করোনা পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তিত ধারণা-সাইদুল হাসান সেলিম

প্রকাশিত: ৯:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০২০

করোনা ভাইরাস প্রকোপ কমলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর আর আগের চিত্র থাকছে না। শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে একাধিক শিফট পরিচালনা এবং রোস্টার করে গ্রুপ ভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। সিলেবাস শেষ করা এবং শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট শ্রেণির যোগ্যতা অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে তবে তা নির্ভর করছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতামতের ওপর।

বিশ্বব্যাপী করোনার মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থা চাকা চলমান রাখতে এখন পন্থা হিসেবে অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষাই একমাত্র উপায়। ভয়াল কোভিড -১৯ শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে।
পৃথিবী জুড়ে প্রায় ১০০ কোটি শিক্ষার্থীর জীবন এই করোনা মহামারীর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত। যদিও এই ব্যাধি শিক্ষার যথেষ্ট ক্ষতি করেছে, আবার শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু ব্যবহারিক সুবিধাও এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষার সহজলভ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারিভাবে সংসদ টিভির মাধ্যমে কিছু অনলাইন ক্লাস নেয়া হলেও এক বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে অনলাইন সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে এটাও সত্যি যে যদি কোভিড-১৯ আমাদের যদি আক্রমণ না করত, তা হলে অনলাইন শিক্ষা একটা অলীক স্বপ্ন হয়েই থেকে যেত। করোনার আগমন অনলাইন শিক্ষার বৈপ্লবিক পরিবর্তনই এনে দিয়েছে।

করোনার প্রভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলো কী? কী?

১) এখন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে জুম/ওয়েবএক্স/স্কাইপ/ গুগল/হ্যাংআউটস/মাইক্রোসফট টিম/গোটুমিটিং সপ্টওয়ার ব্যবহার করে। শ্রেণিকক্ষে যেমনি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা একে অন্যকে দেখতে পায়, ঠিক তেমনি এই ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যারগুলির মাধ্যমে শিক্ষকগণ অনলাইনের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের দেখতে পান এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এখন শ্রেণি কার্যক্রম রেকর্ড করে সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতের জন্য এই পদ্ধতি একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক দলিল তৈরি হয়ে থাকে।

২) পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন/পিডিএফ/ ওয়েবসাইট লিংকে কাগজে লেখা প্রতিস্থাপন করে উপস্থাপন করা সহজ। অনলাইন মাধ্যমগুলোর সবচাইতে বড় সুবিধা হচ্ছে সহজে সংরক্ষণ করা যায়। তাই শিক্ষাদানের পরেও শিক্ষর্থীরা নিজেদের প্রয়োজনানুসারে অনলাইনের সাহায্য নিতে পারছে।

৩) কিছু কিছু ক্ষেত্রে হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নথি সংরক্ষণ করা যায়। এখানে কোন প্রকার কারচুপির সুযোগ নেই। এই নথি দরকার মতো প্রশাসনিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা সম্ভব।

৪) অনলাইনে শিক্ষার্থীদের নিকট রেকর্ডেট নথি আগেই পাঠিয়ে দেওয়া যায় শিক্ষার্থীরা ক্লাসের সময় শুধুমাত্র সমস্যা সমাধান করতে পারে। এতে প্রথা সর্বস্ব অগণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাদান পদ্ধতি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র বক্তৃতার মাধ্যমে পাঠদান করলেই শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না। একটি শ্রেণী কক্ষে ঘন্টাব্যাপী একপেশে লেকচারের দিন শেষ। অনলাইনে ক্লাসে শিক্ষককে নিজের দক্ষতার পরিবর্তন করা অত্যাবশ্যক।

৫) তাই করোনা-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থায় ৪০% পাঠদান গতানুগতিক পন্থায় অবশিষ্ট ৬০% অনলাইন ভিত্তিক পাঠদান করতে হবে। মূলতঃ করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিবে। জোর দিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশেও অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে।

৬) করোনা মহামারী আমাদের দূরশিক্ষণ শিক্ষাব্যবস্থায় বিপ্লব আনতে চলেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আমরা ঘরে বসে শিক্ষাব্যবস্থার দিকে এগিয়ে এগুচ্ছি। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই প্রযুক্তির সাহায্যে অভিনব পন্থায় শিক্ষা নিবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন করে যোগ্য নাগরিক সৃষ্টি করা সহজতর হবে।

৭) শিক্ষা এখন আর সনদনির্ভর থাকবে না। যে শিক্ষা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা দান করে না, সেই শিক্ষার কোনও মূল্য থাকবে না। মুখস্থনির্ভর কাগুজে ডিগ্রির দিন শেষ হতে চলেছে। করোনার আগমন আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে দক্ষতা ভিত্তিক গুণগত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ।

৮) মানবিক শিক্ষাই হবে করোনা-পরবর্তী পৃথিবীর পাথেয়। এই মহাদুর্যোগ মানুষকে নতুন করে মনুষ্যত্ব শেখাচ্ছে। আত্মকেন্দ্রিক সভ্যতা থেকে মানুষ আবার সহমর্মিতা-চালিত সভ্যতার দিকে এগিয়ে চলেছে।

৯) করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে যোগাযোগ মাধ্যম শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষক এবং ছাত্র ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম এবং লিঙ্কেডিন ইত্যাদির সাহায্যে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।

১০) আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে। ভবিষ্যতে পরীক্ষার প্রশ্ন বিশ্লেষণাত্মক শিক্ষার্থীরা হবে সৃষ্টিমূলক।

১১) ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এর ফলে অনেক কাজ যা এখন শিক্ষকেরা করেন তা স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠবে। এসব মৌলিক সত্যকে মেনে নিয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।

১২) অনলাইন ক্লাস অচিরেই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জন এবং জ্ঞান বিতরণের একটি প্রাথমিক এবং প্রধান পন্থা হয়ে উঠবে।

১৩) করোনা-পরবর্তী জগতে শিক্ষা ছাত্রদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা বিকাশে সাহায্য করবে। তথ্যভিত্তিক শিক্ষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সম্মানিত শিক্ষকগণ কেউ যদি মনে করেন যে, এই সব পরিবর্তন সাময়িক এবং করোনা মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আবার আমরা পুরনো শিক্ষাপদ্ধতি অবলম্বন করতে পারব, তা হলে তাঁরা ভুলের মধ্যে বাস করছেন। শিক্ষাদান পদ্ধতি চিরতরে পাল্টে যাচ্ছে। যাঁরা এসব নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারবেন না, তাঁরা কিন্তু নিজেরাই পিছনে পরে যাবেন। আসুন সময়ের প্রয়োজনে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হই এবং নিজেদের পরিশুদ্ধ করি।

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম


Categories