তুমি আর কত দূরে!

প্রকাশিত: ৯:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০২০

 

এ টি এম আশরাফুল ইসলাম সরকার রাংগা।

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে- ‘ Education is the backbone kf a nation, অর্থ্যাৎ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে মেরুদন্ডের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তেত্রিশটি কশেরুকার সমন্বয়ে গঠিত এই ঋজু অস্থি আমাদের এই সুঠাম দেহকে কর্মক্ষম রেখেছে। এর কোনো ক্ষতি মানুষকে জড়প্রায় নির্জীব প্রাণীতে পরিণত করে যার অস্তিত্বই হয় পরনির্ভর। কোনো আশা বা স্বপ্ন তার কাছে মনে হয় অলীক, অচেনা। এটা আমরা সবাই জানি এবং স্বীকারও করি। কিন্তু বাংলাদেশের মত একটা মধ্যম আয়ের দেশে কি আমরা শিক্ষা নামের এই মেরুদন্ডের গুরুত্বটুকু বুঝিনা? আমরা কেন এই শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছিনা? আমরা কেন এই শিক্ষায় বিনিয়োগ করছিনা? একবার কি ভেবে দেখেছি, এই শিক্ষায় বিনিয়োগের ফলে জাপান, আমেরিকা, চীন আজ সারা বিশে^র দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে!

আমরা শিক্ষক। আমাদের দেশ ও জাতি গড়ার কারিগর বলা হয়। সম্মানের শ্রেষ্ঠত্বের আসনটিও নাকি আমাদের। যদি তাই হয়, তাহলে অসম্মানের সাথে কেন আমাদের ভাগাভাগী করতে হচ্ছে। ন্যায্য অধিকারের সফল স্বপ্নগুলোকে কেন বার বার ভেঙ্গে চুড়-মাড় করে দিচ্ছে। কেন আমরা ওয়েটিং লিস্টে পড়ে আছি!

স্বাধীনতার ৪৮ বছরে জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। দেশে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। সরকারী চাকুরীজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। বে-সরকারী শিক্ষকদেরও বেতন বাড়ানো হয়েছে; আমরা আনন্দে নেচেছি। কিন্তু দিন যায় বাড়ে দুঃখ। আজ ৪৮ বছরেও আমাদের  বে-সরকারী শিক্ষকদের বৈষম্য যেন বিদায় নিলনা। বে-সরকারী বলেই হয়ত এই পরাজয়ের বিজয় মালাটা প্রতি মাসেই আমাদের গলায় শোভা পায়। যে ‘বে’- উপসর্গটির জন্য আজ আমাদের এই কষ্ট, এই বেদনা, এত অবহেলা, বৈষম্য; আমরা চাই সেই ‘বে’- উপসর্গটি বিলুপ্ত হয়ে মূল শব্দ ‘সরকারী’ অর্থাৎ জাতীয়করণ হউক।

আমাদের এমপিও ভূক্ত শিক্ষকদের আহাজারি ও বৈষম্য যেন দিন দিন আকাশ ছুঁতে চাইছে। ১৮৫৪ সাল থেকে চালু হওয়া বে-সরকারী শিক্ষকদের মাসিক অনুদান দেয়ার প্রথাটি শিক্ষার মত মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রাচীন সেই নিয়ম যেন আজও চালু রয়েছে, ফলে বিভিন্ন অনিয়ম, প্রথা, দুর্নীতি সংগত কারণে নিঃশব্দ ঘুনপোকার মতই নিরবে বৈষম্যের পাহাড় সৃষ্টি করেছে। আমাদের বাড়ি ভাড়া০০ % – এ, মাত্র ১০০০/- টাকা পাই। চিকিৎসা ভাতা- ৫০০/- টাকা, উৎসব ভাতা- ২৫%  (কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০%), পেনশন সুবিধা- ০০%, টাইম স্কেল- বন্ধ, উচ্চতর স্কেল- ঘোষণায় আছে বাস্তবায়ন নেই, বদলী আছে- ব্যবস্থা নেই, সন্তানদের শিক্ষা ভাতা নেই। পদন্নোতির সুযোগ নেই, টিফিন ভাতা নেই। বেতন যা আসে তাও আবার মাসের ১০-১৫ তারিখ (কোনো কোনো সময়ে ২০-২২ তারিখে) উঠাতে হয়। এমন অনেক ঈদ গেছে, যে গুলোর বেতনের অতিরিক্ত অংশ ঈদের পরে তুলতে হয়েছে। অবসরে গেলে যেটুকু অনুদান পাওয়া যায় তার উত্তোলন প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং সময় সাপেক্ষ। অনেক সময় ঐ শিক্ষক অনুদান না পেয়েই মৃত‚্যর কাছে হার মেনে যায়। শিক্ষা ভাতা নেই, চাকুরীর নিরাপত্তা নেই। সরকারী অষ্টম শ্রেণি পাশ একজন পিয়নের থেকে এম এ ডিগ্রীধারী এমপিও ভ‚ক্ত শিক্ষকের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা একেবারেই কম যা একজন শিক্ষকের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এ কারণেই হয়ত মেধাবীরা এ পেশায় আসতে চায়না।

যখন সরকারী অনুপাত প্রথার বেড়াজালে পড়ে একই যোগ্যতা সম্পন্ন বে-সরকারী শিক্ষকরা  তুলনামূলক বৈষম্যের শিকার হন, তখন কি তার সহকর্মী তার বার্যক্রমে আগের মত উদ্দীপ্ত বা উজ্জীবিত হয়ে কাজ করতে পারেন? আমরা এতটা বৈষম্য চাইনা। আমরা স্বাধীন জাতি। আমরা আমাদের সম-যোগ্যতা সম্পন্ন প্রত্যেকটি চাকুরীজীবির সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার বিধান চাই। তাই এ বিষয়গুলো আমাদের ভাববার দরকার।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার। এজন্য আমরা আদিষ্ট হয়েছি। আর এ আদেশকে মাথায় নিয়েই ডিজিটাল হওয়ার চেষ্টা করছি। আইসিটি (কম্পিউটার) ট্রেনিং নিয়ে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে ক্লাশ উপস্থাপন করছি। শিক্ষক বাতায়নের সদস্য হয়ে যথাসাধ্য কনটেন্ট আপলোডের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গভীর রাত জেগে জেগে মডেমে পয়সা ভরিয়ে নিত্য-নতুন চিন্তা ধারায় আধুনিক শ্রেণি উপযোগী ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরী করছি। সকাল ১০.০০ টায় বিদ্যালয়ে গিয়ে বিকেল ৪.০০ টায় বাড়ি ফিরে বাকী সময়টুকুতে পরের দিনের শ্রেণি পরিচালনার ভাবনা আমাদের কি এতটুকু ক্লান্ত করেনা? রাষ্ট্রিয় দায়িত্ব পালনে আমাদের কি এতটুকু ভূমিকা নেই? তবে কেন আমাদের কাছ থেকে বার বার চোখ ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে। সরকারী শিক্ষকদের চেয়ে আমাদের এমন কোন জায়গাটি আছে, যেখানে শূণ্যতা পরিলক্ষিত হয়? একই দেশে একই শিক্ষক, অথচ একই টেবিলে বেমানান- এটা কী করে হয়?

শিক্ষকদের হাতেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার দায়িত্ব। নতুন প্রজন্মকে দক্ষ ও যোগ্য মানুষ হিসেবে তৈরী করেন শিক্ষকরাই। নৈতিকতা সমৃদ্ধ মানুষ গড়ার মূল কারিগর শিক্ষকগণ। তাই সকল বঞ্চনা-বৈষম্য দূরীকরণ এবং যথার্থ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে শিক্ষকদের। অবিলম্বে জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন করে শিক্ষকদের মাঝে যে অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা, বৈষম্য ও ক্ষোভ রয়েছে, তা দূরীভূত করা জরুরী। শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারী ও বে-সরকারী শিক্ষকদের যে বৈষম্য রয়েছে তা দূরীকরণে অবিলম্বে এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের আহ্বান জানাচ্ছি। কেননা, বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষের ও সাংবিধানিক অধিকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে শুধুমাত্র শিক্ষকরাই উপকৃত হবেন না, এর সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করবে প্রান্তিক অস্বচ্ছল জনগোষ্ঠির সন্তানরা। বে-সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করা হলে- ১. দরিদ্র জনগোষ্ঠির মধ্যে লেখা-পড়ার প্রবণতা বাড়বে ২. দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়াব বন্ধ হবে ৩. দরিদ্র জনগোষ্ঠির শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হবে ৪. সরকার ঘোষিত গ্রাম অঞ্চল শহরে রুপান্তরকরণ সহজ হবে ৫. সামগ্রিকভাবে উচ্চ শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে ৬. দরিদ্র জনগোষ্ঠি অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে ৭. ধনি-দরিদ্রের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূর হবে ৮. শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্যের অবসান হবে ৯. প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত পড়া-লেখার পরিবেশ তৈরী হবে ১০.  বে-সরকারী শিক্ষকরা অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে ১১. শিক্ষকরা পাঠদানে আন্তরিক হবেন ১২. স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোচিং বাণিজ্যের বিলুপ্তি ঘটবে ১৩. বে-সরকারী শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে ১৪. উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মানের কাজ সহজ হবে ১৫. দেশ শিক্ষিত জন-শক্তিতে রুপান্তরিত হবে ১৬. সরকারী কোষাগারে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে ১৭. প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক জটিলতা দূর হবে ১৮. মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবে ফলে শিক্ষার কাঙ্খিত মানোন্নয়ন হবে ১৯. বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মানে শতভাগ সফলতা আসবে ২০. সর্বোপরি গণতন্ত্রের মানসকন্যা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী  শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন শতভাগ বাস্তবায়িত হবে।

যে সময়ে সম্পুর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে, নিজস্ব স্যাটেলাইট মহাকাশে উড়ছে, সবার হাতে ফোর জি মোবাইল, খাদ্যে স্বয়ং সম্পুর্ণ, বস্ত্র, পাট, মৎস্য রপ্তানী করছি। যে সময় আপনার নেতৃত্বের মডেল প্রতিবেশী রাস্ট্র প্রধানরাও অনুসরণ করছেন। পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা, ডিজিটাল প্রকল্প, প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ সহ মেগা প্রকল্প আপনার হাত দিয়ে প্রাণ পেয়েছে, ঠিক সেই সময়ে আপনার নিকট আমাদের চাওয়া, আপনি আমাদের জাতীয়করণের ঘোষণা দিন। আপনার এই ঘোষণায় মুক্তি পেতে পারে পাঁচ লক্ষ এমপিওভূক্ত শিক্ষক-কর্মচারী। বন্ধ হবে সরকারী ও বে-সরকারী শিক্ষকদের বিরাজমান বৈষম্য। জাতি হিসেবে আমরা আর পিছিয়ে থাকতে চাইনা। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। আমরা জাতির জনকের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। এটা আমাদের অধিকার। আমরা বাংলাদেশ শিক্ষক সমাজ আপনার কাছে প্রত্যাশায় আছি- আসন্ন ‘মুজিব বর্ষে’ আপনি শিক্ষা ও শিক্ষকদের মনোন্নয়োনের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ০৭ মার্চের ভাষণের মত তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে আপনিও জাতীয়করণের ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়ে সকল শিক্ষক তথা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের হৃদয়ের মনিকোঠায় চির জাগরুক হয়ে থাকবেন। আরো একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবেন।

শিক্ষা নিয়ে এমন একটা ভাবনা আমার মাথায় আসবে, এটা কখনও চিন্তা করিনি। কিন্তু ইন-হাউজ ট্রেনিং কোর্সের একজন মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করার সময় অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষকের সাথে আমার মত বিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল। ০৬ দিনের প্রশিক্ষণের ফাঁকে ফাঁকেই তাঁরা আমার কাছে অনেক সুখ-দুঃখের কথা শেয়ার করত। তাঁদের এ কথাগুলো ছিল জীবন থেকে নেয়া।

লেখক: শিক্ষক, সাহিত্যিক, কবি, কলামিস্ট।

কৃতজ্ঞতা: বেসরকারী শিক্ষক ফোরাম/ইন-হাউস প্রশিক্ষণার্থীবৃন্দ

 


Categories