জাতীয়করণ : আমাদের অবস্থান কোথায়?

প্রকাশিত: ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২০

এ টি এম আশরাফুল ইসলাম সরকার রাংগা।

যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে জাতি আজ বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারাই আজ বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় অবহেলিত। শত আকুতি-মিনতি করেও তাদের ন্যায্য অধিকারগুলো আদায় করতে পারছে না। জাতি গড়ার কারিগর এই শিক্ষকরা সামাজিক ভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেও পারছেনা। হরেক রকম সামাজিক সমস্যার সাথে লড়াই করতে হচ্ছে এই বেসরকারী শিক্ষক সমাজকে। পেটে ক্ষিধে, আর ব্যাংকের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যারা শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষিত ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, তারাই আজ নিবু নিবু দ্বীপ শিখা হয়ে বাতাসে জাতীয়করণের ঝাপটার সাথে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের তো দাবী একটাই, ‘জাতীয়করণ’। কেন যে এটা বার বার উল্টো পথে ঘুরে যাচ্ছে? এমন একটি প্রশ্ন করারও যেন কেউ নেই। অথচ এটাই সত্যি যে, এই জাতীয়করণ করা ছাড়া শিক্ষায় উন্নতি খুব একটা সম্ভব নয়। তাই জাতির দুর্দিনে যারা নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন সবসময়, তাদের সঠিক মর্যাদা দিয়ে, সকল বৈষম্য নিরসন করে বেসরকারী সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারীকরণ করা হোক, এটাই শিক্ষক সমাজের দাবী।

আমাদের দাবীগুলো কিন্তু অমূলক বা অযৌক্তিক নয়। এতে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতিও সাধন হবেনা। উপরন্তু রাজকোষে প্রাপ্তি যোগ হতে পারে। আমরা বৈষম্যপ্রথার বিলোপ চাচ্ছি মাত্র। কিন্তু বার বার আমরা কেন পরাজিত হচ্ছি? কেন আমাদের দাবীগুলো খড়-কুটোর মত উড়িয়ে যাচ্ছে? আমাদের সমস্ত কষ্টমাখা দাবীগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষ অব্দি পৌঁচাচ্ছে তো? আমার কেমন যেন খটকা লাগে।

আমার মনে হয়, বেসরকারী শিক্ষক আন্দোলনের  ক্ষেত্রে আমাদের মাঝে এমন কিছু শিক্ষক মহোদয় আছেন, যাঁরা এ সবের কোন ঝুঁকিতেই নেই। তাঁদের ভাবটা খানিকটা এরকম-

আমি কেন অযথা ঝামেলায় জড়াতে যাব? জাতীয়করণ হলে সবারটা এক সাথেই হবে। আর সবারটা হলে আমারটাও হবে। আমারটা কি আর বাদ দিয়ে অন্যদের ঘোষণা দিতে পারবে!

কষ্ট পাই। আবার শুনলে কথা হাসিও পায়, ওনারা আবার জাতীয়করণও চায়!!!

আমি যখন একটা নন-এমপিওভুক্ত কলেজে প্রভাষণা করতাম, তখন কেবলমাত্র অফিসকে ঘিরেই সবাই মিলে এমপিওর চিন্তা-ভাবনার নানাবিধ সিদ্ধান্ত নিতাম আর ক্ষোভে ফেটে পড়তাম। কিন্তু দু:খজনক হলো- এটা অফিস পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষের কান অব্দি আর পৌঁছেনা। শুধুমাত্র ঐ চেয়ারটাই আমাদের কথাগুলোর সাক্ষী হয়ে থাকত যে কিনা নির্বাক আর নিষ্প্রাণ। যার কোনো কথা বলা বা শোনার ক্ষমতা নেই। কাজেই শুধুমাত্র জড় পদার্থের ঐ চেয়ারটাকে বলে লাভ নেই, বলতে হবে চেয়ারম্যানকে। এই ব্যর্থতাই হয়ত ডিমোশন দিয়ে কলেজ থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে এসেছে।

আজ আমরা স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে কথা বলছি; স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করছি কেন; এ বিষয়টা সবার জানা। আমরা এক ছিলাম বিধায় ভাষার দাবী আদায় হয়েছে, স্বাধীনতাও পেয়েছি। কারণ, এমন একজন নেতা এর নেতৃত্বে ছিলেন, যার নির্লোভ আর নি:স্বার্থ আপোষহীন নির্দেশনায় সকল বাঙালি এক হতে পেরেছিল। যিনি শত অত্যাচারে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু বাঙালির মায়া ত্যাগ করতে পারেন নি। তিনি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জানি ওনার মত নেতা বাংলাদেশ আর পাবেনা। তবে ওনার নেতৃত্বের গুণাবলী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নেতার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। বর্তমানে বেসরকারী শিক্ষকদের এমনি এক নেতার দরকার।

আমার আরও কেন জানি মনে হয়, বে-সরকারী শিক্ষকদের যে সংগঠনটি আছে তা চলছে নির্জীব নেতৃত্বে; কিছুটা সাংঘর্ষিক মতাদর্শে । সরকারীকরণের কৃতিত্ব আদায়ের পাশা খেলায় সবাই নম্বর কুড়াতে ব্যস্ত আছেন। আজকেই জাতীয়করণের ঘোষণা আসুক, দেখবেন বুক ফুলিয়ে অনেকেই বলতে পারেন-

আমি যদি অমুক কাজটা এভাবে না করতাম, তাহলে কখনই এটা সম্ভব হতনা।

আবার, আমাদের শিক্ষকদের মাঝেও এমন কেউ কেউ আছি, যারা নেতাকে মানতেই চাইনা। একটু কিছু হলেই তাকে তুলো-ধুনো করে ছেড়ে দেই। ফলে, নেতা অণুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেন। হতাশা আর বিষন্নতায় নেতৃত্বের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেন। এক সময় বলে উঠেন-

কি হয় হোক! আমি আর নেই। আমি কেন অন্যের চক্ষুশূল হতে যাবো।

এতে করে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। আমরা এমন চাইনা। বরং আমি মনে করি, জাতীয়করণের দাবী কার্যকর করা হলে সেটা হবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। প্রত্যেকটা কাজে একজন দক্ষ নেতার নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। আমাদেরও প্রয়োজন। কিন্তু আমরা কি পেরেছি আমার যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে আমাদের জাত-ভাইদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে? এ বিষয়টিও আমাকে গভীরভাবে ভাবতে হবে; না ভাবলে ভেবে দেখতে হবে। কারণ, সময় অনেক কম; তাই সময় শুধু ভাববার।

প্রসঙ্গত: এবারে একটু পেছনে ফিরে যাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেওয়া এক সিদ্ধান্তের ফলে সারাদেশের বেসরকারি প্রায় ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এক দশক আগে থেকে নামমাত্র উৎসব ভাতা পেয়ে আসছেন। এটা নিশ্চই আমাদের সবার জানা থাকার কথা। তারও আগে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকার থেকে কোনো উৎসব ভাতা-ই পেতেন না।

অবশেষে, ২০০৩ সালে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বছরের অক্টোবর থেকেই তা কার্যকর হয়। তখন সিদ্ধান্ত হয়, শিক্ষকদের দেওয়া হবে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। সেটা কী কায়দায় দেখুন। দুই ঈদে (অথবা পূজায়) ২৫ শতাংশ করে ভাগ করে তা দেওয়া হবে। সেই থেকে প্রতি ঈদে শিক্ষকরা ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা পান। আর কর্মচারীদের জন্য ওই সভায় শতভাগ বোনাস দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়। দুই ঈদে ৫০ শতাংশ করে তা ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। এটাও কিন্তু দাবী আদায়ের ফসল ছিল।

দয়া করে একটু ভেবে দেখুন, আমরা যদি শিক্ষা ব্যবস্থা  জাতীয়করণে একসাথে একই রকম পদক্ষেপ নিই, তাহলে বৈষম্য তো থাকবেই না, বরং যারা সুযোগ বুঝে বিভিন্ন আন্দোলন করছেন তাদের আন্দোলনের সুযোগ থাকবে না। শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবীতে আমরা সুশৃঙ্খল ও যৌক্তিকভাবে আন্দোলন করে যাব।, কেননা একই বই, একই সিলেবাস, একই কাজ করে পারিশ্রমিকের বেলায় কেন এত বৈষম্যের স্বীকার হব আমরা? বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি তথা শিক্ষা জাতীয়করণ তাই এখন সময়ের দাবি। তাই দলমত নির্বিশেষে শিক্ষকদের অধিকারগুলো বুঝিয়ে দিলে জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আসবে এবং জাতি লাভবান হবে; অন্যদিকে শিক্ষার আলোরও প্রসার ঘটবে। তাই আমরা মনে করি, শিক্ষাবান্ধব এই সরকারের একটু স্নেহসিক্ত কৃপা দৃষ্টি আর আন্তরিক সদিচ্ছাই পারে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে। কারণ, সমগ্র শিক্ষক সমাজ আজ তাকিয়ে আছে জাতীয়করণ বাস্তবায়নের দিকে। মুজিব বর্ষেই আসুক এমন একটি ঘোষণা। ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাক ১৯২০ সালের সাথে ২০২০ সালটিও।

পরিশেষে আন্দোলনকারী নেতৃস্থানীয় সম্মানিত স্যারদের জন্য বরাবরের মত আজও একটা ছোট্ট গল্প দিয়েই শেষ করছি-

বাবা প্রচন্ড অসুস্থ। সন্তানেরা তার জীবদ্দশায় সম্পদ ভাগাভাগীর কথা চিন্তা করে বাবাকে বিভিন্ন কৌশলে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাবা সব বুঝলেও ঐ কথাটি কিছুতেই যেন বোঝেন না। হাজার চেষ্টা করেও তাকে বোঝানো গেল না।

অবশেষে একদিন বাবা তার সকল সন্তানকে কাছে ডেকে নিলেন। সন্তানেরা বুকভরা আশা আর আনন্দ নিয়ে অসুস্থ বাবার শয্যাপাশের চারিপাশ ঘিরে বসলেন। কেউ মাথা টিপে দিচ্ছেন, কেউ পা টিপে দিচ্ছেন, কেউবা বাবার প্রিয় খাবারের খোঁজ-খবর নিয়ে তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন। একটা সুন্দর প্রাণ-চাঞ্চল্য এক নতুন পরিবেশ সৃষ্টি হলো।

এরই মাঝে বাবা সকলকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন

– তোমরা সবাই এসেছ।

তারপর চারপাশ তাকিয়ে দেখলেন।

– দেখ, অবশেষে আমি অনেক চেষ্টায় একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি।

সন্তানেরা এক সমুদ্র আশা নিয়ে বাবার দিকে ঝুঁকে পড়ে এক এক করে সবাই বলতে লাগলেন

– বাবা, তুমি বুঝতে পেরেছ! হ্যাঁ বাবা। এবার বলো। প্লিজ বাবা, বলে দাও।

বাবা অনেক্ষণ পর উত্তর করলেন

– আমি যে কিছুই বুঝিনি; এটাই আমি বুঝতে পেরেছি।

সন্তানেরা রাগে ঘৃণায় বিড় বিড় করে বাবাকে গালি দিতে লাগল। এরপর যা হবার, তাই হয়ে গেল।

শিক্ষকদের বেলায় যেন এরকম কোনো দৃশ্যের অবতারণা না হয়!!!

 


Categories