দুদকের মামলায়ও ফাঁসছেন ওসি প্রদীপ-দম্পতি

প্রকাশিত: ৮:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২০

কক্সবাজারের পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার আসামি টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালেও আটকা পড়তে পারেন।

চার কোটি টাকার সম্পত্তির বৈধ উৎস দেখাতে না পারায় প্রদীপ-চুমকি দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে দুদক। ওই সম্পত্তি যেন বিক্রি বা অন্য কোথাও হস্তান্তর না হয়, সে জন্য আদালতের কাছে জব্দের অনুমোদনও চাওয়া হতে পারে। শ্বশুর ও স্ত্রীর নামে সম্পত্তি গড়েও সিনহা হত্যায় সমালোচিত-বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা প্রদীপের রেহাই মিলছে না বলে জানা গেছে।

এদিকে দেশজুড়ে আলোচিত মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলার প্রধান তিন আসামি টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতকে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট র‌্যাব কর্মকর্তারা। কক্সবাজারে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-১৫(র‌্যাব) কার্যালয়ে রেখে মঙ্গলবার থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

একটি সূত্র মতে, র‌্যাবের জেরায় পুলিশের মামলার সাক্ষী ও সোর্স তিন আসামি নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াছ এর ওপর দায় চাপাচ্ছেন প্রধান আসামিরা। পাহাড়ে ডাকাত সংক্রান্ত সোর্সদের ভুল তথ্যে বিভ্রান্তি ঘটেছে বলে দাবি করছেন ওসি প্রদীপসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তা। অন্যদিকে সিনহার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথের ল্যাপটপ, মোবাইলসহ ২৯টি ডিভাইস আদালতে অনুমতি নিয়ে রামু থানা থেকে নিজেদের জিম্মায় নিচ্ছে র‌্যাব।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, তিন এপিবিএন পুলিশ সদস্যসহ রিমান্ডে থাকা অপর সাত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার দিন এপিবিএন পুলিশ সদস্যদের ফোন করে সিনহার গাড়ি আটকাতে বলেছিল পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত। সব আসামিকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রাখছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিনিয়র এএসপি খাইরুল ইসলাম।

দুদকের মামলায় ফাঁসছেন প্রদীপ-দম্পতি: জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধানে প্রদীপের স্ত্রী চুমকির নামে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৬৩৫ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। এর কোনো বৈধ কোনো উৎস দেখাতে পারছেন না। একজন গৃহিণী হয়ে কীভাবে এত টাকার মালিক হয়েছেন তাও দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

একই সূত্র জানায়, দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপের স্ত্রী চুমকির নামে চট্টগ্রামের কোতোয়ালিতে জমিসহ ছয়তলা বিলাসবহুল বাড়ি। আর এই বাড়ির বিষয়ে চুমকি দুদককে বলেছেন, ২০১৩ সালে বাড়িটি তার বাবা তাকে দান করেছেন। কিন্তু চুমকির অন্যান্য ভাই ও বোনদের তার বাবা কোনো সম্পত্তি দান করেননি। শুধু তাই নয়, ২০০৬ সালে শ্বশুরের নামে কেনেন বাড়ির জমি। এরপর ৬ তলা বহুতল ভবন গড়ে তোলেন। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে পুলিশ কর্মকর্তা প্রদীপ অবৈধ সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে বাড়িটি নির্মাণ ও জমি ক্রয় করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শুধু তাই নয় প্রদীপের স্ত্রী চুমকি ২০১৪-১৫ কর বর্ষে মাছের ব্যবসা করে আয় দেখিয়েছেন দেড় কোটি টাকা। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে যার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আয়কর নথিতে কমিশন ব্যবসা থেকে আয় দেখিয়েছেন চুমকি। যেখানে ব্যবসার মূলধন হিসেবে দেখিয়েছেন ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা আর আয় দেখিয়েছেন ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে কমিশন ব্যবসার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া চুমকি কমিশন ব্যবসার লাইসেন্স, সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে ব্যবসা করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্য কিছুই দুদকে দেখাতে পারেনি।

দুদক সূত্র মতে, চুমকির নামে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ১৮ হাজার ৮৬৯ টাকার সম্পদের প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে খরচ দেখিয়েছেন ২১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। আর আয় দেখিয়েছেন ৪৯ লাখ ১৩ হাজার ২৩৪ টাকা। ফলে চুমকি দুদকের কাছে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৬৩৫ টাকার কোনো বৈধ খাত দেখাতে পারেনি।

ফলে প্রদীপ দম্পতির বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন দুদকের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়। প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন পেলে প্রদীপ দম্পত্তির বিরুদ্ধে মামলা হবে। এ প্রসঙ্গে দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, অনুসন্ধানের বক্তব্য কমিশনে গৃহীত হলেই হবে মামলা। এরপর কমিশন পরবর্তী ধাপগুলো অবলম্বন করবে। ইতোমধ্যেই মামলার দায়েরের সুপারিশ এসেছে।

জব্দ করা ২৯ ডিভাইস র‌্যাবের হাতে: র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেছেন, সিনহার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথের ল্যাপটপ, মোবাইল, ক্যামেরা, হার্ডডিস্কসহ মোট ২৯টি সামগ্রী রামু থানা থেকে নিজেদের জিম্মায় নেয়ার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছিল। আদালত আমাদের অনুমতিও দিয়েছেন। আমরা রামু থানায় যোগযোগ করছি। তারা দিয়ে দিলেই আমরা যেকোন সময় জিনিসগুলো বুঝে নেব।

সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে গত ৫ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। এতে নয়জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের প্রত্যাহার হওয়া পরিদর্শক লিয়াকত আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. মোস্তফা ও এসআই টুটুল। এদের মধ্যে আসামি মোস্তফা ও টুটুল পলাতক। বাকিরা গ্রেফতার হয়ে র‌্যাবের হেফাজতে সাত দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।


Categories