধি করে ব্যয় করলে এবং সরকার প্রদত্ত ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দারিদ্রতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জন্য এখন সরকারের অনেক সহায়তা আছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ প্রকল্প আছে আপনাদের জন্য। শিক্ষা এবং চাকুরিতে কোটাও আছে। সুযোগগুলো কাজে লাগান।
তবে সর্বাগ্রে বিশুদ্ধ করুন পারিবারিক পরিবেশ। সেটির উপর নির্ভর করবে আপনি কতটা সফল হবেন। অর্থে দরিদ্র হলেও অন্তরে যদি ধনী হতে পারেন…  পরিবারে যদি শুদ্ধাচার চর্চা করা যায় তাহলে আপনাদের সন্তানেরা এক একজন সম্পদ হয়ে উঠবে।
আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যুব সমাজকে উদ্দেশ্য করে বলবো অবুঝদের বুঝান। গঠনমূলক কাজে সময় দিন। সমাজকে শুদ্ধ করার জন্য একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করুন। নিজ নিজ পরিবারকে চুয়ানি/মাদক এবং বাল্য বিয়ের মতো সামাজিক অপরাধ থেকে মুক্ত করার উপায় বের করুন। সকল পরিবারের সমস্যা এক নয়, সুতরাং সমাধানও এক হবেনা। এটি এক দিনে অর্জিত হবেনা। তবে হাল ছাড়া যাবেনা। লেগে থাকতে হবে।
আপনাদের জীবনেও স্বপ্ন জয়ের অপূর্ব সব গল্প তৈরি হোক। সকলের জন্য নিরন্তর শুভ কামনা।

Categories