“কোভিড ১৯ ও শিক্ষাসংকট” বিচিত্রা সেন

প্রকাশিত: ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০

চলছে করোনাকাল। পুরো বিশ্ব আজ স্থবির। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও আজ অনেকটা স্থবির। ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষিত হওয়ায় বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। ৩১ মে থেকে সাধারণ ছুটি তুলে নেওয়ায় বাংলাদেশের অফিস আদালত চালু হলেও দেশ এখনো পুরোপুরিভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরেনি। ফেরা সম্ভবও নয়, কেননা প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনার প্রতাপ। সেই সাথে বাড়ছে আক্রান্ত মানুষ এবং মৃত্যুর হার। তাই অর্থনৈতিকভাবে দেশ প্রবল হুমকির মুখে পড়বে জেনেও জীবনের ঝুঁকির কারণে অনেক কিছু স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না।


এই করোনাকালীন সংকটে সবচেয়ে হুমকির মুখে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। এ সংকট দেশে দেশে রকম ফের থাকলেও উপমহাদেশীয় দেশগুলোর অবস্থা প্রায় একই। চলতি বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলে গণদাবীর মুখে সরকারি সিদ্ধান্তে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সাধারণ ছুটি দফায় দফায় বাড়িয়ে ৬ আগস্ট পর্যন্ত করা হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে সরকার শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে কোনো ঝু্‌ঁকি নিতে চাইছে না। এটাই স্বাভাবিক, কারণ কোনো দেশের নতুন প্রজন্মই যদি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে,তবে সে দেশের ভবিষ্যতই শঙ্কায় পড়ে। তাই এ মুহূর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কথা ভাবাই যায় না। এমনও হতে পারে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে এ ছুটির মেয়াদ হয়তো আরও বাড়বে।
তবে দীর্ঘকালীন এ ছুটি আমাদের শিক্ষার্থীদের চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ক্ষতি একদিকে যেমন শিক্ষা সম্বন্ধীয়, অন্যদিকে তেমন মানসিক সমস্যাজনিত। আমরা জানি শিশু, কিশোর এবং তরুণ প্রজন্ম তাদের সমবয়সীদের সাথেই সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে। তারা তাদের বিভিন্ন আবেগ অনুভূতি সমবয়সী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে আনন্দ পায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সে সুযোগ অবারিত করে দেয়। যার ফলে শিশু থেকে তরুণ প্রজন্ম সবাই স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের মানসিক সত্তার বিকাশ ঘটাতে পারে। সেই সাথে খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের শারীরিক ভারসাম্যও বজায় রাখতে পারে। কিন্তু কোভিড ১৯ শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে গৃহবন্দি করে শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের আদেশে কিংবা কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্ব উদ্যোগী হয়ে শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে। এটা অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। কারণ দীর্ঘকালীন ছুটিতে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা থেকে দূরে চলে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই তাদেরকে বইমুখী করার জন্য এ উদ্যোগ যথাযথ।

তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের দেশে এ আয়োজন এখনো পর্যন্ত সবার জন্য হয়ে উঠতে পারেনি। প্রথমেই বলে রাখি এ আয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রাম এর বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা আমরা জানি। যাদের ঘরে বিদ্যুৎ নেই, তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম, যাদের ঘরে বিদ্যুৎ আছে তাদের অনেকেরই স্মার্ট ফোন নেই। তাছাড়া যেখানে নুন আনতে পানতা ফুরোয় অবস্থা, সেখানে মোবাইল ডাটা কেনা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং তাদের কাছে অনলাইন ক্লাস রূপকথার গল্প বটে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এর কথা বাদ দিলেও আমাদের গ্রামগঞ্জের অনেক শিক্ষার্থীর ঘরেই স্মার্ট ফোন নেই। আবার অনেক সময় স্মার্ট ফোন থাকলেও নিয়মিত মোবাইল ডাটা কিনে এত এত লেকচার দেখা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। গ্রামগঞ্জের কথা বাদ দিয়ে আমরা যদি বড় বড় শহরের কথায় আসি তাও অনলাইন ক্লাস করা সবার জন্য সহজলভ্য হচ্ছে না। বর্তমানে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। এরই মধ্যে অনেকের বেতন বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন। আবার কারো বা ছোট্ট একটি দোকান ছিল, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পুঁজি হারিয়ে তিনিও পথে বসেছেন। এমতাবস্থায় নিয়মিত মোবাইল ডাটা কিনে ছেলেমেয়েদের অনলাইন ক্লাস দেখার ব্যবস্থা করে দেওয়ার সামর্থ্য অনেক অভিভাবকই হারিয়ে ফেলেছেন। মোবাইল ডাটা কেনার কথা বার বার বলছি এ কারণেই যে, ছেলেমেয়ে এইচএসসি পাস না করা পর্যন্ত মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক অভিভাবকই বাসায় ওয়াইফাই সংযোগ নেন না। অথচ অনলাইন ক্লাস দেখতে গেলে ওয়াইফাই কিংবা মোবাইল ডাটা যে কোনো একটার সাহায্য লাগবেই। তাই অনলাইন ক্লাস এর উদ্যোগটা অত্যন্ত ভালো একটি উদ্যোগ হলেও কার্যত সবাই এর সুফল ভোগ করতে পারছে না।

আবার যারা অনলাইন ক্লাসের সুবিধা ভোগ করছে তাদের নিয়েও অভিভাবক মহল নতুন সংকটে পড়েছে। অনলাইন ক্লাসের অজুহাত দিয়ে তারা সারাক্ষণই মোবাইল হাতে বসে থাকছে। এই সুযোগে তারা ফেইসবুক, ইউটিউব, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপে মারাত্মক আসক্ত হয়ে পড়ছে। মোটকথা কোভিড ১৯ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মারাত্মক এক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। স্থগিত রয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। অথচ আমরা জানি এ পরীক্ষার রেজাল্টের ওপরই নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ শিক্ষা পরিকল্পনা। নভেম্বরে পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষা হতে পারবে কিনা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। এছাড়াও বাতিল হয়ে গেছে একাদশ শ্রেণির বর্ষ সমাপনী পরীক্ষাও। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে তাদের পরীক্ষা নিয়ে ফেললেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সব পরীক্ষা স্থগিত করেছে।

এ রকম একটি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে, তা আমাদের ভাবনারও বাইরে ছিল, কিন্তু অবস্থার গ্যাঁড়াকলে পড়ে করতে হচ্ছে। জানি না এ ভয়ংকর অনুজীব কবে আমাদের এ পৃথিবী ছেড়ে যাবে, কিংবা আদৌ যাবে কিনা। তবে আমরা আশাবাদী। আমরা স্বপ্ন দেখি মানুষের মেধার কাছে পরাজিত হবে কোভিড ১৯। আমরা আবার দেখবো দলে দলে শিক্ষার্থী সকালবেলা বেরিয়ে পড়েছে।তাদের কলকাকলিতে মুখরিত হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পবিত্র অঙ্গন। ছুটি শেষে হৈ চৈ করে তারা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ছে তাদের প্রিয় শিক্ষাঙ্গন থেকে। রাস্তাঘাটে আবার দেখা যাবে বিভিন্ন বয়সী ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের। ক্লাসরুমগুলো আবার জমে উঠবে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের জ্ঞান আদান-প্রদানে। ৭২% শিক্ষিতের দেশ বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ শিক্ষিতের দেশ হওয়ার দিকে। তার আগে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়। WHO নির্দেশিত সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে কোভিড ১৯ মোকাবেলায়। আতংকিত হয়ে নয়, তবে সতর্ক থাকতে হবে পরিপূর্ণভাবে। ২০২০ এ নিপাত যাক কোভিড ১৯। আমাদের শিক্ষার্থীরা আবার ফিরে পাক তাদের প্রাণপ্রিয় ক্যাম্পাস। আবারও প্রাতঃ সমাবেশে বাদ্যের তালে তালে জাতীয় সঙ্গীতের সুরে প্রকম্পিত হোক বাংলার আকাশবাতাস। শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখরিত হোক প্রিয় শিক্ষাঙ্গন।

লেখক : গল্পকার, প্রাবন্ধিক; সহকারী অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ।


Categories