“তৈরি পোশাক ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সহজীকরণের লক্ষ্যে ‘লিড টাইম’ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা”

প্রকাশিত: ১১:৩৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২০

বায়ারদের আকর্ষণ করানোর জন্য এবার রপ্তানিতে লিড টাইম কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বায়ারদের আদেশ থেকে শুরু করে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘লিড টাইম’। বাংলাদেশে রপ্তানির লিড টাইমের গড় সময় ৩০ দিন। প্রতিযোগী দেশ চীন ও ভিয়েতনামের লিড টাইম এর অর্ধেক। এতে বায়ারদের আকর্ষণ করতে পারছে না বাংলাদেশ। এবার রপ্তানিতে লিড টাইম কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি তৈরি পোশাক ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সহজীকরণ নির্দেশনা-২০২০ প্রণয়ন করা হয়েছে।

এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সহজ করতে ১০টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি ভালো উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পোশাক রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে সরকার এই নীতি-নির্দেশনা জারি করেছে। পদক্ষেপটি তৈরি পোশাক শিল্পে যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলোর কাছে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়েছে। এ ছাড়া নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর কাছেও এ চিঠির কপি পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, পুরনো চ্যালেঞ্জ তো আছেই। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে কভিড-১৯ মহামারী। সার্বিক পরিস্থিতি  বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাক পণ্যের চাহিদা কমিয়ে দেওয়ায় রপ্তানিমুখী খাতটিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি আরও বলেন, মহামারী ও পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন বাস্তববাদী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার উপায় খুঁজছি।

নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, পোশাক শিল্পটি ইদানীং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যা যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। ব্যবসার পদ্ধতি সহজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে লিড টাইম কমানো জরুরি বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ না হওয়ার একটি প্রধান কারণ এটি।

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানিতে অনেক ছাড় থেকে বঞ্চিত হবেন দেশের উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া কভিড-১৯ মহামারী ইতিমধ্যে রপ্তানিমুখী ক্ষেত্রগুলোয় আঘাত করেছে। এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। এ অবস্থায় সরকারের এই নীতি চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে আশা করছি।

এ বিষয়ে বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি জনাব মোহাম্মদ হাতেম  বলেন, এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে একটি কমিটি করা হয়েছে। আমি ওই কমিটির একজন সদস্য। বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও সহজীকরণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। এটি এখন খুবই জরুরি। কিন্তু সরকারের ভালো ভালো উদ্যোগ কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর অসহযোগিতা ও দুর্নীতির কারণে বাস্তবায়ন হয় না। এ নির্দেশনাও এ জটিলতায় পড়ে বাস্তবায়ন না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে আমি আশা করব, সরকার ও সংশ্লিষ্টরা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের এই ক্রান্তি লগ্নে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে আন্তরিক হবেন।

উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে পোশাক খাতের জন্য শূন্য শুল্ক বা স্বল্প শুল্ক সুবিধা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তৈরি পোশাক খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ জন্য কৃত্রিম এবং মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদনের জন্য পশ্চাৎপদ সংযোগ শিল্প (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) স্থাপনের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া  বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং উৎপাদনশীল খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অযৌক্তিক দলিল বা কাগজপত্র না চাইতে সংশ্লিষ্ট কমিশন বা সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, রপ্তানি নীতি আদেশে উল্লিখিত সব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে তা পোশাকশিল্পকে আরও উন্নত করতে সহায়ক হবে।

নির্দেশনায় চলমান বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে যাওয়ার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে। পোশাক রপ্তানি বাড়াতে অপ্রচলিত বাজার অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রপ্তানি বাড়াতে রাশিয়া ও কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেট স্টেটস (সিআইএস) দেশগুলোর সঙ্গে একটি কার্যকর বাণিজ্যিক লেনদেনব্যবস্থা জানতে অনুরোধ করা হয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মাথায় রেখে যন্ত্রপাতি কিনতে এবং লোকদের প্রশিক্ষণে স্বল্প সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনেরও আহ্বান জানানো হয়েছে। কারখানার মালিকদের বৈদেশিক বাজারে পোশাক রপ্তানির ধারাবাহিকতার জন্য শ্রম আইন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) দ্বারা নির্ধারিত মানগুলো নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় তার নির্দেশনায় বলেছে, ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলো বিভিন্ন প্রতিকূল প্রভাবের কারণে সঠিকভাবে ব্যবসা পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের জন্য একটি বহির্গমন নীতি স্থাপন করা জরুরি।


Categories