জাহেলী আরবে সুন্দরী প্রতিযোগীতা বা ‘মিস আরব’ নামে কোনো প্রতিযোগীতা হতো না।

প্রকাশিত: ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২১, ২০২২

বাসেদ আলী।

জাহেলী আরবে সুন্দরী প্রতিযোগীতা বা ‘মিস আরব’ নামে কোনো প্রতিযোগীতা হতো না।

জাহেলী আরবে সুন্দরী প্রতিযোগীতা বা ‘মিস আরব’ নামে কোনো প্রতিযোগীতা হতো না। এরকম কোনো প্রতিযোগীতা যদি হতো, তাহলে সেই প্রতিযোগীতায় শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর মুকুট পেতেন হিন্দ বিনতে উতবা।
জাহেলী যুগে হিন্দ ছিলেন কুরাইশ নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী। [১] আমাদের সময় কারো শরীরের রঙ ফর্সা হলে তাকে বলা হয় ‘দেখতে ব্রিটিশদের মতো/বিদেশীদের মতো/ইউরোপীয় লাগছে’। সাদা চামড়ার দেশী কাউকে এভাবেই সম্বোধন করা হয়। তৎকালীন আরবদের কাছে উপমহাদেশের ব্যাপারে ফ্যাসিনেশন ছিলো। হিন্দ বিনতে উতবার নামকরণ ‘হিন্দ’ হবার পেছনে এটা ছিলো অন্যতম কারণ। [২]
হিন্দ বিনতে উতবাকে পাবার জন্য অনেকেই পাগলপ্রায় ছিলেন। এমনকি যৌবনে হিন্দ নিজেও একবার প্রেমে পড়েন।
হিন্দ ভালোবাসতেন মুসাফির ইবনে আবি আমরকে। ‘একজন সুন্দরী নারী একজন গরীব ছেলের প্রেমে পড়ে’ –হিন্দের বেলায়ও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি নিজে ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে, তার বাবা ছিলেন আরবের বিখ্যাত নেতা উতবা ইবনে রাবীয়াহ। হিন্দের বাবার অবস্থানকে আমাদের সময়ের একজন এমপির সাথে তুলনা করা যায়। এরকম একজন সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরীর প্রেমে পড়েন মুসাফির ইবনে আবি আমর। তিনি ছিলেন একজন কবি, কিন্তু তার অর্থকড়ি ছিলো না।
ভার্সিটিতে পড়াবস্থায় যারা প্রেম করে, একটা বয়সে মেয়ে ছেলেকে বলে, “তুমি একটা চাকরি দেখো পাও কিনা। চাকরি না পেলে আমার পরিবার তোমাকে মেনে নিবে না।” গার্লফ্রেন্ডকে পাবার জন্য বয়ফ্রেন্ড বিসিএসের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিভি ড্রপ করে।
তৎকালীন যুগে হিন্দ বিনতে আমরও তার প্রেমিককে এমন প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, “যেহেতু তুমি দরিদ্র, আমার পরিবার তোমার সাথে আমাকে বিয়ে দিতে রাজি হবে না। তুমি এক কাজ করো, পার্শ্ববর্তী কোনো রাজার নিকট যাও এবং সেখানে কাজ করে কিছু সম্পদ জমিয়ে ফিরে আসো। তখন আমাকে বিয়ে করতে পারবে।”
মুসাফির ইবনে আবি আমর তার প্রিয়তমার কথামতো চলে গেলেন হীরার রাজা আন-নুমান ইবনে আল-মুনজিরের কাছে। সেখানে গিয়ে চাকরি নিলেন। অপেক্ষার প্রহর গুনছেন কবে তার সম্পদ হবে, কবে ফিরে গিয়ে মক্কার সবচেয়ে সুন্দরী নারীকে বিয়ে করবেন।
বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে তো সময় লাগে। এরমধ্যে মেয়ের মা-বাবা কোনো বিসিএস ক্যাডার পাত্র পেয়ে গেলে তার হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দেন। প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে মেয়ে বেশিদিন বিয়ে না করে থাকতে পারে না। একসময় মা বাবার কথা মেনে নেয়। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়। হিন্দ বিনতে উতবার ক্ষেত্রেও তেমনটি হয়।
তার প্রেমিক যখন হীরার রাজার অধীনে চাকরি করছেন, তখন বাবার চাপাচাপিতে তিনি বিয়ের পিড়িতে বসেন। [৩] তাকে বিয়ে করেন কুরাইশ যুবক আল-ফাকিহ ইবনুল মুগীরা আল মাখযূমী। আল-ফাকিহ ইবনুল মুগীরা ছিলেন কুরাইশদের মধ্যে অন্যতম ধনকুবের। তার একটি বাগানবাড়ি ছিলো। এটি ছিলো মুসাফিরখানা, গেস্টহাউজ। বাইরের লোকজন যেকোনো সময় এখানে এসে বিশ্রাম নিতে পারতো।
একদিন আল-ফাকিহ তার স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাকে নিয়ে সেই বাগানবাড়িতে দুপুরে বিশ্রাম নেন। একসময় স্ত্রীকে নিদ্রাবস্থায় রেখে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে যান, সেই বাড়িতে হিন্দ একা থাকেন।
বাড়িটি ছিলো সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ যেকোনো সময় এই বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারতো। দুপুরবেলা এক আগন্তুক আল-ফাকিহের সেই বাগান বাড়িতে যায় বিশ্রাম নিতে। সেখানে গিয়ে একজন নারীকে ঘুমাতে দেখে সে ফিরে আসে। লোকটি যখন বাড়ি থেকে ফিরছে, রাস্তার সামনে দেখা হয়ে যায় আল-ফাকিহের সাথে।
আল-ফাকিহর মনে সন্দেহ তৈরি হলো! তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেই তার বাড়িতে একা এক পুরুষ প্রবেশ করলো, আবার চুপিচুপি চলেও যাচ্ছে, ব্যাপার কী?
তিনি সোজা চলে গেলেন স্ত্রীর কাছে। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, “লোকটি কে?”
হিন্দ বিনতে উতবা বেশ অবাক হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কোন লোক? কার কথা বলছো?”
“একটু আগে যেই লোক তোমার রুম থেকে চলে গেলো। কে সে? তার সাথে তোমার কী সম্পর্ক?”
হিন্দ বিনতে উতবা কিছুই বুঝতে পারেননি। যখন তিনি বুঝতে পারলেন তার স্বামী তাকে সন্দেহ করছেন, তার ওপর অপবাদ চাপাচ্ছেন, তখন তিনি বেশ আহত হলেন। আল-ফাকিহ হিন্দকে তালাক দিলেন। হিন্দ চলে গেলেন তার বাপের বাড়ি।
গুজব বাতাসের চেয়ে দ্রুতগামী। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ইফকের ঘটনায় যেমনটা দেখা যায়। হিন্দ বিনতে উতবার মতো সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়েকে নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়লো পুরো শহরে। উতবা ইবনে রাবীয়ার কাছে এটা প্রেস্টিজের প্রশ্ন। একজন এমপিতূল্য ব্যক্তির মেয়ে যদি এমন কাজ করে, তিনি সমাজে মুখ দেখাবেন কিভাবে?
উতবা গোপনে মেয়েকে ডেকে নিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বলো তো মা, এগুলো সত্য কিনা? যদি সত্য হয় তাহলে গুপ্তঘাতক দিয়ে আমি আল-ফাকিহকে হত্যা করবো? তোমার ওপর যে দুর্নাম রটানো হয়েছে, আমি তা বন্ধ করবো। আর যদি তা মিথ্যা হয়, তাহলে ইয়েমেনের বিখ্যাত ভবিষ্যৎদ্বক্তার কাছে বিচার নিয়ে যাবো।”
হিন্দ বিনতে উতবা তার বাবাকে জানালেন, “আব্বা, সে মিথ্যাবাদী।”
বর্তমান সময়ে পুলিশরা সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের জন্য ‘পলিগ্রাফ টেস্ট’ করে। এটার আরেক নাম ‘লাই ডিটেক্টর’। এসব কেইসে মেডিকেল টেস্ট করানো হয়। জাহেলী যুগে সত্য-মিথ্যা নির্ণয় বা কোনো কিছুর সমাধানে পৌঁছার জন্য জৌতিষির কাছে যাওয়া হতো। বিখ্যাত যমযম কূপের মীমাংসার সময় সবাই গণকের কাছে যায়।
ইসলামে এগুলোকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“যে গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, তাহলে সে অবশ্যই মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর অবতীর্ণ জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো।” [৪]
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়ে দেন, গণকের কাছে গিয়ে তাকে কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে চল্লিশ দিন তার কোনো নামাজ কবুল হবে না। [৫]
আধুনিক যুগে জৌতিষি আমাদের হাতের মুঠোয়। পত্রিকার পাতায় আমরা ‘রাশিফল’ নামে একটি পাতা দেখতে পাই। অনেকেই খুব আগ্রহ নিয়ে এগুলো পড়েন। দিনটা কেমন কাটবে দেখতে চান। আবার ফেসবুকে কিছু সাইট আছে যেগুলোতে মানুষ মজা নেবার জন্য ঢুকে। সেখানে বলে দেয়া হয়- ২০২৫ সালে আপনি কতো টাকার মালিক হবেন? আপনি কোন জেলায় বিয়ে করবেন? ইত্যাদি। এসব ব্যাপারে মুমিনের সচেতনতা কাম্য।
উতবা ইবনে রাবীয়া তার জামাইয়ের কাছে গেলেন। তাকে গিয়ে বললেন, “আমার মেয়ের ওপর যে অপবাদ রটানো হচ্ছে এটার একটা বিহিত করা দরকার। আসো, ইয়েমেনের গণকের কাছে যাই। তিনি ফয়সালা করবেন।”
আল-ফাকিহ রাজি হলেন। ছেলেপক্ষ এবং মেয়েপক্ষ দুইদল নারী-পুরুষ নিয়ে ছুটলেন ইয়েমেনের গণকের কাছে। গণকের ফয়সালা উভয়পক্ষ মেনে নিবেন।
হিন্দ বিনতে উতবার মনে ভয় কাজ করছে। গণকও তো একজন মানুষ। সে সত্য বলতে পারে, আবার মিথ্যাও বলতে পারে। যদি সে মিথ্যা বলে, তাহলে সারাজীবন তাকে মিথ্যার অভিযোগ বহন করতে হবে। সবাই তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। হিন্দ তার বাবাকে নিজের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করলেন। উতবা ইবনে রাবীয়া নিজেও উদ্বিগ্ন।
গণকের সামনে মেয়েরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো। গণক একেকজন মেয়ের মাথায় হাত রেখে অতীত-ভবিষ্যৎ বলতে লাগলেন।
গণকরা এই কাজ কিভাবে করে? তারা কিভাবে মানুষের অতীত-ভবিষ্যৎ বলতে পারে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন তাঁর সাহাবীদেরকে ব্যাপারটি খুলে বলেন। তিনি বলেন:
“ফেরেশতামণ্ডলী মেঘমালার আড়ালে অবতরণ করেন এবং আকাশের ফয়সালাসমূহ আলোচনা করেন। তখন শয়তানরা তা চুরি করে শুনার চেষ্টা করে এবং তাঁর কিছু অংশ শুনেও ফেলে। অতঃপর তারা সেটা গণকের নিকট পৌঁছে দেয় এবং গণকরা সেই শুনা কথার সাথে নিজেদের আরো শতো মিথ্যা মিলিয়ে বলে থাকে।” [৬]
গণকদের কথার মধ্যে কিছু সত্যতা থাকে। এটা কিভাবে হয় সেটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে জানিয়ে দেবার পাশাপাশি গণকদের ব্যাপারে সতর্ক করে দেন।
ইয়েমেনের গণক হিন্দ বিনতে উতবার মাথায় হাত রাখলেন। হিন্দ তখন বেশ উদ্বিগ্ন। গণকের কথার ওপর তার বাকি জীবন নির্ভর করছে। গণকের কথা যদি সত্য হয়, তিনি সম্মানের সাথে সারাজীবন কাটাবেন। গণক যদি মিথ্যা কথা বলে? অভিযোগের বোঝা মাথায় নিয়ে সারাজীবন কাটাতে হবে।
গণক বললেন, “যাও, তুমি কোনো অশ্লীল কাজ করোনি এবং তুমি ব্যভিচারিণীও নও।”
এই বাক্য শুনে হিন্দের চোখে আনন্দশ্রু। তারা পরিবার আনন্দে উদ্বেলিত। ব্যভিচারের যে অপবাদ স্বামীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন, সেটা থেকে মুক্তি লাভ করেন হিন্দ বিনতে উতবা।
গণক তাকে কলঙ্কমুক্ত ঘোষণার পাশাপাশি তার ব্যাপারে একটি ভবিষ্যৎবাণী করেন। এই ভবিষ্যৎবাণী শুনে আরব থেকে যারা এসেছিলো, সবার চক্ষু চড়কগাছ!
আরবে তখন কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ছিলো না। আরবে কোনো রাজা-বাদশাহ ছিলো না। আরব ছিলো গোত্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। তাদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা নেই। রোমান সম্রাট, পারস্যের সম্রাটের মতো আরবে কোনো ‘আরব সম্রাট’ ছিলো না।
যেই সমাজে কোনো রাজা-বাদশাহ নেই, সেই সমাজের একজন মেয়েকে গণক বললেন, “ভবিষ্যতে তুমি একজন বাদশাহর জন্ম দিবে!” [৭]
হিন্দ বিনতে উতবা দুই মিনিটের মধ্যে দুটো সুসংবাদ পেলেন। তার কাছে কোন সুসংবাদ সবচেয়ে আনন্দের? তিনি নিষ্কলুষ, ব্যাভিচারিণী নন এটা নাকি তিনি ভবিষ্যতে বাদশাহর মা হবেন এটা? হিন্দ বিনতে উতবার মনে হয়তো তখন এই চিন্তা খেলা করছিলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন কেউ একজন তার হাত ধরেছে। তাকিয়ে দেখলেন তার প্রাক্তন স্বামী আল-ফাকিহ। আল-ফাকিহ নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তিনি অনুতপ্ত। তিনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চান। আবার আগের মতো সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে চান। আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারীকে স্ত্রী হিশেবে পেয়ে যেমন আনন্দিত হয়েছিলেন, তাকে মিথ্যা অপবাদ দেয়ায় অনেক খারাপ লাগছে।
আল-ফাকিহ ভেবেছিলেন স্ত্রী তাকে মেনে নিবে। স্বামী হিশেবে একটু-আধটু ভুল করতেই পারেন। কিন্তু, না। একজন মেয়ে সবকিছু সহ্য করতে পারে, কিন্তু তার চরিত্র নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিলে সে সহ্য করবে না। হোক সেই লোকটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী, সবচেয়ে ক্ষমতাধর। হিন্দ বিনতে উতবা তার স্বামীকে ক্ষমা করতে পারেননি। তিনি স্বামীর হাতে সজোরে টান দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেন।
একটু দূরে সরে গিয়ে বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি চাই না তোমার ঔরসে আমার গর্ভে সেই সন্তান জন্ম হোক, যে বাদশাহ হবে। আমি বাদশাহর মা হলেও আমি চাই না বাদশাহর বাবা তুমি হও!”
হিন্দ বিনতে উতবা বাপের বাড়ি ফিরে যান। তিনি আর তার প্রাক্তন স্বামীর কাছে গেলেন না। একে তো তিনি আরবের সুন্দরী নারী, তারওপর গণকের কথা সত্যি হলে তিনি হবেন ভবিষ্যতে বাদশাহর মা। তাকে বিয়ে করার জন্য আরব যুবকরা উঠেপড়ে লাগে। প্রতিদিন তার বাবার কাছে প্রস্তাব আসে। যারা ইতোমধ্যে দুই-একটি বিয়ে করেছেন, তারাও হিন্দকে বিয়ে করতে চায়।
হিন্দ ভালোবাসতেন একজনকে, বিয়ে করেন আরেকজনকে। ঐ বিয়েতে তার নিজের মতে হয়নি, বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করেন। এবার হিন্দ বাবাকে জানিয়ে দিলেন, “আব্বা, আমার কোনো মতামত ছাড়াই তোমরা আমাকে ঐ লোকের সাথে বিয়ে দিয়েছো। তারপর যা হবার তাই হলো। এবার কিন্তু এমনটা করো না। পাত্রের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য আমার কাছে ভালোভাবে না বলে আমাকে বিয়ে দিও না।” [৮]
উতবা ইবনে রাবীয়ার কাছে তখন দুটো ভালো প্রস্তাব আসে। একটি আসে সুহাইল ইবনে আমরের পক্ষ থেকে, আরেকটি আসে আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারবের পক্ষ থেকে। দুজনই উচ্চবংশের। উতবা ইবনে রাবীয়া মেয়ের কাছে দুই পাত্রের অবস্থা তুলে ধরেন কবিতার মাধ্যমে।
হিন্দ বিনতে উতবা দুই পাত্রের বিবরণ শুনে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করলেন। অতঃপর স্বামী হিশেবে নির্বাচন করলেন আবু সুফিয়ান সাখর ইবনে হারবকে। আবু সুফিয়ান বিয়ে করেন তৎকালীন আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারী হিন্দ বিনতে উতবাকে, গণকের মতে যিনি কিনা ভবিষ্যতে একজন বাদশাহর মা হবেন।
আবু সুফিয়ান হিন্দকে বিয়ে করার আগে ইতোমধ্যে দুটো বিয়ে করেন। সাফিয়্যা বিনতে আবিল আ’স ছিলেন তার প্রথম স্ত্রী। এই স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেন উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহা; যাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে করেন। রাসূলের স্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোহরানা ছিলো উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহার। এই বিয়ের ঘটক ছিলেন নাজ্জাশী। রাসূলের পক্ষে বিয়ের মোহরানা পরিশোধ করেন আবিসিনিয়ার বাদশাহ।
আবু সুফিয়ানের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন যাইনাব বিনতে নওফেল। তার গর্ভে জন্ম নেন বিখ্যাত সাহাবী ইয়াযিদ ইবনে আবি সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু।
আরবের সুন্দরী নারী হিন্দ ছিলেন আবু সুফিয়ানের তৃতীয় স্ত্রী। হিন্দকে বিয়ের পরও আবু সুফিয়ান পরবর্তীতে আরো তিনটি বিয়ে করেন। তার অন্যান্য স্ত্রীরা ছিলেন- সাফিয়্যা বিনতে আবি আমর, লুবাবা বিনতে আবিল আ’স এবং আতিকা বিনতে আবি উযাইর।
সুহাইল ইবনে আমর আরবের সুন্দরী নারীকে বিয়ে করতে না পেরে কষ্ট পান। তার কষ্টের কথা প্রকাশ করেন কবিতায়। সেই কবিতায় তিনি হিন্দের স্বামী আবু সুফিয়ানকে খোঁচা দেন। আবু সুফিয়ানও পাল্টা কবিতা লিখে সুহাইল ইবনে আমরের কবিতার জবাব দেন। [৯]
হিন্দ বিনতে উতবা প্রায়ই একটি স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্নে দেখতেন তিনি অনন্তকাল ধরে রোদে দাঁড়িয়ে আছেন। ছায়া তার নিকটেই ছিলো, কিন্তু তিনি ছায়ার কাছে যেতে সক্ষম ছিলেন না। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসলেন, তিনি দেখতে পেলেন সেই ছায়ায় তিনি প্রবেশ করতে পারছেন। [১০]
এই স্বপ্নের মানে হলো তিনি ইসলাম গ্রহণের সুযোগ খুব কাছ থেকে পেয়েও ইসলাম গ্রহণ করতে পারেননি। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় করলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার স্বপ্ন ছিলো তার ইসলাম গ্রহণের ইঙ্গিত। উহুদ যুদ্ধে যিনি রাসূলের চাচার হত্যার পেছনে ভূমিকা রাখেন, হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুর দেহ টুকরো টুকরো করেন, মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পূর্বের সব অপরাধ ক্ষমা করে দেন।
আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হিন্দ বিনতে উতবা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে মোট চারজন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। দুজন মেয়ে, দুজন ছেলে। গণকের ভবিষ্যৎবাণী সত্য হয়। হিন্দের গর্ভে একজন বাদশাহ জন্মগ্রহণ করেন। মুসলিম ইতিহাসের প্রথম বাদশাহ মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু।
মো: বাসেদ আলী প্রঃ শিঃ
বাঁকরইল বহুমুখী উ/বি,পত্নীতলা নওগাঁ।

Categories