“গ্রাম্য চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিষয়ক অধ্যয়ন” মিঞা মোঃ এলাহি।

প্রকাশিত: ১২:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

চিকিৎসা মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। বাংলাদেশে জণসংখ্যার অনুপাতে সনদপ্রাপ্ত উপযুক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। তাই উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা পাওয়া একদিকে যেমন দুর্লভ অন্যদিকে তেমন ব্যয়বহুলও। দারিদ্র্য ও জীবন যাত্রার নিম্নমানের কারণে বাংলাদেশের মানুষের অসুখ বিসুখও হয় বেশি। এ অবস্থায় দেশের প্রান্তিক তথা নিম্ন আয়ের মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সনদবিহীন অল্প শিক্ষিত গ্রাম্য চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হয়ে থাকে।

কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষ  ঝার – ফোঁক , তাবিজ – কবজ  এমন কি বিপদজনক আজগুবি চিকিৎসা পদ্ধতিও গ্রহন করে থাকে – যা মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে স্বল্প শিক্ষিত গ্রাম্য চিকিৎসকগণ এ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে তা স্বীকার করতেই হবে। যদিও তাদের বেলায়ও কিছু কিছু অঘটন ঘটতে দেখা যায়। তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার আলোকে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। তাদের সেবাদানের আর একটি দিক হল এই যে, তারা রোগের লক্ষণ দেখে রোগীর চিকিৎসা করে থাকেন। উপযুক্ত শিক্ষা নেই বলে সরকার যদি তাদের চিকিৎসাসেবার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তাহলে দেশ আরও বেশি ক্ষতি বা বিপদের সম্মুখীন হবে। এমতাবস্থায় গ্রাম্য চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ধরনের চিকিৎসা বিষয়ক অধ্যয়ন / প্রশিক্ষণ এর ব্যবস্থা করা এবং অধ্যয়ন / প্রশিক্ষণ শেষে বিশেষ সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরী বলে মনে করি।

আমাদের দেশে চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়নের প্রথম সনদটি দেওয়া হয় এম,বি,বি,এস পাস করার পর। বিভিন্ন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় / কলেজগুলো সেখানে অধ্যয়নের আয়োজনে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় / কলেজে ভর্তি হয়ে অধ্যয়ন শেষ করে ডাক্তার হওয়া তো যার তার ভাগ্যে জুটে না। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা খুব কম সংখ্যক আসনের বিপরীতে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যায়। আবার অধিক সংখ্যক প্রার্থীদের চিকিৎসা বিষয়ে অধ্যয়নের সুগোগ করে দেওয়ার সামর্থও সরকারের বা আমাদের দেশে নেই। এ অবস্থায় চিকিৎস্যা সেবাকে সহজলভ্য করার জন্য বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য চিকিৎসা বিষয়ক অধ্যয়নকে আরও সহজলভ্য করার কোন বিকল্প নেই। এজন্যে দেশের প্রত্যেক জেলায় কমপক্ষে একটি করে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এসকল মেডিক্যাল কলেজগুলোর আকার আয়তন বা অবকাঠামোগত পরিসর খুব বড় না হলেও চলবে। লোকবলও কম হলেই চলবে। এসব মেডিক্যাল কলেজগুলোতে এক বা সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদে চিকিৎসা বিষয়ক পাঠদান কার্যক্রম চালাতে হবে। এইচ এস সি পাস করার পর জেলা ভিত্তিক ছাত্র ভর্তির উদ্যোগ নিতে হবে। ভর্তিচ্ছু প্রার্থীরা স্ব স্ব জেলায় ভর্তির জন্য আবেদন করবে। অধ্যয়ন শেষে শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়া হবে। তবে তাদের এই সনদের বলে তারা ঠিক কতটুকু পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন তা অবশ্যই পূর্ব থেকে নির্ধারিত থাকতে হবে। জটিল রোগ বা সার্জিক্যাল চিকিৎসায় তাদের কোন অনুমোদন থাকবে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে দেশে রোগীদের প্রায় শতকরা আশি ভাগই খুব সাধারণ রোগ-শোকে ভুগে। অথচ সঠিক চিকিৎসার অভাবে সাধারণ সমস্যাগুলো এক সময় জটিলতার দিকে গড়ায়।

অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষাকে আরও জীবনমূখী করে তোলার উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। তার জন্য প্রথমেই সাধারণ শিক্ষার পরিসর নির্ণয় করতে হবে। সবার আগে সাধারণ শিক্ষা জীবনের সাথে সম্পৃক্ত কি না সেটি নির্ণয় করা অতীব জরুরী। সাধারণ শিক্ষা জীবন ঘনিষ্ট বিষয় হয়ে থাকলে তাতে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য,পুষ্টি ও রোগ জিজ্ঞাসার মত বিষয়গুলোকে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্ত করে নিতে হবে। এ উদ্দেশ্যে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, রোগ জিজ্ঞাসার মত বিষয়গুলো নিয়ে অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে ১০০ নম্বরের উপর শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

একটি অবাক করার মত বিষয় হল, অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষের মধ্যে এখনও রোগ -শোক নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। তারা বোঝেই না যে জীবানু সংক্রমনের ফলেই রোগ হয়। তাদের অনেকেরই ধারনা রোগ-ব্যাধি হল আল্লাহর গজব। রোগ-ব্যাধি আল্লাহর গজব হলে তো কোন চিকিৎসা গ্রহনেরও  প্রয়োজনই থাকে না। সুতরাং গণমানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার যথেষ্ট পরিমান অভাব রয়েছে এ কথা স্বীকার করতেই হবে।

রোগ-ব্যাধি নিয়ে একটি প্রবাদ বাক্য আমরা সবাই জানি। আর তা হল -“প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম”। দেহে যাতে রোগ সংক্রমণ না ঘটে তার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করার কোন বিকল্প কি আছে? তাছাড়া, কোন কোন  ঔষধ দীর্ঘ মেয়াদে সেবন করার ফলে অনেক রকমের স্বাস্থ্য জটিলতা সৃষ্টি হয়। সুস্থ ও রোগমুক্ত জীবন যাপনের জন্য এসব বিষয়ে ছাত্র জীবনেই জ্ঞানার্জন করা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করি। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে সাধারণ শিক্ষায় স্বাস্থ্য বিষয়ক পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্তি সবার আগে প্রয়োজন।

প্রভাষক ও বিভাগীয় প্রধান (ইংরেজি)

আব্দুস সাত্তার ডিগ্রি কলেজ,

আরুয়াইল, সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।