জাতীয়করণ আন্দোলন এবং শিক্ষক নেতৃত্ব”

প্রকাশিত: ১২:৩০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এ বাক্যটির সাথে সকলেই কম-বেশি পরিচিত। একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান সোপান হচ্ছে সে দেশের শিক্ষা। আর শিক্ষার মেরুদন্ড ও এর নিপুণ শিল্পী( কারিগর) হচ্ছেন শিক্ষক। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ ক্ষমতায় এসে প্রথমেই এদেশের সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে নেন। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের কোন ভূমিকা ছিল বলে মনে হয় না। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া আদায় করার জন্য অনেক সংগঠন সৃস্টি হলেও যারা এ-সব সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন, তারা আন্দোলনের চরম পর্যায়ে এসে তাদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছেন এবং আন্দোলন স্থগিত করে দিয়েছেন, আর শিক্ষক সমাজ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিতই থেকে গেছেন। যুগ যুগ ধরে শিক্ষক আন্দোলনের এ চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের জন্য শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবী জোড়ালো আকার ধারণ করলেও, সুদক্ষ ও সৎ শিক্ষক নেতৃত্বের অভাবে শিক্ষকদের সে আন্দোলন আলোর মুখ দেখছে না। এ সুযোগে অনেক ভুঁইফোঁড় শিক্ষক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে কিছু শিক্ষক নামধারী বুর্জুয়া সে সংগঠন গুলোর নেতৃত্বে আসেন এবং তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করার ধান্দাই নিমগ্ন থাকেন। তারা সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সরকারের সাথে আতাত করে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন। সাধারণ শিক্ষকদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষক আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এ চিত্রই দেখা যায়। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি কামরুজ্জামান গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান ও হেনা দাস। সেখানে কামরুজ্জামান স্যার এমপি নমিনেশন ভাগিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষকদের ব্যবহার করেছেন। শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতা অধ্যক্ষ শরীফুল ইসলাম কল্যাণ তহবিলের সচিবের দায়িত্ব নিয়ে আন্দোলন ছেড়ে দেন, তারই ধারাবাহিকতায় অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, চৌধুরী মুগিসউদ্দিন একই কাজ করেন। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি আউয়াল সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত কুমার সাহা অবসর ও কল্যাণ তহবিলের সদস্য নিযুক্ত হয়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেন। তাদের সংগঠনের বর্তমান নেতৃবৃন্দ অতিরিক্ত ৪% কর্তনের সভায় উপস্থিত থকে তাতে স্বাক্ষর করে সভার সম্মানী ভাতা গ্হণ করেন। অন্যদিকে শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যফ্রন্টের নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ শিক্ষক আন্দোলনের সুফল হিসেবে ভাগিয়ে নেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের মত লাভজনক পদ। বর্তমানেও বাংলাদেশে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে, কিন্তু কোন সুফল আসছে না সঠিক নেতৃত্বের অভাবে। অধ্যক্ষ শাজাহান আলম সাজু স্বাশিপ নামের সংগঠনের কল্যাণে, শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ তহবিলের সচিবের দায়িত্ব নিয়ে বসে আছেন দীর্ঘদিন যাবৎ এবং নিজের কল্যাণে ব্যস্ত আছেন। তার কিছু কেনা গোলামকে দিয়ে আরোও কিছু নতুন সংগঠন তৈরী করিয়েছেন যাতে করে উক্ত সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তার উত্তরসূরী হিসেবে ভবিষ্যতে তাঁর স্থানে অধিষ্ঠিত করাইতে পারেন। উক্ত সংগঠনের কয়েকজন নেতা অলরেডি এখনই কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য হিসেবে নিয়োজিত আছেন। এ সকল শিক্ষক নেতাদের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে বলে মনে হচ্ছে না। অনেক আশা-ভরসা নিয়ে, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, মেধাবী যুব সমাজ শিক্ষকতায় এসে হতাশার মধ্যে পড়ে যান। বাধ্য হয়ে তাঁরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য জাতীয়করণ আন্দোলনে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, কিন্তু এখানেও সঠিক শিক্ষক নেতৃত্বের অভাবে আবারও তাঁরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যান। এত অন্ধকারের মাঝেও আশার আলোর ঝলকানির মতো বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম শিক্ষকদের মনে সামান্যতম দাগ কাটতে পেরেছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। ২০১৯ সালে প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচীর মাধ্যমে ৫% ইনক্রিমেন্ট ও ২০% বৈশাখী ভাতা আদায় করা সম্ভব হলেও আবারো সাজু সাহেবের হিংসার রোষানলে পড়তে হলো শিক্ষকদেরকে। কোন প্রকার বাড়তি সুযোগ সুবিধা ছাড়াই সেখান থেকে অতিরিক্ত ৪% কর্তন করে নিয়ে নেন কল্যাণ ও অবসর তহবিলের নামে। বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম একমাত্র সংগঠন যেখানে নেতৃত্বে থাকেন সাধারণ শিক্ষক, এ সংগঠনে অবসরপ্রাপ্ত কোন শিক্ষক নেতৃত্বে থাকতে পারেননা। আমি একজন শিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশের সমগ্র বেসরকারি শিক্ষক সমাজকে অনুরোধ করবো, আসুন আমাদের অধিকার আদায়ে সকল মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে, দালালদের বয়কট করে এক পতাকা তলে ঐক্য বদ্ধ হয়ে সংগঠিত হই এবং আমাদের প্রাণের দাবী জাতীয়করণ সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করি।
উল্লেখ্য যে, বর্তমান সরকারের আমলে ২০১৩ সালে দেশের সমস্ত রেজিস্ট্রার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সকল মতপার্থক্য ও ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক মঞ্চে, এক প্লাটফর্মে উঠে জাতীয়করণ আন্দোলনের ডাক দেন। উক্ত আন্দোলনের ফলে সরকার তাদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়ে সমস্ত রেজিস্ট্রার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে নেন।

লেখকঃ
মোহাম্মদ ফজলুল হক ফকির,
প্রধান শিক্ষক
রায়পুরা আর.কে.আর.এম উচ্চ বিদ্যালয়,
রায়পুরা, নরসিংদী।
এবং
সহসভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম,
কেন্দ্রীয় কমিটি।